চট্টগ্রামে গণপরিবহনে বিপর্যয়, নগরবাসীর দুর্ভোগ

চট্টগ্রামে গণপরিবহনে বিপর্যয়, নগরবাসীর দুর্ভোগ
ছবি: সংগৃহীত

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামে কার্যত ভেঙে পড়েছে গণপরিবহন ব্যবস্থা। একসময় নগরীর প্রধান সড়কগুলোয় বড় বাস ও মিনিবাস ছিল সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। এখন অধিকাংশ রুটে নিয়মিত বড় বাসের দেখা মেলে না। নগরবাসীর প্রতিদিনের যাতায়াত অনেকটাই নির্ভর করছে ১২ থেকে ১৪ আসনের তিন চাকার ছোট পরিবহনের ওপর। ফলে একদিকে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে একই সড়কে বিপুলসংখ্যক ছোট যান চলাচল করায় তীব্র হচ্ছে যানজট ও সড়কে বিশৃঙ্খলা।

নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, জিইসি, ২ নম্বর গেট, টাইগারপাস, আগ্রাবাদ, অলংকার, একে খান, বারেক বিল্ডিং পতেঙ্গাসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোয় নিয়মিত বড় বাসের সংখ্যা খুবই কম। বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ রুটে দিনে হাতেগোনা কয়েকটি বাস চলাচল করলেও তা যাত্রী চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। সকাল ও সন্ধ্যায় কিছু বড় বাস মূলত তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক পরিবহনে ব্যস্ত থাকে। ফলে সাধারণ যাত্রীদের জন্য গণপরিবহনের সংকট আরো প্রকট হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাস-মিনিবাস চলাচলের জন্য রুট রয়েছে ১৭টি। এসব রুটে বাস-মিনিবাসের রুট পারমিট রয়েছে ২,৯০০টি। এর মধ্যে ফিটনেসবিহীন বাসের সংখ্যা ৮০৩টি। বাস্তবে ফিটনেসবিহীন ও চলাচলের অনুপযোগী গাড়ির সংখ্যা আরো বেশি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

নগরীতে বাস-মিনিবাসের অনুমোদন রয়েছে ১,১৩০টির। টেম্পোর অনুমোদন ২,১৫৮টি, হিউম্যান হলারের ৯৬৯টি এবং সিএনজি অটোরিকশার অনুমোদন রয়েছে ১৩ হাজারটির। চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় বিভিন্ন ধরনের অনুমোদিত যানবাহনের সংখ্যা চার লাখ ২৯ হাজার ১৮৮টি।

কিন্তু অনুমোদিত যানবাহনের পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। নগরীর সড়কে বর্তমানে রিকশার সংখ্যা অন্তত দুই লাখ বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। ১৬টি থানা এলাকায় ৫০ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। এর বাইরে অনুমোদনহীন সিএনজি অটোরিকশা চলছে অন্তত ১০ হাজার। এসব ছোট যানবাহনের আধিক্য নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে অটো টেম্পোসহ বিভিন্ন যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে স্থবিরতা রয়েছে। প্রায় সাত বছর ধরে নতুন করে অটো টেম্পোসহ বিভিন্ন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট বন্ধ থাকায় অনেক যানবাহন গ্যারেজে পড়ে আছে। অন্যদিকে নতুন বাস-মিনিবাসও পর্যাপ্ত সংখ্যায় সড়কে নামছে না।

এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের একদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ছোট যানবাহনে চলাচল করতে হচ্ছে। বাস দাঁড়ানোর নির্ধারিত স্থান না থাকায় অনেক সময় সড়কের ওপর যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। এতে যানজট আরো বাড়ে।

পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সভাপতি ও সিএমপি কমিশনার এবং চট্টগ্রাম মেট্রো আরটিসির সদস্য সচিবের কাছে একাধিকবার লিখিত আবেদন করা হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে নগরীর পরিবহন সংকট দিনদিন আরো জটিল হচ্ছে।

পরিবহন নেতা আলমগীর হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিআরটিএ নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দিচ্ছে না। সড়কে যে পরিমাণ যানবাহনের প্রয়োজন, সে তুলনায় গাড়ি নেই। নতুন গাড়িও দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত সংখ্যায় নামছে না।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের তথ্যানুযায়ী, প্রায় ১২ বছর আগে নগরীতে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র পাঁচ কিলোমিটারে। অর্থাৎ এক যুগের ব্যবধানে নগরীর যানবাহনের গড় গতি চারগুণেরও বেশি কমেছে।

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ১৯৯৫ সালের চট্টগ্রাম মাস্টারপ্ল্যানে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে ফুটপাত উন্নয়ন এবং উন্নতমানের বাস সার্ভিস চালুর মাধ্যমে গণপরিবহন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুপারিশও ছিল। কিন্তু ওই সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, আগের মাস্টারপ্ল্যানগুলোর বাস্তবায়নের ফলাফল কী হয়েছে, তা যাচাই না করেই নতুন নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অথচ নগরীতে কেন ছোট ছোট পরিবহনের সংখ্যা বাড়ছে, কেন বড় গণপরিবহন কমছে—এসব মৌলিক বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না।

সুভাষ বড়ুয়া আরো বলেন, ছোট পরিবহনের আধিক্য, অপরিকল্পিত যান চলাচল এবং দুর্বল গণপরিবহন ব্যবস্থার কারণে যানবাহনের গড় গতি দিনদিন কমছে। বছরের পর বছর বিভিন্ন পরিকল্পনা কাগজে থাকলেও বাস্তবে কার্যকর না হওয়ায় নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়ছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাসের সংখ্যা ও পরিবহনের মান বাড়ানোর দাবি জানানো হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০০১ সালে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হয়। এরপর নতুন নিবন্ধন না হলেও পুলিশকে ম্যানেজ করে মাহিন্দ্রা, টুকটুকিসহ ছোট তিন চাকার যান নগর দখল করেছে। এতে বাসনির্ভর গণপরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মাসুদ আলম বলেন, কোন রুটে কতটি গাড়ি চলাচল করবে তা নির্ধারণ করা আছে। এর বাইরে বিআরটিএ ইচ্ছা করলেই গাড়ির রেজিস্ট্রেশন বা রুট পারমিট দিতে পারে না।

প্রয়োজন পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্ক

নগরবাসীর প্রশ্ন—দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরীতে কেন একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত সিটি বাস নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে না? কেন বড় বাসের পরিবর্তে ছোট তিন চাকার যানবাহনই গণপরিবহনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে?

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, রুটভিত্তিক আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক, নির্ধারিত বাসস্টপ, সময়সূচিভিত্তিক বাস চলাচল এবং কার্যকর রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন যানবাহন সরিয়ে পর্যাপ্তসংখ্যক নতুন বাস নামাতে হবে। এসব উদ্যোগ নেওয়া না হলে জনসংখ্যা ও যাত্রীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামের গণপরিবহন সংকট আরো ভয়াবহ রূপ নেবে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ও যানজট নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। গণপরিবহনের জটলা দূর করতে কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন ও অননুমোদিত যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হচ্ছে। অবৈধ বাসস্টপেজ উচ্ছেদ, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন এবং সড়ক দখলমুক্ত রাখার কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা, পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বিত উদ্যোগের অভাবেই এ সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে অভিযোগ নগরবাসীর। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ যাত্রীরা। প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে যেতে তাদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি সময় ও ভাড়া। পাশাপাশি পোহাতে হচ্ছে নানা বিড়ম্বনা ও দুর্ভোগ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন