প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং পাঠকের সংবাদ গ্রহণের ধরন বদলে যাওয়ায় সাংবাদিকতা এখন বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যমে চাকরির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে; অন্যদিকে অনলাইন, মাল্টিমিডিয়া, ডেটা জার্নালিজম ও ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের মতো নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। ফলে সাংবাদিকতা পেশা সংকটে পড়েছে, নাকি বদলে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এসব বিষয়ে কথা বলেছেন অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. সামসুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এম এ আহাদ শাহীন
বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা কতটা?
সত্যি কথা বলতে, প্রশ্নটার সহজ কোনো উত্তর নেই। বৈশ্বিকভাবে সাংবাদিকতা এখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে। অক্সফোর্ডের রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে ৫০টির বেশি দেশের সিনিয়র সম্পাদক ও নির্বাহীদের নিয়ে করা এক জরিপে দেখা গেছে, দশজনের মধ্যে চারজনেরও কম আগামী দিনের সাংবাদিকতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। সার্চ ইঞ্জিন থেকে সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে পাঠক কমছে, আর এআই-চালিত উত্তর সরাসরি প্রকাশকের সাইটে না গিয়েই পাঠকের কাছে তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের সবসময় বলি, এই সংকটের মধ্যেই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে। যে কাজগুলো সহজে এআই দিয়ে কপি করা যায় না, যেমন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, গভীর বিশ্লেষণ, মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং—সেগুলোর কদর বরং বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলো এখন রুটিন কনটেন্ট থেকে সরে গিয়ে এ ধরনের স্বতন্ত্র সাংবাদিকতায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতিটা একটু জটিল। ঐতিহ্যবাহী প্রিন্ট পত্রিকায় নিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে ঠিকই, কিন্তু অনলাইন পোর্টাল, টেলিভিশন, ইংরেজি দৈনিক আর ডিজিটাল-ফার্স্ট প্ল্যাটফর্মে নতুন ধরনের পদ তৈরি হচ্ছে—মাল্টিমিডিয়া প্রযোজক, ডেটা জার্নালিস্ট, ফ্যাক্ট-চেকার প্রভৃতি। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ এখন নিয়মিত মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম কর্মশালা ও গণমাধ্যম বিষয়ে মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালাচ্ছে, আর জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশের খসড়াও আলোচনায় আছে—এগুলো ইঙ্গিত দেয়, খাতটাকে আধুনিক ও উন্নত করার চেষ্টা চলছে। ফলে সুযোগ কমেনি, বদলে গেছে। যারা নিজেদের বদলাতে রাজি, তাদের জন্য এখনো এই পেশা সম্ভাবনাময়।
সাংবাদিক হতে চাইলে একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে কোন গুণগুলো থাকা সবচেয়ে জরুরি?
আমার প্রথমেই বলব কৌতূহলের কথা—প্রতিটা জিনিসের পেছনের ‘কেন’ জানার ইচ্ছা। এটা ছাড়া সাংবাদিকতা শুরুই করা যায় না। দ্বিতীয়ত, সততা—শুধু তথ্যের প্রতি নয়, নিজের প্রতিও। তৃতীয়ত, ধৈর্য। একটা ভালো প্রতিবেদন রাতারাতি হয় না, অনেক সময় মাসের পর মাস সূত্র যাচাই করতে হয়। এর সঙ্গে আমি যোগ করব সাহস আর দায়িত্ববোধের মিশেল—নির্ভয়ে সত্য বলার সাহস, কিন্তু সেই সাহস যেন বেপরোয়া না হয়। আর দরকার নিজের ভুল স্বীকার করার বিনয়। যে শিক্ষার্থী মনে করে সে সব জানে, তার শেখার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আমি প্রতিটি ব্যাচে দেখি, যাদের মধ্যে এই বিনয় আর অধ্যবসায় থাকে, তারাই শেষ পর্যন্ত ভালো করে।
সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার শুরু করার জন্য একাডেমিক পড়াশোনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
এখানে আমি একটু ভারসাম্যপূর্ণ উত্তর দেব। ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি সাংবাদিক আছেন, যারা প্রথাগত সাংবাদিকতার ডিগ্রি ছাড়াই বড় হয়েছেন। কাজেই আমি বলব না যে, ডিগ্রি ছাড়া কেউ সাংবাদিক হতে পারবে না। কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতা হলো কাঠামোবদ্ধ পড়াশোনা একটা জিনিস দেয়, যা শুধু বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে সহজে পাওয়া যায় না; যেমন গণমাধ্যম আইন, এথিকস, গবেষণা পদ্ধতি আর সমালোচনামূলক চিন্তার একটা দৃঢ় ভিত্তি। আর এখন, যখন এআই-নির্ভর তথ্যের বন্যায় সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ছে, তখন এই ভিত্তিটা আগের চেয়ে বরং বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে। একাডেমিক পড়াশোনা কাউকে দ্রুত সাংবাদিক বানাবে না, কিন্তু টেকসই সাংবাদিক বানানোর সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
সাংবাদিকতা পড়ার আগে বা পড়ার সময় একজন শিক্ষার্থীর কোন কোন দক্ষতা অর্জন করা উচিত?
আমি সবসময় কয়েকটা জিনিসের ওপর জোর দিই। প্রথমত, লেখা—বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই স্বচ্ছন্দ হওয়া। দ্বিতীয়ত, পড়ার অভ্যাস। যে ছাত্র পত্রিকা-উপন্যাস পড়ে না, তার সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখাই কঠিন। তৃতীয়ত, প্রাথমিক ডিজিটাল দক্ষতা—ছবি ও ভিডিও এডিটিং, সহজ ডেটা বিশ্লেষণ ও স্প্রেডশিট ব্যবহার। এর বাইরে সাক্ষাৎকার নেওয়ার কৌশল, তথ্য অধিকার আইন কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটা জানা, এবং গণমাধ্যম আইন ও এথিক্স সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা—এগুলো শুরুতেই থাকলে পরের ধাপগুলো অনেক সহজ হয়ে যায়। আজকের প্রেক্ষাপটে আমি আরেকটা জিনিস যোগ করব—এআই টুলস কীভাবে ব্যবহার করতে হয় এবং কখন সেগুলোর ওপর ভরসা করা যাবে না, সেই বিচারবোধ। এটা এখন প্রায় মৌলিক দক্ষতার পর্যায়ে চলে গেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের অনেক পত্রিকার নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখলাম, যেখানে সাংবাদিকতা বিষয়কে বাদ দেওয়া হয়েছে, অথবা কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকতা শুধু কিছু টুলস বা টেকনিকের সমষ্টি নয়, এটাও শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে। তাদের বিশেষায়িত বিষয়গুলো, যেমন অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—এসব বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। এসব বিষয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিইডি কোর্স করতে পারে।
একজন ভালো সাংবাদিক হওয়ার জন্য লেখার দক্ষতা, অনুসন্ধানী মনোভাব ও যোগাযোগ দক্ষতার মধ্যে কোনটিকে আপনি বেশি গুরুত্ব দেবেন?
এটা বলা কঠিন। তার পরও যদি আমাকে বেছে নিতে বলেন, আমি বলব অনুসন্ধানী মনোভাব; সেই সন্দেহপ্রবণ, যাচাই-করা-চাই মানসিকতা—সবচেয়ে মৌলিক। কারণ লেখা দুর্বল হলে একজন ভালো সম্পাদক সেটা ঠিক করে দিতে পারেন, কিন্তু কেউ যদি প্রশ্ন করতেই না জানে, তথ্য যাচাই করতেই না চায়, তাহলে লেখার মতো উপাদানই তার হাতে থাকে না। যোগাযোগ দক্ষতা এখানে সেতুর কাজ করে—সূত্রের কাছ থেকে সত্যিকারের তথ্য বের করে আনা, আবার সেই তথ্য পাঠকের কাছে বোধগম্যভাবে পৌঁছে দেওয়া, দুটোতেই এটা লাগে। তিনটাই একে অপরের পরিপূরক, তবে ভিত্তিটা অবশ্যই অনুসন্ধানী চোখ।
বর্তমান সময়ে ডিজিটাল মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাংবাদিকতার ধরন কতটা পরিবর্তন করেছে?
আমূল বদলে দিয়েছে বললেও কম বলা হয়। পাঠক আর হোমপেজে গিয়ে খবর পড়ে না, তারা সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডে বা এআই চ্যাটবটের উত্তরে খবর খুঁজে পায়। বিশ্বব্যাপী গুগল থেকে প্রকাশকদের সাইটে রেফারেল ট্রাফিক উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, আর এই প্রবণতা সামনের বছরগুলোয় আরো বাড়বে বলে সংবাদমাধ্যম নির্বাহীরা মনে করছেন। এর জবাবে বড় সংবাদমাধ্যমগুলো বিজ্ঞাপননির্ভরতা কমিয়ে সাবস্ক্রিপশন ও মেম্বারশিপ মডেলের দিকে ঝুঁকছে।
বাংলাদেশে এর একটা ভিন্ন মাত্রা আছে। আমাদের গণমাধ্যম-সাক্ষরতা এখনো তুলনামূলকভাবে কম, ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিকৃত ছবি বা তথাকথিত ‘ফটোকার্ড’ দিয়ে তৈরি ভুয়া খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে—কখনো কখনো গণমাধ্যমের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম থেকেও। এটা আমার কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। ইতিবাচক দিক হলো, মোবাইল জার্নালিজম ও সলিউশন জার্নালিজমের মতো নতুন ধরনের সাংবাদিকতা তরুণদের জন্য কম খরচে, কম সরঞ্জামে কাজ শুরু করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। প্রযুক্তি একই সঙ্গে ঝুঁকি আর সম্ভাবনা—দুটোই বাড়িয়েছে।
নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য ভিডিও, ফটোগ্রাফি, ডেটা জার্নালিজম বা মাল্টিমিডিয়ায় দক্ষতা কতটা প্রয়োজন?
এটাকে আর বাড়তি যোগ্যতা ভাবার সুযোগ নেই, এখন এটা মূল যোগ্যতার অংশ। বিশ্বজুড়ে ছোট ছোট অনুসন্ধানী দল, এমনকি দু-তিনজনের টিমও এআই-সহায়ক ট্রান্সক্রিপশন, অনুবাদ আর ডেটা বিশ্লেষণের হাতিয়ার ব্যবহার করে এমন কাজ করছে, যা আগে বড় নিউজরুমের একচেটিয়া অধিকার ছিল। এটা তরুণ সাংবাদিকদের জন্য বড় সুযোগ। আমাদের দেশেও প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে জেলাভিত্তিক মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম প্রশিক্ষণ চালাচ্ছে—এটাই বলে দেয় শিল্প কোন দিকে এগোচ্ছে। আমরা শিক্ষার্থীদের বলি, শুধু লেখার হাত ভালো হলে চলবে না; একটা ছোট ভিডিও প্যাকেজ বানাতে জানা, সাধারণ ডেটাসেট থেকে গল্প বের করে আনতে পারা, ভালো ছবি তুলতে জানা—এগুলো এখন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার শর্ত।
শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি কীভাবে সাংবাদিকতার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে?
সবচেয়ে সহজ পথ ক্যাম্পাস মিডিয়া বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউজলেটার দিয়ে শুরু করা। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা হিসেব স্থানীয় অনলাইন পোর্টাল বা কমিউনিটি রেডিওতে ফ্রিল্যান্স হিসেবে লেখা পাঠানো, ছোট ছোট ইভেন্ট কাভার করা—এসবই বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রথম ধাপ। আমি সবসময় বলি, নিজের একটা পোর্টফোলিও, ওয়েবসাইট বা ব্লগ থাকা উচিত, যেখানে নিজের সেরা কাজগুলো জমা রাখা যায়। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা প্রতিযোগিতা ও ফেলোশিপ প্রোগ্রামে অংশ নেওয়াও দারুণ কাজে দেয়। আর প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকদের কাজ নিয়মিত পড়া ও বিশ্লেষণ করা—তারা কীভাবে একটা প্রতিবেদন লেখেন, কোন প্রশ্নগুলো করেন—এই পর্যবেক্ষণও একধরনের শেখা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

