২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সিলেট-ছাতক রেলপথ সংস্কারে ২১৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। এদিকে প্রায় চার বছর ধরে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ সময় চুরি হয়ে গেছে রেললাইনের লোহার পাত ও মূল্যবান স্লিপার। ফলে কবে এই রেলপথে আবার চলাচল শুরু হবে, তা নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশ পর্যন্ত (প্রায় ৩৪ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথ) পুনর্বাসনের জন্য ২০২৫ সালে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের (মিটারগেজ ট্র্যাকিং) পুনর্বাসন প্রকল্প’ শীর্ষক এই কাজের মোট আনুমানিক ব্যয় ধরা হয় ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা।
জিঅবি ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় অনুমোদন পায়। চুক্তি অনুযায়ী কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মীর আখতার হোসেন লিমিটেড (এমএএইচএল)’। একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার চুক্তিমূল্য ছিল প্রায় ১৯৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ছিল ২৩ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত।
তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও প্রকল্পের মূল কাজের বড় অংশই বাকি রয়ে গেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে এবং মাটি ভরাট ও কালভার্ট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ সংস্কার, মাটি ভরাট, কালভার্ট ও সেতু মেরামত, নতুন স্লিপার স্থাপন এবং নতুন রেললাইন বসানোর কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পুরোনো রেললাইন অপসারণ করা হলেও নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ পিছিয়ে রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ, হাসনাবাদ, কালারুকা, মাধবপুর, ছৈলা-আফজলাবাদ, সৎপুর এবং সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চিসহ বিভিন্ন এলাকায় সংস্কারকাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। কোথাও কোথাও কাজ বন্ধ থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া সড়কে মাটি ভরাটের পর রেলপথের উচ্চতা যথাযথভাবে নির্ধারণ না হওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুফি আলম সোহেল জানান, এই রেলপথ পণ্য পরিবহন ও কম খরচে যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কাজ শুরু হওয়ায় আশা জাগলেও এখন মাটি ভরাট ছাড়া দৃশ্যমান কোনো উন্নতি চোখে পড়ছে না। ফলে সড়কপথে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগছে।
একই সুর জাউয়া বাজার এলাকার ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিনের। তিনি জানান, কাজ হঠাৎ স্থবির হয়ে গেলেও এর কারণ জানতে পারছেন না স্থানীয়রা।
সিলেট রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজ জানান, প্রকল্পের প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে, বাকি প্রায় ৭৫ শতাংশ। ২৩ আগস্ট নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন মেয়াদ বৃদ্ধি ও পরবর্তী বাস্তবায়নের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার কারণ হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের প্রকল্প প্রকৌশলী সজিবুর রহমান সুনামগঞ্জের প্রতিকূল আবহাওয়া ও ভারি বৃষ্টিপাতকে দায়ী করেছেন।
প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ জানান, দেড় বছর মেয়াদের মধ্যে দুটি বর্ষাকাল থাকায় এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রয়োজনীয় কিছু মালামাল সময়মতো আমদানি করতে না পারায় কাজ ব্যাহত হয়েছে। সম্প্রতি ২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে এবং মালামাল আমদানির চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, অবশিষ্ট কাজ শেষ করার জন্য আরো এক বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে এবং বর্ধিত সময় পাওয়া গেলে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। তবে মেয়াদের পুরো সময় পার হওয়ার পরও যখন প্রকল্পের তিন-চতুর্থাংশ কাজই অসম্পূর্ণ, তখন এই ঐতিহ্যবাহী রেলপথে কবে আবার ট্রেনের হুইসেল শোনা যাবে—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরেফিরে আসছে।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

