‘জেলায় জেলায় উড়ছে টাকা’—এটি একটি সংবাদের শিরোনাম! সংবাদ জগতের দিকপাল দৈনিক প্রথম আলো। বাংলাদেশের প্রথম জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর এভাবেই সংবাদটি ‘প্রথম আলো’তে শিরোনাম হয়েছিল। একই দিনে নয়া দিগন্তের শিরোনাম ছিল ‘জেলা পরিষদ নির্বাচনে টাকার খেলা’! ২০১৭ সালের পহেলা জানুয়ারি দৈনিক কালের কণ্ঠের শিরোনাম ছিল—‘ভোট দিলি না, টাকা দে’! মৌলিক গণতন্ত্রের আদলে আইয়ুবীয় স্টাইলে ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভোটের আগে-পরের দুটো সপ্তাহ সেই নির্বাচন নিয়ে এমন অসংখ্য চমকপ্রদ সংবাদে ভরপুর ছিল গণমাধ্যমের শিরোনাম।
স্থানীয় সরকারের জেলা পরিষদের ধারণাটি মোটেও নতুন নয়। আজ থেকে ১৫০ বছর আগে ভাইসরয় লর্ড রিপনের ‘Local Self Government Resolution 1882’-এর মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু। ঔপনিবেশিক আমলের জেলা বোর্ড পাকিস্তানি শাসনামলে জেলা কাউন্সিলে রূপান্তরিত হয়। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে এটি আবারও জেলা বোর্ড নামে ফিরে আসে। জেলা বোর্ডকে উন্নয়নের স্বাধীন কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৫ সালে সৃষ্টি করা হয় জেলা গভর্নর পদ। গভর্নর পদ্ধতিটি আলোর মুখ দেখার আগেই অকার্যকর হয়ে যায়।
১৯৭৬ সালের স্থানীয় সরকারের এক অধ্যাদেশে আবারও ‘জেলা পরিষদ’ নামটি ফিরে আসে। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৮৮ সালে পরোক্ষ নির্বাচনের বিধান রেখে জেলা পরিষদ বিলটি পাস হয়। আইনে নির্বাচন পদ্ধতির কথা বলা থাকলেও সরকারপ্রধানের পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টি মুখ্য হয়ে ওঠে। আনুগত্যকে বিবেচনায় নিয়ে দলীয় চিন্তাকে প্রাধান্য দিয়ে এরশাদ সরকার সারা দেশে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মনোনীত করেন।
জনগণের করের অর্থে গাড়ি-বাড়ি, পাইক-পেয়াদা, অফিস-আদালতের সুযোগ-সুবিধায় একেকজন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান যেন জেলার বাদশাহ হয়ে ওঠেন! সালাম, আদাব, শান-শওকত আর স্বীয় ভাগ্য বদল ছাড়া এসব চেয়ারম্যানদের তেমন কোনো উন্নয়ন জনগণের দৃশ্যমান হয় না। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতাসীন হলে বাতিল হয়ে যায় জেলা পরিষদ আইন। স্থানীয় সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটিকে ছেড়ে দেওয়া হয় আমলাতন্ত্রের হাতে।
টেকসই উন্নয়ন নয়, বাতিল আর পুনর্বহাল যেন স্থানীয় সরকারের জেলা পরিষদের অবশ্যম্ভাবী নিয়তি! আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে ২০০০ সালে আবারও জেলা পরিষদ আইন পাস করে। সরকারের ধারাবাহিকতা না থাকায় ২০০৯ সাল অবধি সেটিও অকার্যকর থেকে যায়। পরে আবারও আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে ২০১১ সালে ‘জেলা পরিষদ আইন ২০০০’-এর ৮২(১) বিধানবলে ৬১টি জেলায় নিয়োগ দেয় প্রশাসক। পরোক্ষ ভোটের বিধান রেখে পাস করে ‘জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল ২০১৬’। আইনের ক্ষমতাবলে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের ভোটে একজন চেয়ারম্যান এবং ১৫ জন সাধারণ ও পাঁচজন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নিয়ে জেলা পরিষদ গঠনের বিধি সংযোজিত হয়।
২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় জেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচন। এ যেন ভোট নয়, ছিল কেনাবেচা আর জোর-জবরদস্তির এক মহোৎসব। নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে থেকে সারা দেশ যেন জনপ্রতিনিধি কেনাবেচার হাটের রূপ ধারণ করেছিল! যেখানে বেচাকেনা কঠিন ছিল, সেখানে ক্ষমতাসীনরা জোর-জবরদস্তি করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে বাধ্য করেছিল। ফলস্বরূপ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর কেনাবেচা মিলিয়ে ৪৬টি জেলা পরিষদের দখল নেয় আওয়ামী লীগ।
দ্বিতীয়বারের জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর। রূপে-গুণে সেটি ছিল আরো অনন্য। ২৬ জন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বিনা ভোটে, বাকিরা সব ক্ষমতার জোরে। সবাই আওয়ামী লীগ। কেউ নেতার বউ, কেউবা নেতার স্বামী, কেউ এমপির স্ত্রী, কেউবা এমপির ভাই, কেউবা মন্ত্রীর আত্মীয় আবার কেউবা শাসকের সাবেক কর্মচারী। এভাবেই ভাগবাটোয়ারা করে নির্বাচনের নামে সারা দেশে চলে পুনর্বাসন। বিধি বাম! চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে হিসাবনিকাশে বাধে মহা গন্ডগোল! তাসের ঘরের মতো চুরমার হয়ে যায় ক্ষমতার সব ভরকেন্দ্র! কার্যকারিতা হারায় জেলা পরিষদ। জেলার সব রাজা-রানি, উজির-বাদশাহ হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যান। যারা নিখোঁজ হওয়ার সুযোগ পাননি, তাদের ঠিকানা হয় কারাগার।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান জন্ম দেয় নতুন প্রত্যাশার। আবারও নব সম্ভাবনায় শুরু হয় হিসাবনিকাশ। হারিয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ফিরে পেতে জনগণ নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। নানা টালবাহানায় কেটে যায় ১৮ মাস। আইনের শাসনের পরিবর্তে বলপ্রয়োগ আর মোবোক্রেসি নামক এক দানবীয় শক্তির উত্থান ঘটে। সংকুচিত হতে শুরু করে মত প্রকাশের অধিকার। ড. ইউনূসকে নিয়ে জেগে ওঠা সম্ভাবনা অচিরেই ফিকে হয়ে আসতে শুরু করে। তারুণ্যের মুখে অশ্লীলতা এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম দেয়। পাঠশালার পরিবর্তে অর্থবিত্ত আর ক্ষমতার পেছনে ছুটতে শুরু করে তারুণ্য।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা আবারও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। তার বিনয় আর মৃদুভাষী আচরণ শত্রুকেও মুগ্ধ করে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগবিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন। সুনির্দিষ্ট কিছু আসন নিয়ে সমঝোতার বিতর্ক থাকলেও সাধারণ মানুষ নির্বাচনের ফলাফলকে সানন্দে গ্রহণ করে। অনেকেই বলেন, দেশটি হাঁপ ছেড়ে বেঁচে গেছে! কেউবা বলেন, সাক্ষাৎ যমের হাত থেকে মুক্তি পেল বাংলাদেশ। সত্যি কি মুক্তি পেল? নাকি সেই পুরোনো ধারা আবারও নতুন রূপে আবির্ভূত হলো?
অতি সম্প্রতি সরকার সবকটি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ করে। জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের কাজটিও প্রায় সম্পাদনের পথে। ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৪২ জন পরিষদ প্রশাসকের নাম ঘোষণা করে। তারা কেউ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত, কেউবা দলের ত্যাগী নেতা, আবার কেউবা শাসকের বিশ্বস্ত নিকটজন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, জনগণকে পাশ কাটিয়ে জনমতকে বিবেচনায় না নিয়ে তাদের করের টাকায় দলের নেতানেত্রীদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেয় সরকার। আওয়ামী লীগ যে পথে হেঁটেছিল, এত ত্যাগ-তিতিক্ষা আর আন্দোলন-সংগ্রামের পরও বিএনপি কেন একই পথে হাঁটল? সান্ত্বনা পুরস্কারের নামে জনগণের করের অর্থ ব্যয়ের উন্মত্ত এই প্রতিযোগিতা কোন বিবেচনায় স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে?
পৃথিবীর সব উন্নত সমাজে স্থানীয় সরকার উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব পালন করে। রাজস্ব আহরণ থেকে শুরু করে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত পুলিশ প্রশাসন স্থানীয় সরকারের হয়ে কাজ করে। স্থানীয় জনপ্রশাসন আইনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। আমাদের প্রিয় দেশে জবাবদিহিতার পরিবর্তে স্থানীয় সরকার আমলাতন্ত্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। সংবিধান আর আইনের বিধিবিধান স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী না করে আমলাতন্ত্রের হাতে নির্ভরশীল হতে বাধ্য করে। ফলস্বরূপ জেলা পরিষদের মতো দন্তহীন প্রতিষ্ঠানগুলো সেবামুখী হওয়ার পরিবর্তে জনসম্পদ অপচয়ের এক বিলাসী মাধ্যম হয়ে ওঠে।
আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘদিন নির্বাসিত ছিলেন! দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্য যা-ই হোক, অতি কাছ থেকে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্থানীয় সরকারকে দেখেছেন। তিনি কি সেই দেশের একটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ উপস্থাপন করতে পারেন, যেখানে করের অর্থের প্রশ্ন জড়িত, অথচ শাসকদলের মনোনয়নে পরিষদ পরিচালিত হয়? প্রতিটি সমাজের রীতিনীতি, রাষ্ট্রের বিধিবিধানে পার্থক্য আছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আর্থিক ব্যয় আর স্বচ্ছতার প্রশ্নে জনমতকে এড়িয়ে ক্ষমতা প্রয়োগের অবারিত সুযোগ কি আছে? উপজেলা পরিষদকে ক্ষমতায়ন করে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা হলে জেলা পরিষদের প্রয়োজনীয়তাটি কোথায়?
যত্রতত্র ক্ষমতাকে সম্প্রসারিত করার ফলাফল এখন জাতির সামনে! একই পথে হাঁটার পরিণতি আরো ভয়ংকর নতুন কিছুর জন্ম দিতে পারে। মৌলিক গণতন্ত্র আর মনোনয়নের গতানুগতিক প্রক্রিয়াটি ছুড়ে ফেলে স্থানীয় সরকারকে পুনর্বাসন নয়, উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার প্রক্রিয়াটি চালু হলে সেটি হতে পারে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অন্যতম মাইলফলক। সদয় সরকার কি গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার স্বার্থে জনমতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সে পথে হাঁটবেন?
লেখক : কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক
mahssan8691@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

