হরমুজ : ভূরাজনীতির অগ্নিপথ

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

হরমুজ : ভূরাজনীতির অগ্নিপথ

বিশ্বমানচিত্রে হরমুজ প্রণালি এক টুকরো সরু জলরেখা—কিন্তু এর ভেতরেই জমাট বেঁধে আছে আধুনিক সভ্যতার শক্তি, অর্থনীতি ও সংঘাতের ইতিহাস। পারস্য উপসাগর আর ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই প্রণালি শুধু ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়; এটি একধরনের অদৃশ্য স্নায়ু, যার স্পন্দনে ওঠানামা করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, কূটনীতি এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা।

প্রতিদিন বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে অতিক্রম করে। কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে শুরু করে সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত ও আমিরাতের অপরিশোধিত তেল—সবই যেন এই এক দরজার ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজ শুধু একটি পথ নয়, বরং এক ‘চোকপয়েন্ট’—যেখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে ঝড় তোলে।

বিজ্ঞাপন

ইরান দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রণালিকে তার কৌশলগত শক্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, নৌমাইন, দ্রুতগামী ছোট নৌযান—এসবই ‘অসম যুদ্ধের’ (asymmetric warfare) এক কার্যকর হাতিয়ার। সংকীর্ণ পথের ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে ইরান অল্প সময়ের জন্য হলেও এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এতে কি যুদ্ধ জেতা সম্ভব?

আগামীর ইতিহাস কথা বলবে। কারণ হরমুজে যতটা ইরানের ভূগোল, তার চেয়েও বেশি উপস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের নৌশক্তি। বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন পঞ্চম নৌবহর, আকাশসীমায় আধিপত্য এবং মিত্র আরব রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন—সব মিলিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে প্রণালি নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ইরানের জন্য কঠিন হতে পারে।

তবে এটুকু নিশ্চিত—ইরান চাইলে বিশ্ববাজারকে অল্প সময়ের জন্য হলেও নাড়িয়ে দিতে পারে। আর এই ‘নাড়িয়ে দেওয়ার’ ক্ষমতাই তার আসল কৌশলগত শক্তি।

হার্গ দ্বীপ : অর্থনীতির হৃদয়ে আঘাত : ইরানের তেল রপ্তানির প্রাণকেন্দ্র হার্গ দ্বীপ—যেন দেশের অর্থনীতির স্পন্দন। যদি কখনো এই দ্বীপকে লক্ষ করে কোনো সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়, তবে তা হবে শুধু একটি স্থাপনায় আঘাত নয়, বরং পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর এক গভীর ধাক্কা।

এমন পরিস্থিতিতে সংঘাত আর সীমিত থাকবে না। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার—প্রতিটি রাষ্ট্রই তাদের জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় সক্রিয় হয়ে উঠবে। পাল্টা আঘাতে ইরান টার্গেট করতে পারে তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, এমনকি আঞ্চলিক প্রক্সি শক্তিগুলোকেও সক্রিয় করতে পারে। ফলে যুদ্ধের রূপ নিতে পারে বহুমাত্রিক—স্থল, সমুদ্র, আকাশ, সাইবার এবং অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই।

সুয়েজের প্রতিচ্ছবি, নাকি নতুন বিপর্যয় : ইতিহাসের বুকে কখনো কখনো কিছু জলপথ শুধু ভৌগোলিক রেখা থাকে না—সেগুলো হয়ে ওঠে শক্তির প্রতীক, সাম্রাজ্যের স্নায়ু আর বিশ্বরাজনীতির নীরব নিয়ন্ত্রক। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল যেমন ছিল ব্রিটিশ-ফরাসি আধিপত্যের শেষ আলো, তেমনি আজকের হরমুজ প্রণালি যেন আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির স্পন্দিত ধমনি। প্রশ্ন জাগে—সুয়েজ যেমন এক সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা করেছিল, হরমুজ কি তেমনই আরেক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি লিখতে পারে?

বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে উত্তরটি কিছুটা কাব্যহীন, কিন্তু গভীরতর সত্যে পূর্ণ। সুয়েজ সংকট ছিল এক রূপান্তরের নাটকীয় মুহূর্ত। মিসরের নাসের যখন খাল জাতীয়করণের ঘোষণা দিলেন, তখন তা ছিল শুধু একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়—বরং ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ছিন্ন করার এক সাহসী ঘোষণা। ব্রিটেন ও ফ্রান্স সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; কিন্তু ইতিহাসের ঘড়ি তখন অন্যদিকে ঘুরছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের চাপের মুখে তাদের পিছু হটা ছিল শুধু সামরিক পরাজয় নয়—বরং একটি যুগের অবসান। তবে সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য লুকিয়ে ছিল : শূন্যতা তৈরি হয়নি। এক সাম্রাজ্যের জায়গা নিয়েছিল আরেক শক্তি।

ইতিহাসে সুয়েজ সংকট দেখিয়েছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে ঘিরে কীভাবে বৈশ্বিক উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে পার্থক্যও কম নয়। আজকের বিশ্বে রয়েছে পারমাণবিক শক্তির ছায়া, জটিল জোট রাজনীতি এবং প্রক্সিযুদ্ধের বিস্তার। অর্থনীতি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আন্তঃনির্ভরশীল। ফলে একটি সংঘাত দ্রুত সীমান্ত ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। সুয়েজ সংকট তুলনামূলক দ্রুত শেষ হয়েছিল আন্তর্জাতিক চাপের কারণে। কিন্তু হরমুজকেন্দ্রিক সংঘাত শুরু হলে তার পরিণতি হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী, অনিশ্চিত এবং বহুমাত্রিক।

হরমুজ প্রণালিকে শুধু একটি ভূগোল দিয়ে বোঝা যাবে না। এটি একদিকে অর্থনীতির লাইফলাইন, অন্যদিকে কৌশলগত চাপ প্রয়োগের অস্ত্র।

ইরান এখানে ‘নিয়ন্ত্রণ’ নয়, বরং ‘প্রভাব’ সৃষ্টি করতে চায়। আর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চায় এই প্রবাহ অব্যাহত রাখতে। এই দুই শক্তির টানাপড়েনই তৈরি করে এক অনিশ্চিত ভারসাম্য—যেখানে যুদ্ধের সম্ভাবনা সবসময় জীবন্ত থাকে।

হরমুজের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি শুধু একটি জলপথ নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহের কেন্দ্রবিন্দু—যেখানে প্রতিদিন পৃথিবীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল প্রবাহিত হয়। ইরান, তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে, এই পথকে স্পর্শ করতে পারে, কাঁপাতে পারে, এমনকি সাময়িকভাবে থামিয়েও দিতে পারে। কিন্তু ‘নিয়ন্ত্রণ’ আর ‘অচল করে দেওয়া’—এই দুইয়ের মধ্যে যে ব্যবধান, সেটিই এখানে মূল সত্য।

ইরান যদি হরমুজে আগুন জ্বালায়, তবে তা হবে দাবানলের মতো—দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, বিশ্ববাজারকে কাঁপিয়ে তুলবে, তেলের দাম আকাশচুম্বী করবে। কিন্তু সেই আগুন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কারণ এই প্রণালি শুধু ইরানের শত্রুদের নয়, বরং বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোরও জীবনরেখা। চীন, ইউরোপ, জাপান—সবাই এ পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজ বন্ধ হয়ে গেলে তা ‘ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র’ থাকবে না; বরং হয়ে উঠবে ‘ইরান বনাম বিশ্ব অর্থনীতি’।

আর এখানেই সুয়েজ ও হরমুজের সবচেয়ে বড় পার্থক্য। সুয়েজে শক্তির ভারসাম্য বদলে যাচ্ছিল—ব্রিটেন ছিল অবনতির পথে, যুক্তরাষ্ট্র ছিল উত্থানের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু আজকের বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তির কেন্দ্রে অবস্থান করছে। তাকে সরিয়ে দেওয়ার মতো একক শক্তি এখনো দৃশ্যমান নয়।

ইরান যা করতে পারে, তা হলো—বিশ্বকে অস্থির করা। কয়েক সপ্তাহ বা মাসের জন্য বাজারে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া, তেলের দাম বাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের উদ্বিগ্ন করে তোলা। কিন্তু যা করতে পারবে না, তা হলো—এই অস্থিরতাকে স্থায়ী ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দেওয়া।

কারণ সাম্রাজ্যের পতন কোনো একক ঘটনার নাটকীয় ফল নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভেঙেছিল ধীরে ধীরে—অর্থনৈতিক ক্লান্তি, দুই বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়, উপনিবেশগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রাম—এসব মিলিয়ে। একইভাবে, যদি কখনো মার্কিন আধিপত্য ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তবে তা ঘটবে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা, অভ্যন্তরীণ সংকট এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে।

হরমুজ প্রণালি আজকের বিশ্বের এক স্পন্দিত স্নায়ু—যেখানে আঘাত করলে পুরো শরীর কেঁপে উঠবে। ইরান এই স্নায়ুতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, বিশ্বকে অস্থিরতার অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে। এই সংকীর্ণ জলপথ তাই শুধু জাহাজ চলাচলের রাস্তা নয়—এটি আধুনিক বিশ্বের এক অগ্নিপথ, যেখানে প্রতিটি ঢেউয়ের ভেতর লুকিয়ে থাকে অর্থনীতি, কূটনীতি এবং সংঘাতের অদৃশ্য গল্প।

ইতিহাসের ভাষায় বললে—সুয়েজ ছিল এক সূর্যাস্তের রঙিন আকাশ আর হরমুজ, যদি জ্বলে ওঠে, হবে এক ঝড়ো সন্ধ্যা; আলো সম্পূর্ণ নিভিয়ে দিতে না পারলেও দিগন্তকে নিশ্চিত অশান্ত করে তুলতে পারে।

হরমুজের ঢেউ, এক নীরব অভিঘাত : হরমুজ নিয়ে উত্তেজনা বাংলাদেশের তীব্র জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি ও ভূরাজনীতির এক নীরব অভিঘাত। পৃথিবীর মানচিত্রে হরমুজ প্রণালি একটি সরু নীলরেখা—কিন্তু তার বুকে বয়ে যায় বৈশ্বিক অর্থনীতির স্পন্দন। মধ্যপ্রাচ্যের তেলবাহী জাহাজ যখন এই সংকীর্ণ জলপথ পেরিয়ে যায়, তখন শুধু জ্বালানি নয়, বহন করে বিশ্ববাজারের স্থিতি, উন্নয়নশীল দেশের স্বপ্ন আর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বস্তি। সেই পথ যদি হঠাৎ অশান্ত হয়ে ওঠে—যদি যুদ্ধের কালো ছায়া নেমে আসে—তবে তার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে দূরবর্তী বাংলাদেশের তীরেও।

বাংলাদেশ সরাসরি কোনো যুদ্ধের অংশীদার নয়; কিন্তু এই বৈশ্বিক ব্যবস্থার এক গভীরভাবে সংযুক্ত অংশ। তাই হরমুজে অস্থিরতা মানেই এখানে নীরব সংকটের সূচনা—যা প্রথমে ধরা পড়ে জ্বালানির দামে, পরে ছড়িয়ে পড়ে জীবনের প্রতিটি স্তরে।

প্রথম আঘাত আসে জ্বালানি খাতে। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় পুরোটাই আমদানি করে, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। হরমুজ প্রণালিতে কোনো বিঘ্ন ঘটলেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে। সেই ধাক্কা ঢাকায়, খুলনায়, চট্টগ্রামে এসে লাগে ডিজেলের দামে, বিদ্যুতের খরচে, এমনকি রান্নাঘরের চুলায়ও। কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজি যদি ব্যাহত হয়, তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চাকা ধীর হয়ে আসে—লোডশেডিং বাড়ে, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয় আর নাগরিক জীবনে ফিরে আসে অন্ধকারের দীর্ঘশ্বাস।

জ্বালানির এই সংকট অর্থনীতির শরীরে এক ধরনের ‘অদৃশ্য জ্বর’ সৃষ্টি করে—যার নাম মূল্যস্ফীতি। পরিবহন খরচ বাড়ে, ফলে বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তে থাকে। চাল, ডাল, তেল, নির্মাণসামগ্রী—কিছুই এর বাইরে থাকে না। মধ্যবিত্তের হিসাবের খাতা অমিল হয়ে যায় আর নিম্নবিত্তের জীবন হয়ে ওঠে টিকে থাকার সংগ্রাম।

হরমুজ

তৈরি পোশাক খাত, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ, সেও এই বৈশ্বিক অস্থিরতার বাইরে নয়। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার যদি বৈশ্বিক মন্দা দেখা দেয়, তবে পশ্চিমা ক্রেতাদের চাহিদা কমে যেতে পারে। ফলে রপ্তানি আয় কমে আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। ডলার সংকট তীব্র হলে টাকার মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়—যা আবার নতুন করে মূল্যস্ফীতির আগুন জ্বালায়।

এই সংকট শুধু বাংলাদেশের একার নয়; পুরো দক্ষিণ এশিয়াই এক ধরনের ‘জ্বালানিনির্ভর ঝুঁকির বলয়’-এর মধ্যে পড়ে। ভারত তার অর্থনৈতিক শক্তি ও বিকল্প উৎসের কারণে কিছুটা সামাল দিতে পারে, কিন্তু পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো দ্রুত গভীর সংকটে পড়ে যেতে পারে। আঞ্চলিক অস্থিরতা তখন আরো বাড়ে, যার প্রভাব বাংলাদেশও এড়িয়ে যেতে পারে না।

রাজনৈতিক দিক থেকেও এর অভিঘাত কম নয়। জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে জনমনে অসন্তোষ বাড়ে, সরকারের ওপর চাপ তৈরি হয় ভর্তুকি বাড়ানোর জন্য। অন্যদিকে পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশকে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়—মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা, আবার বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গেও কৌশলী অবস্থান ধরে রাখা। প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়; যুদ্ধ বা অস্থিরতা বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের জীবনে ঝুঁকি বাড়ে, যা রেমিট্যান্সপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন আসে—বাংলাদেশ কী করতে পারে? উত্তরের পথ একদিনে তৈরি হবে না, কিন্তু দিকনির্দেশ স্পষ্ট। জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার—এসবই হতে পারে প্রতিরোধের ভিত্তি। বিশেষ করে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বিদ্যুৎ সহযোগিতা ভবিষ্যতের এক গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে পারে।

হরমুজ প্রণালির জলরাশি আমাদের থেকে হাজার মাইল দূরে, কিন্তু তার ঢেউ অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তাই এ সংকটকে শুধু দূরের যুদ্ধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি আমাদের নীতিনির্ধারণ, প্রস্তুতি এবং দূরদর্শিতার এক কঠিন পরীক্ষা।

শেষ পর্যন্ত, হরমুজের অশান্ত জলরাশি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আজকের পৃথিবীতে কোনো দেশই একা নয়। এক প্রান্তের অস্থিরতা অন্য প্রান্তের জীবনে প্রতিফলিত হয়। আর সেই প্রতিফলনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আমাদের চ্যালেঞ্জ।

লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অন্তর্বর্তী সরকার

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন