১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় দিন। এক কালো রাত, যা আজও অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে দগদগে ক্ষতের মতো রয়ে গেছে। সেই রাত ছিল শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের রাত নয়, এটি ছিল মানুষের অসহায়ত্ব, ভয়, মৃত্যু আর বেঁচে থাকার মরিয়া সংগ্রামের এক নির্মম অধ্যায়। আমি নিজেও সেই ভয়াল ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী, যা আজও মনে পড়লে শরীর ভয়ে কেঁপে ওঠে।
সে সময় আমি কক্সবাজারে গিয়েছিলাম তৎকালীন বন, পরিবেশ ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমানের সঙ্গে। তার সফরটি ছিল সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলীয় সম্মেলনে যোগদান। আমিসহ বর্তমান সংসদ সদস্য তৎকালীন ছাত্রনেতা আবু সুফিয়ান, বিএনপি চট্টগ্রাম মহানগরের সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান, মামুনুল ইসলাম হুমায়ুন, সাহেদ বক্স, প্রয়াত ছাত্রনেতা তৈমুর আহমেদ ও মোহাম্মদ আলী। দিনের শুরুটা ছিল সাধারণ দিনের মতোই, যদিও আকাশে এক ধরনের অস্বস্তিকর গোমট ভারী ভাব লক্ষ করা যাচ্ছিল। ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের ফলে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ ছিল, কিন্তু আমরা তখনো পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারিনি। দুপুর গড়িয়ে বিকালের দিকে আবহাওয়ার পরিবর্তন আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আকাশ ক্রমেই কালো হতে থাকে, বাতাসে এক ধরনের চাপা গর্জন শোনা যাচ্ছিল। সমুদ্রের দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল, যেন অজানা এক শক্তি তার বুকে উত্তাল তরঙ্গ তৈরি করছে। সেই মুহূর্তে প্রকৃতির ভেতরে জমে ওঠা রুদ্ররূপ আমরা অনুভব করতে শুরু করি। সন্ধ্যার পর কক্সবাজারের পাহাড়-চূড়ায় অবস্থিত হিলটপ সার্কিট হাউসে অবস্থান নিই। স্থানটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে হলেও, প্রকৃতির শক্তির সামনে নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর হতে পারে, তা আমরা খুব দ্রুতই উপলব্ধি করি। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের গতি হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। প্রথমে মনে হচ্ছিল সাধারণ ঝড়, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তা এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। রাত যত গভীর হতে থাকে, ততই পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ৫০ কিমির ঝড়ের গতির বাতাস ছিল যেন হাজারো বন্য জন্তুর সম্মিলিত গর্জন। জানালার কাচগুলো প্রচণ্ড শব্দে কাঁপছিল, মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল এগুলো ভেঙে উড়ে যাবে। দরজাগুলো শক্ত করে বন্ধ রাখা সত্ত্বেও ঝড়ের চাপ সেগুলো ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে চাইছিল।
একপর্যায়ে বিদ্যুৎ চলে যায়। চারপাশে গভীর অন্ধকার, মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের ঝলকানি আকাশকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। সেই আলোর ঝলকে আমরা দূরের গাছপালা ভেঙে পড়তে দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, পুরো পৃথিবী যেন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ২৫০ কিলোমিটারের বাতাস যেন কক্সবাজার শহরকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল মানুষের আর্তনাদ। ঝড়ের শব্দের মধ্যেও মাঝেমধ্যে কানে ভেসে আসছিল সাহায্যের আকুতি, চিৎকার আর কান্না। সেই শব্দগুলো আজও আমার কানে স্মৃতি হয়ে বাজে। আমরা সার্কিট হাউসের ভেতরে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু মন ছিল বাইরে অসহায় মানুষের দিকে। রাতের একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল, এই ভবনটিও হয়তো টিকে থাকবে না। আমরা সবাই আতঙ্কে নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিলাম। মৃত্যুভয় তখন আমাদের ঘিরে ধরেছিল। মনে হচ্ছিল, এই রাত হয়তো আমাদের জীবনের শেষ রাত। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জলোচ্ছ্বাস। সমুদ্রের পানি উপকূল অতিক্রম করে ভেতরের দিকে ঢুকে পড়ে। অসংখ্য ঘরবাড়ি পানির তোড়ে ভেসে যায়। মানুষ ঘুমের মধ্যেই বা আশ্রয় নেওয়ার আগেই প্রাণ হারায়। সেই রাতের নির্মমতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
অবশেষে দীর্ঘ এক ভীতিকর রাতের পর ভোর আসে। কিন্তু সেই ভোর ছিল না কোনো স্বস্তির বার্তা নিয়ে; বরং তা নিয়ে আসে এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতা। আমরা বাইরে বের হয়ে দেখি—চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। গাছপালা উপড়ে পড়ে আছে, ঘরবাড়ি নেই, রাস্তা ভেঙে গেছে। সবচেয়ে কষ্টদায়ক দৃশ্য ছিল মানুষের মরদেহ—যেদিকে তাকাই সেদিকেই নিথর দেহ। পরবর্তী দিনগুলোয় পরিস্থিতি আরো স্পষ্ট হতে থাকে। উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে হাজার হাজার মরদেহ ছড়িয়ে ছিল। সমুদ্রতীর ও উপকূলবর্তী এলাকায় অসংখ্য মৃতদেহ ভেসে উঠছিল। অনেক এলাকা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল—যেন সেখানে কখনো কোনো জনবসতি ছিলই না। বিস্তীর্ণ অঞ্চল পরিণত হয়েছিল এক শূন্য, নিঃস্ব, নীরব ভূমিতে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখতে তৎকালীন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে কক্সবাজারে আসেন। তার সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী কামাল ইবনে ইউসুফ এবং ত্রাণমন্ত্রী লুৎফুর রহমান খান আজাদসহ একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। নোমান ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা তাদের স্বাগত জানাই এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনে নিয়ে যাই। কলাতলি হাসপাতাল রোড, লাবণী পয়েন্ট, বিমানবন্দর, কোর্ট রোড ইত্যাদি।
প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে মানুষের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেন। সমুদ্রতীরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজার শত শত মানুষের মৃতদেহ, বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি, নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবার—সবকিছুই ছিল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। অনেক স্থানে দেখা গেছে, পুরো এলাকাই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কোথাও শুধু ভাঙা কাঠামো, কোথাও শুধু পানি আর বালুর স্তূপ—যেন জীবন কখনো সেখানে ছিল না। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে তিনি গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদারের সবাইকে নির্দেশ দেন; কিন্তু এত বিশাল বিপর্যয়ের ক্ষতি পূরণ করা সহজ ছিল না। প্রশাসন, রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ একযোগে উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নেয়। অনেক মানুষ তাদের পরিবার হারিয়েছে। শিশুদের কান্না, মায়েদের আহাজারি, স্বজন হারানোর বেদনা—সব মিলিয়ে এক অসহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। সেদিন আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, একটি রাত কীভাবে পুরো একটি জাতিকে শোকের সাগরে ডুবিয়ে দিতে পারে।
ধারণা করা হয়, সেই ঘূর্ণিঝড়ে কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি। সেই সময় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কতা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অভাব ক্ষয়ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর স্মৃতিগুলোর একটি। আজও যখন চোখ বন্ধ করি, তখন সেই রাতের দৃশ্য ভেসে ওঠে—ঝড়ের গর্জন, মানুষের চিৎকার আর মৃত্যুভীতিতে কাঁপতে থাকা মুহূর্তগুলো।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল শুধু একটি তারিখ নয়; এটি একটি শিক্ষা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায় এবং জীবন কতটা অনিশ্চিত। সেই রাতের স্মৃতি আমাদের বাধ্য করে ভাবতে—আমরা কি আজ প্রস্তুত? আমরা কি ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় যথেষ্ট সচেতন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব। কারণ ইতিহাস শুধু মনে রাখার জন্য নয়, তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্যও।
লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা, সংস্কৃতিসেবী ও প্রাবন্ধিক
পরিচালক (স্বতন্ত্র), পিপলস ইন্স্যুরেন্স পিএলসি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

