স্বজনদের চোখে অমানিশা, অর্থকষ্টে কাটছে দিন

স্বজনদের চোখে অমানিশা, অর্থকষ্টে কাটছে দিন

দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্স টাউনে একটি সুপারশপে গত ২৮ জুলাই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৬ বাংলাদেশি নিহত হন। যাদের মধ্যে ৫ জনই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা। মর্মান্তিক ওই ঘটনায় তাদের লাশ দেশে আনা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও বিপুল ব্যয়ের কারণে পরিবারের সম্মতিতে দক্ষিণ আফ্রিকাতেই তাদের দাফন করা হয়। ফলে শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখার সুযোগ পাননি স্বজনরা।

জানা যায়, স্বজন হারানোর শোকের পাশাপাশি নিহতদের পরিবারগুলো এখন চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলের মালিক পক্ষের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সহায়তা পাননি তারা।

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সদস্যদের অভিযোগ, নিহতদের কয়েকজনকে অবৈধ পথে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেওয়া হয়েছিল। সেখানে বছরের পর বছর কাজ করলেও কারো কারো বেতন বকেয়া রয়েছে। বিশেষ করে গত ৬-৭ মাসের বেতন পাননি কয়েকজন। অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর পরও সেই পাওনা পরিশোধ করা হয়নি বলে দাবি স্বজনদের। ফলে তাদের পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে দিনাতিপাত করছে।

নিহতদের একজন বক্তাবলী ইউনিয়নের রামনগর পশ্চিম এলাকার বাসিন্দা শাহীন। ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে দাদির কাছে বড় হন তিনি। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় কিশোর বয়সেই সংসারের দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। অভাবের তাড়নায় ২০১৮ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান শাহীন।

স্বজনদের ভাষ্য, দীর্ঘ ৮ বছর প্রবাসে থাকলেও পরিবারের আর্থিক সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, যেদিন অগ্নিকাণ্ডে তার মৃত্যু হয়, সেদিনই তার বৈধ কাগজপত্র হাতে আসে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, শিগগির দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু আগুনে পুড়ে সেই স্বপ্ন চিরতরে শেষ হয়ে যায়।

শাহীনের ছোট ভাই শাওনের অভিযোগ, দক্ষিণ আফ্রিকায় আলীরটেক ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য রওশন আলীর মালিকানাধীন সুপারশপে কাজ করতেন শাহীন। দীর্ঘদিনের চাকরির প্রায় ১৪ লাখ টাকা বেতন বকেয়া রয়েছে বলে তাদের দাবি। মৃত্যুর পরও ওই অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। শাওন অভিযোগ করেন, ভাইয়ের মৃত্যুর পর শোকাহত পরিবারের সঙ্গে দোকান মালিক রওশন আলী কোনো যোগাযোগ করেননি কিংবা তাদের পাশে দাঁড়াননি।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত আরেকজন আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামের বাসিন্দা আপন। আপনের স্বপ্ন ছিল বাড়ি নির্মাণ করে একমাত্র বোনের বিয়ে দেবেন । সেজন্য প্রায় ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সেই বাড়ি অর্ধনির্মিত রয়ে গেছে। এ বাড়িতেই বসবাস করছেন তারা বাবা-মা।

২০২১ সালে ৫ বছরের চুক্তিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান আপন। পরিবারের সদস্যরা জানান, আর মাত্র দুই মাস পর দেশে ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু ঘরে ফেরার আগেই আসে মৃত্যুর খবর।

একই এলাকার মনির সরকারের ছেলে ফাহিমও ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন। ৩ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে বড় ছিলেন তিনি। জীবিকার তাগিদে ২০১৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান ফাহিম। দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে চলতি বছরের ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার কথা ছিল তার।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ছোট দুই ভাইয়ের জন্য একটি মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন ফাহিম। দেশে ফিরে সেই মোটরসাইকেল চালানোর ইচ্ছা ছিল তার। পরিবারের পরিকল্পনা ছিল দেশে ফেরার পর ধুমধাম করে তার বিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু আগুনে পুড়ে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সব স্বপ্নও ভেঙে যায়।

স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সহায়তার আশ্বাস দিলেও পরে আর খোঁজ নেননি। সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাননি তারা।

পরিবারগুলোর আরো অভিযোগ, সুপারশপটির মালিক রওশন আলী নিহতদের দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে গিয়ে তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করাতেন। অনেকের বেতন বকেয়া থাকলেও তা পরিশোধ করা হচ্ছে না । অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ও বকেয়া পাওনা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না বলতেও নানাভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ স্বজনদের। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে রওশন আলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

স্বজনদের দাবি, নিহতদের পরিবারকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি তাদের কোনো বকেয়া বেতন বা অন্য পাওনা থাকলে তা যাচাই করে দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা করারও দাবি জানানো হয়।

আর্থিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়েজ উদ্দিন বলেন, আমরা নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছি। সরকার থেকে আর্থিক অনুদান প্রাপ্তির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হলে আমরা তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করব। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্স টাউনের যে দোকানে আগুন লেগেছিল, সে দোকানের মালিক রওশন মেম্বারকে আমরা ডাকাব। তার কাছে বেতনের টাকা যেগুলো পাওনা ছিল, সেগুলো আদায়েরও চেষ্টা করা হবে।

গত ২৮ জুলাই রাতে দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্স টাউনের একটি সুপারশপে আগুন লাগে। রাতে দোকানে ঘুমিয়ে থাকা ৬ বাংলাদেশি আগুনে পুড়ে মারা যান। তারা হলেন নারায়ণগঞ্জের আলীরটেক ইউনিয়নের ফাহিম (২৯), আপন (২৩) ও নুর মোহাম্মদ (৫৫); বক্তাবলী ইউনিয়নের ফয়সাল (২৬) ও শাহীন (৩০) এবং মুন্সীগঞ্জের রাজিক (৫৫) ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন