আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

স্বাধীন রাষ্ট্রে মানসিক পরাধীনতা

এ টি এম জান্নাতুল মোসনাজ

স্বাধীন রাষ্ট্রে মানসিক পরাধীনতা

রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের বহু বছর পরও কেন একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের বড় অংশ মানসিকভাবে স্বাধীন হতে পারে না; বরং অন্য দেশ বা বড় রাষ্ট্রের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে— এই প্রশ্ন আমাদের অনেকের মনেই বারবার জেগে ওঠে। আরো কষ্টের বিষয় হলো, এরা অনেকেই মুখে স্বাধীনতার কথা বলে ধোয়া তোলেন, কিন্তু নিজেরাই জানেন না যে মানসিকভাবে তারা অন্যের দাসত্বে আটকে আছেন। এটি শুধু আবেগের বিষয় নয়; বরং মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ক্ষেত্র। একাডেমিক পরিভাষায় এই প্রবণতাকে কলোনিয়াল মেন্টালিটি বা মানসিক উপনিবেশবাদ, কালচারাল হেজেমনি, ইন্টারনালাইজড ইনফিরিওরিটি কিংবা সফট পাওয়ার ডমিনেন্স হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব ধারণা মূলত আমাদের বুঝতে শেখায় কীভাবে মানুষ অবচেতন মনে নিজের সমাজ, দেশকে কম সক্ষম মনে করতে শেখে আর অন্য সমাজ বা রাষ্ট্রকে স্বাভাবিকভাবেই শ্রেষ্ঠ হিসেবে কল্পনা করে। রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়েও আমরা ধীরে ধীরে অন্যের বর্ণনা, মানদণ্ড ও প্রভাবের অধীন এক নীরব দাসত্বে আবদ্ধ হয়ে পড়ি।

আমরা যখন দেশের স্বাধীনতার কথা বলি, তখন প্রায়ই মনে করি এটি শুধু দেশের ভূখণ্ড, সীমানা বা সংবিধানের বিষয়। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে স্বাধীনতার সবচেয়ে গভীর স্তরটি আসলে দেশের নাগরিকদের মানসিক স্বাধীনতা। এই মানসিক মুক্তি ছাড়া রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না। আর তাই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে, ভৌগোলিকভাবে ও সাংবিধানিকভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা সবাই কি সত্যিকার অর্থে মানসিকভাবে স্বাধীন হতে পেরেছি? নাকি বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রে বসবাস করেও আমাদের অনেকে অন্য রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও বর্ণনার প্রতি মানসিকভাবে অনুগত হয়ে আছে? এই প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের অনেক উপনিবেশ-পরবর্তী দেশের জন্য প্রযোজ্য।

বিজ্ঞাপন

এই মানসিক দাসত্ব বা পরাধীনতার পেছনে রয়েছে বহু দৃশ্যমান ও অদৃশ্য কারণ। এসব কারণের সম্মিলিত প্রভাব মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে চলে এবং অবচেতন মনে পরবর্তী প্রজন্মকেও একই মানসিক কাঠামোর মধ্যে গড়ে তোলে। প্রথমত, এই পরাধীন মানসিকতার পেছনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা যারা সাধারণ জনগণ, তারা সাধারণত ঔপনিবেশিক শাসনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক দিকগুলো জানি বা বিভিন্ন সময় এসব নিয়ে নিয়ে আলোচনা করি। এমনকি বর্তমান সময়েও যে সেই শাসনের ছায়া আমাদের তাড়া করছে, এ কথা অনেকেই স্বীকার করি। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসন যে শুধু রাষ্ট্রব্যবস্থাই নয়, মানুষের চিন্তাধারা, আত্মমূল্যবোধ এবং ‘উন্নত-অনুন্নত’ ধারণাকেও গভীরভাবে পুনর্গঠন করেছে এবং সেই মানসিক বোঝা আমরা আজও বহন করছি, এই দিকটি নিয়ে আমাদের সচেতনতা যেমন কম, তেমনি আলোচনা করতেও অনীহা।

ফ্রান্টজ ফ্যাননের ‘ব্ল্যাক স্কিন হোয়াইট মাস্ক’ গ্রন্থে এ বিষয়ে গভীর ধারণা পাওয়া যায়। ফ্যানন দেখিয়েছেন, কীভাবে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে একসময় উপনিবেশকারীদের বা শাসকের চোখ দিয়েই নিজেকে দেখতে শুরু করে। এমনকি, একপর্যায়ে তারা উপনিবেশকারীদের মূল্যবোধকে নিজের ভেতর আত্মস্থ করে ফেলে এবং নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে নিকৃষ্ট বলে ভাবতে শুরু করে। দুঃখের বিষয়, এই মানসিক কাঠামো রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায় না; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই এই কলোনিয়াল মেন্টালিটির কারণে পরাধীন মানসিকতার মানুষ উপনিবেশকারীদের বদলে অন্য কোনো বৃহৎ রাষ্ট্রকে সেই স্থানে বসিয়ে দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ১৯৪৭-এর ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টি, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং এমনকি সাম্প্রতিক ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এই মানসিকতাকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলতে পারেনি।

ওয়াল্টার মিগ্নোলো ও ক্যাথরিন ওয়ালশ তাদের ‘অন ডিকোলোনিয়ালিটি’ বইয়ে তুলে ধরেছেন, উপনিবেশ-পরবর্তী দেশগুলোয় বিদেশি ভাষা, উচ্চারণ, পোশাক কিংবা জীবনধারা কীভাবে সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীকে পরিণত হয়। এর ফলে নিজের সংস্কৃতি ও জ্ঞানব্যবস্থা অবচেতনে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ বলে বিবেচিত হতে থাকে। আমাদের সমাজে এর উদাহরণ প্রচুর যেমন, ইংরেজি ভাষার প্রতি অত্যধিক মোহ, যা কখনো কখনো নিজের মাতৃভাষাকে খাটো করে। অথবা বিদেশি ব্র্যান্ডের পোশাক বা খাবারকে ‘উন্নত’ মনে করা, নিজের ঐতিহ্যকে ‘পুরোনো’ বলে উপেক্ষা করা।

একটি দেশ কীভাবে চিন্তা করবে, তা অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। আমাদের দেশের অনেকের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক মাদরাসাশিক্ষার প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা লক্ষ করা যায়। অথচ অনেকেই জানি না যে ইউরোপে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার অনেক কাঠামো গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের মাদরাসাগুলোর বড় ভূমিকা ছিল, যা আমরা জর্জ ম্যাকদিসির বই ‘দ্য রাইজ অব কলেজেস’ থেকে বিশদভাবে জানতে পারি। একইভাবে আমরা ভুলে যাই আমাদের নিজেদের জ্ঞান-ঐতিহ্যের কথা, নালন্দা বা সোমপুর বিহারের মতো প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর গৌরবময় ইতিহাস। পর্তুগিজ সমাজবিজ্ঞানী বোয়াভেন্তুরা দে সোসা সান্তোস এই প্রেক্ষাপটে ‘এপিস্টেমিসাইড’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ দাঁড়ায় নিজস্ব জ্ঞানব্যবস্থার নীরব হত্যাকাণ্ড। যখন পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় জ্ঞানকে মুছে ফেলে তার জায়গায় একটি প্রভাবশালী জ্ঞানব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন ভিন্ন কোনো চিন্তার টিকে থাকার সুযোগ আর থাকে না।

বিশ্বায়নের যুগে এই মানসিক প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো গণমাধ্যম। এই মানসিক প্রভাব বিস্তারকে অনেকে মাইন্ড কন্ট্রোল হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিনোদনশিল্প, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্দিষ্ট কিছু রাষ্ট্রের জীবনধারা, ভোগসংস্কৃতি এবং মূল্যবোধকে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘আদর্শ’ হিসেবে উপস্থাপন করে।

এর ফলে নিজের অর্জনকে খাটো করে দেখা এবং অন্য দেশের সমস্যাকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। সুনিল ভাটিয়ার গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক মিডিয়া ও পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব দক্ষিণ এশীয় তরুণদের মধ্যে গভীর পরিচয় সংকট সৃষ্টি করছে। এতে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অথচ যে সংস্কৃতি তারা অনুকরণ করে, তার পূর্ণ অংশও হতে পারে না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই চিত্র নতুন নয়। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়েও সমাজের একটি অংশ এখনো নিজেদের সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে তুচ্ছ করে প্রতিবেশী দেশের সংস্কৃতি এবং বিনোদনকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা হলিউড বা বলিউডের সিনেমা, গান ও ফ্যাশনের অন্ধ অনুকরণ করে, যার ফলে নিজেদের শিল্পী এবং সংস্কৃতিকে প্রায়ই অবমূল্যায়ন করা হয়। আরো ভয়ংকর বিষয় হলো, একসময় আমাদের দেশের শিল্পী ও সাংস্কৃতিককর্মীরাও নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়ে অন্য সংস্কৃতির অনুকরণে ঝুঁকে পড়েন এবং অজান্তেই এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অংশ হয়ে ওঠেন। এই প্রবণতা ধীরে ধীরে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ বা ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’-এর রূপ নেয়। এটাই মানসিক উপনিবেশবাদের সবচেয়ে সূক্ষ্ম রূপ যেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও মানসিক স্বাধীনতা এখনো অধরা রয়ে যায়।

এই মানসিকতা আরো গভীর হয় শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার কারণে। যখন বিদেশি উচ্চারণ, বিদেশি জীবনধারা কিংবা বিদেশি রুচিকে সমাজে সম্মান ও সাফল্যের মানদণ্ডে পরিণত হয়, তখন তা আর নিছক ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় থাকে না। ধীরে ধীরে এটি এমন এক সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হয়, যেখানে নির্দিষ্ট পরিচয় ও আচরণই বেশি মূল্য পায়। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বোর্দিয়ু একে কালচারাল ক্যাপিটাল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যার মাধ্যমে ক্ষমতা ও শ্রেণিবৈষম্য আরো শক্তিশালী হয়।

অর্থনৈতিকভাবেও শক্তিশালী দেশ ও বহুজাতিক করপোরেশনগুলো যখন বাংলাদেশের মতো দেশের বাজার, পণ্য এবং প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করে, তখন স্থানীয় উৎপাদন, উদ্যোগ ও জ্ঞানকে নিকৃষ্ট মনে করা হয় আর বিদেশি সবকিছুকে ‘উন্নত’ ও ‘আধুনিক’ হিসেবে দেখা হয়। ফলে মানুষ সচেতন বা অচেতনভাবে বিদেশি মানদণ্ড মেনে নেয় এবং নিজের সংস্কৃতি-ক্ষমতাকে কম মূল্যায়ন করতে শেখে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই প্রভাব স্থানীয় শিল্প ও জ্ঞানকে দমিয়ে মানসিক নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি তৈরি করে, যা ওরিয়েন্টালিজম-প্রভাবিত আধিপত্যকে আরো দৃঢ় করে।

অ্যাডওয়ার্ড সাইদের ওরিয়েন্টালিজম বইয়ে দেখা যায়, প্রভাবশালী সংস্কৃতি অন্যকে ‘অনুন্নত’ করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব তৈরি করে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরও মানুষের চিন্তাজগতে টিকে থাকে। এই ওরিয়েন্টালিস্ট মানসিকতার প্রভাবে স্থানীয় সংস্কৃতির অনেক মৌলিক উপাদান পরিকল্পিতভাবে অথবা অবচেতন মনে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়। যেমন : হিজাবকে অনেক সময় ‘পশ্চাৎপদতা’ বা ‘দমনমূলক’ প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা সচেতনভাবে বা অবচেতন মনে প্রভাবশালী পশ্চিমা কিংবা আঞ্চলিক সংস্কৃতির আধিপত্যকেই আরো শক্তিশালী করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই মানসিকতা পুরোপুরি অচেনা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কয়েকজন সদস্যের ক্ষেত্রে হিজাব পরিধানকে কেন্দ্র করে যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ও সমালোচনার কথা গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে, তা শুধু ব্যক্তিগত অসহিষ্ণুতার উদাহরণ নয়। বরং এটি সেই গভীরভাবে প্রোথিত মানসিক আধিপত্যেরই প্রকাশ, যেখানে নির্দিষ্ট একটি জীবনধারা বা সংস্কৃতিকেই ‘আধুনিকতা’ ও ‘এলিট পরিচয়’-এর একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়। এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত ভিন্নতাকে সহনশীলতার চোখে না দেখে, প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক বয়ানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে, যা আসলে ওরিয়েন্টালিজম-প্রভাবিত সাংস্কৃতিক আধিপত্যেরই একটি বাস্তব প্রতিফলন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা দরকার যে, অন্য দেশ থেকে ভালো কিছু শেখা, প্রযুক্তি গ্রহণ করা বা ভালো উদাহরণ অনুসরণ করা মানসিক দাসত্ব নয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা চীন পশ্চিমা জ্ঞান ও প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে, কিন্তু নিজের আত্মবিশ্বাস বিসর্জন না দিয়ে বরং নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে আরো শক্তিশালী করেছে। সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন শেখার প্রক্রিয়া সচেতন গ্রহণের বদলে অন্ধ অনুকরণে পরিণত হয়। ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশির ভাষায়, এ অবস্থাই হলো হেজেমনি, যেখানে আধিপত্য জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয় না; বরং মানুষের চিন্তা, রুচি ও বিশ্বাসের ভেতরে এমনভাবে ঢুকে পড়ে যে, মানুষ নিজেই তাকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করতে শুরু করে।

একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে তার আত্মবিশ্বাসের ওপর। রাজনৈতিক স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি মানসিক স্বাধীনতাও। মানসিক পরাধীনতা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক এবং কাঠামোগত সমস্যা। আর কাঠামোগত সমস্যার সমাধানও হতে হবে কাঠামোগত—শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে নিজের ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া, গবেষণার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা বাড়ানো এবং সর্বোপরি নিজের চোখে নিজেকে দেখার সাহস জাগানো। মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান এর আলোকে আমরা দেখি যে, দীর্ঘ সময় ধরে নিজের দেশকে অযোগ্য বা নিকৃষ্ট হিসেবে দেখার মানসিকতা মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাসহীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং সৃজনশীলতার ঘাটতি তৈরি করে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক বিকাশকে ব্যাহত করে।

বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির পথে দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে চলেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর ও অবকাঠামো উন্নয়নের সূচকে আমরা বিশ্বমঞ্চে উপস্থিতি জানান দিচ্ছি। কিন্তু মানসিক আত্মবিশ্বাস ছাড়া এ অগ্রগতি টেকসই হবে না। কারণ প্রকৃত স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রের সীমানা বা আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি গভীরভাবে সমাজের মানসিকতা, সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ভিন্নতার প্রতি সহনশীলতার সঙ্গে যুক্ত। একটি দেশ তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়ে ওঠে, যখন সে নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণ করতে পারে, অন্য কারোর মানদণ্ডে নিজেকে মাপার প্রয়োজন ছাড়াই। আর সেই স্বাধীনতার পূর্ণতা তখনই আসে, যখন দেশটি অন্যের কাছ থেকে শেখে, জ্ঞান ও প্রযুক্তি গ্রহণ করে, কিন্তু তা করতে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব এবং আত্মমর্যাদাকে বিসর্জন দেয় না। এই উপলব্ধি আমাদের ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ যে মানসিক কাঠামো আমরা গড়ে তুলছি, সেটিই আগামী প্রজন্মের চিন্তা, আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি হয়ে উঠবে। তাই আমাদের এমন একটি দেশ গড়তে হবে, যেখানে স্বাধীনতা শুধু ভৌগোলিক সীমা বা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা মানসিক স্তরেও বাস্তবায়িত হবে।

লেখক : ম্যানেজার (আর অ্যান্ড ডি), সিসমিক লিমিটেড

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন