করজালে খুচরো দোকানি, বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন

করজালে খুচরো দোকানি, বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন

প্রথমবারের মতো দেশের খুচরো দোকানিদের করজালের আওতায় এনেছে সরকার। উৎপাদনকারী বা আমদানিকারকের কাছ থেকে ক্রয় করা পণ্যমূল্যের ওপর শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর পরিশোধ করবেন খুচরো দোকানিরা। অর্থাৎ, প্রতি এক হাজার টাকার পণ্য ক্রয় করলে খুচরো দোকানদারকে দুই টাকা আয়কর দিতে হবে। করজাল বিস্তৃতির মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পণ্যমূল্যের শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে খুচরো দোকানদারদের কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর আদায়ে আয়কর আইন-২০২৩ সংশোধন করে ১২৭(খ) নামে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এ হিসাবে প্রতি এক হাজার টাকার পণ্য কিনলে খুচরো দোকানদারকে দুই টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

তারা বলছেন, অনেক করদাতা এখনো করজালের আওতার বাইরে রয়ে গেছেন। ফলে যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের উপরই করের ভার চাপানো হচ্ছে; কিন্তু সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য বাড়ছে। এজন্য করের আওতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

আদায় হবে অ্যাপের মাধ্যমে

রাজস্ব কর্মকর্তারা জানান, পাইকারি বিক্রেতা যখন বিক্রীত পণ্যের মূল্য সংগ্রহ করবেন, তখনই তিনি খুচরো দোকানদারের কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর সংগ্রহ করবেন। আদায় করা হবে অ্যাপের মাধ্যমে এবং এটি তৈরি করবে এনবিআর। তবে অ্যাপ তৈরির বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি তৈরিতে কমপক্ষে তিন মাস সময় লাগতে পারে। অ্যাপ তৈরি হলেও এটির ব্যবহার বিষয়ে অংশীদারদের প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়নে আরো কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। ফলে আইন তৈরি হলেও এটির বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ বলেই মনে করছেন তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এনবিআরের যেসব ভেন্ডর রয়েছে, তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। এছাড়া উৎপাদনকারী বা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করতে হবে এবং তাদেরও মতামত নিতে হবে।

তিনি বলেন, এনবিআর অ্যাপ তৈরি করলেও এটি ব্যবহার করবে কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি বা এজেন্টরা। সুতরাং তাদের মতামতও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া অগ্রিম আয়কর আদায়ের জন্য অসংখ্য এ-চালান তৈরি হবে, যা আইভাস সিস্টেমে যুক্ত হবে। ফলে আইভাস সিস্টেম শক্তিশালীকরণও এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতোমধ্যে আমরা আইভাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছি এবং তারা এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে।

কর্মকর্তারা জানান, অ্যাপ তৈরি হলে সেটি গুগল ড্রাইভ বা প্লে স্টোরে থাকবে। খুচরো দোকানদারের কাছ থেকে আয়কর আদায়ে পণ্য আমদানিকারক কিংবা পণ্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা তাদের কোনো প্রতিনিধি, এজেন্ট বা যে নামেই ডাকা হোক না কেন, তারা সেটি ডাউনলোড করে নেবেন। সেই অ্যাপ ব্যবহার করেই খুচরো বিক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর সংগ্রহ করা হবে।

যেভাবে আদায় হতে পারে

অ্যাপের মাধ্যমে আয়কর আদায়ের একটি রূপরেখা তৈরি করছে এনবিআর। রূপরেখা অনুযায়ী উৎপাদনকারী বা আমদানিকারক প্রতিনিধির কাছ থেকে কেনা পণ্যের মূল্য পরিশোধের সময় খুচরো দোকানদার শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে আয়কর প্রদান করবেন। এজন্য খুচরো দোকানদারের ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বরের (টিআইএন) বিপরীতে এনবিআরের তৈরিকৃত অ্যাপে একটি ‘এ’ চালান তৈরি হবে। ওই ‘এ’ চালানে পণ্য বিক্রি, আদায় ও আয়করের পরিমাণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত থাকবে। তারপর সে চালানের একটি সফট কপি হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্য কোনো মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দোকানদারের কাছে পাঠানো হবে। যদি কোনো দোকানদারের টিআইএন না থাকে, তাহলে ‘এ’ চালানের সংক্ষিপ্ত তথ্য এসএমএসের মাধ্যমে ওই দোকানদারের কাছে পাঠানো হবে।

এছাড়া প্রতি মাসে একজন দোকানদারের কাছ থেকে কি পরিমাণ অগ্রিম আয়কর আদায় হয়েছে, তার তথ্যও সংশ্লিষ্ট দোকানদারের মোবাইল নম্বরে পাঠানো হবে। এভাবে ত্রৈমাসিক, অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে তথ্য পাঠাবে এনবিআর। ফলে একজন দোকানি তার কাছ থেকে কি পরিমাণ আয়কর হিসেবে কেটে নেওয়া হয়েছে, সেটি জানতে পারবেন। বছর শেষে যদি খুচরো দোকানদারের কাছ থেকে অগ্রিম কর হিসেবে অতিরিক্ত কর কেটে নেওয়া হয়, তাহলে অতিরিক্ত অর্থ রিফান্ড বা ফেরত পাবেন। সেক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে

অ্যাপ তৈরি হলেও এটির বাস্তবায়ন নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, দেশে দোকানদারের সংখ্যা কত, তার কোনো গ্রহণযোগ্য তথ্যভান্ডার নেই। অপরদিকে এমন অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদেরও টিআইএন নম্বর নেই। ফলে তারা কীভাবে খুচরো দোকানদারদের কাছ থেকে আয়কর আদায় করবে—এটা এক বড় প্রশ্ন। এছাড়া এ ধরনের একটি কার্যক্রম বাস্তবায়নের আগে পরীক্ষামূলক (পাইলটিং) কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে।

চলতি অর্থবছরে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে যদি সফল হওয়া যেত, তাহলে পর্যায়ক্রমে এটি বাস্তবায়ন করা যেত। কিন্তু প্রথম বছরেই সারা দেশের খুচরো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অ্যাপের মাধ্যমে আয়কর আদায় কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এছাড়া নেটওয়ার্কজনিত সমস্যার কারণেও এই আদায় কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।

আলোচনায় ইএফডি ও ইসিআর পদ্ধতির ব্যর্থতা

অ্যাপের মাধ্যমে আয়কর আদায়ের উদ্যোগের মধ্যে অতীতে খুচরো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায়ে উদ্যোগের ব্যর্থতার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। খুচরো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায়ে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) এবং ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) পদ্ধতি চালু করেছিল এনবিআর। কিন্তু এগুলোর মাধ্যমে ভ্যাট আদায়ে তেমন সফলতা পাওয়া যায়নি।

খুচরো ও পাইকারি ব্যবসায় ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যে ২০০৯ সালে প্রথম ইসিআর ব্যবস্থা চালু করা হয়। ইসিআর মেশিনগুলো অফলাইনে হওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য বিক্রির তথ্য গোপন করার সুযোগ ছিল। এছাড়া মনিটরিংয়ের অভাব এবং মেশিনের বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটির কারণে ২০০৯ সালের এ উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়। ইসিআর ব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ার পর ২০১৮ সালে এনবিআর ইএফডি চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২০২০ সালের আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যক্রম শুরু হয়।

এনবিআর যে হারে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন বসানোর পরিকল্পনা করেছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কম মেশিন স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। দোকান মালিকদের পক্ষ থেকে ইএফডি ব্যবহারের প্রতি এক ধরনের অনাগ্রহ দেখা গেছে। একটি মার্কেটের মাত্র কয়েকটি দোকানে ইএফডি থাকায় ক্রেতাদের ওইসব দোকান থেকে পণ্য কেনায় অনাগ্রহ দেখা দেয়। ফলে দুটি উদ্যোগই ব্যর্থ হয়। এর মধ্যে নতুন করে আয়কর আদায় কতটা সফল হবে—এ নিয়ে সংশয় রয়েছে।

পাঁচ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য

অগ্রিম আয়করের মাধ্যমে খুচরো দোকানিদের কাছ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা আদায় সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, বাংলাদেশের খুচরো ব্যবসার পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন ডলারের। এর ৫০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৫০ বিলিয়নও আদায় করতে পারলে পাঁচ হাজার কোটি টাকার মতো কর আদায় সম্ভব। ১৫০ বিলিয়নের খুচরো বাজার থেকে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে কর আদায় করা হলে তার পরিমাণ হবে তিন হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। যদি আরো বেশি আদায় করা সম্ভব হয়, তাহলে এর পরিমাণ চার হাজার কোটি টাকার বেশি হবে। তারা আরো বলেন, উৎপাদনকারী বা আমদানি প্রতিষ্ঠান সরাসরি খুচরো দোকানিদের কাছে পণ্য বিক্রি করে না। তারা এজেন্টের মাধ্যমে খুচরো দোকানিদের কাছে পণ্য বিক্রি করে। সাধারণত দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের এজেন্টের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। তবে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এজেন্টের মাধ্যমে পণ্য বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করে থাকে। এখন যদি এজেন্টের কাছ থেকেও নির্ধারিত হারে আয়কর আদায় করা যায়, তাহলে বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।

খুচরো দোকানিদের কাছ থেকে আয়কর আদায় করতে ব্যর্থ হলে কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আয়কর কর্মকর্তারা বলছেন, তাহলে উৎপাদনকারী বা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাসহ সেটি পরিশোধ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

আয়কর আদায়ে এনবিআরের উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কর বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসির প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার স্নেহাশীষ বড়ুয়া আমার দেশকে বলেন, এনবিআর যদি অ্যাপের মাধ্যমে আয়কর আদায় করতে চায়, তাহলে এটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত। তা না হলে কোম্পানিগুলো নন-কমপ্লায়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হবে। আর খুচরো বিক্রেতার কাছ থেকে আয়কর আদায় করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত তা কোম্পানির কাছ থেকে আদায় করতে হতে পারে। এতে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন