হাড়ক্ষয়ে বাড়ছে ঝুঁকি

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

হাড়ক্ষয়ে বাড়ছে ঝুঁকি

হাড়ক্ষয় রোগ, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে অস্টিওপোরোসিস নামে পরিচিত। এ রোগে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায় এবং ভেতরের গঠন দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে হাড় সহজেই ভেঙে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি দীর্ঘদিন অজানা থাকে এবং হঠাৎ ভাঙন বা তীব্র কোমরব্যথার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

বাংলাদেশ ও বিশ্বে অবস্থা

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ১০-১২ শতাংশ মানুষ হাড়ক্ষয়ে আক্রান্ত এবং আরো প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ হাড় দুর্বলতার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে, নারীদের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়, বিশেষত মাসিক বন্ধ হওয়ার পর।

বিশ্বব্যাপী বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে হাড়ক্ষয় একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ঝুঁকি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

হাড়ক্ষয়ের প্রধান কারণ

হাড়ক্ষয় সাধারণত একাধিক কারণে হয়ে থাকে। প্রধান কারণগুলো হলো—

* বয়স বৃদ্ধি এবং হাড়ের স্বাভাবিক ক্ষয়।

* শরীরে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি।

* নারীদের হরমোন পরিবর্তন (বিশেষ করে মাসিক বন্ধ হওয়ার পর)।

* দীর্ঘদিন স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ গ্রহণ।

* শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামের অভাব।

* ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস।

* পারিবারিকভাবে এই রোগের ইতিহাস।

* অপুষ্টি ও কম ওজন।

লক্ষণ ও উপসর্গ

হাড়ক্ষয় রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। তবে ধীরে ধীরে কিছু পরিবর্তন দেখা দেয়—

* কোমরের নিচের অংশে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা।

* উচ্চতা কমে যাওয়া।

* শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে পড়া।

* অল্প আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়া।

চলাফেরায় অস্বস্তি। এই লক্ষণগুলো অনেক সময় বয়সজনিত সমস্যা মনে করে অবহেলা করা হয়, যা পরে জটিলতা বাড়ায়।

কোমরব্যথা, পা অবশ ও পক্ষাঘাতের সম্পর্ক

হাড়ক্ষয় রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা হলো মেরুদণ্ডের হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া। এতে মেরুদণ্ডে ভাঙন বা চাপে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে দেখা দিতে পারে—

* কোমর থেকে নিচের দিকে ঝিনঝিনি বা অবশ ভাব।

* ডান বা বাম পা অবশ হয়ে যাওয়া।

* দুই পা অবশ হয়ে পড়া।

* হাঁটতে অসুবিধা।

* গুরুতর ক্ষেত্রে পক্ষাঘাত।

এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে এটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

রোগের প্রকারভেদ

হাড়ক্ষয় রোগ প্রধানত দুই ধরনের—

১. বয়সজনিত কারণে হয় এবং নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক বন্ধ হওয়ার পর বেশি দেখা যায়।

২. অন্য কোনো রোগ বা দীর্ঘদিন ওষুধ সেবনের কারণে হয়। যেমন : হরমোনজনিত সমস্যা, কিডনি রোগ বা দীর্ঘস্থায়ী অসুখ।

রোগ নির্ণয়ের উপায়

হাড়ক্ষয় নিশ্চিত করতে কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষা করা হয়—

* হাড়ের ঘনত্ব পরিমাপ পরীক্ষা।

* বিশেষ স্ক্যানের মাধ্যমে হাড়ের অবস্থা নির্ণয়।

* এক্স-রে দ্বারা ভাঙন শনাক্ত করা।

* ঝুঁকি নির্ণয়ের জন্য বিশেষ মূল্যায়ন পদ্ধতি। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা গেলে জটিলতা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

জটিলতা

চিকিৎসা না করলে হাড়ক্ষয় রোগ নানা গুরুতর জটিলতার দিকে নিয়ে যায়—

* নিতম্বের হাড় ভেঙে যাওয়া।

* মেরুদণ্ডে ভাঙন।

* দীর্ঘস্থায়ী কোমরব্যথা।

* চলাফেরার অক্ষমতা।

* বিছানায় পড়ে থাকা।

* মানসিক অবসাদ।

অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন না এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন