জুলাই ফিরে এলেই আসবে সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি। ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে লেখা স্লোগান, মিছিলের গর্জন, হল-আবাসিক শিক্ষার্থীদের রাত জাগা, পুলিশের বাধা আর রাজপথে শিক্ষার্থীদের দৃঢ় অবস্থান—সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব সময়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন সূচনা করেছিলেন, তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ক্যাম্পাসের পরিচিত প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও সংহতির কেন্দ্র। কারো হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, কারো কণ্ঠে স্লোগান; কেউ আহত হয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন প্রিয় সহপাঠী। একপর্যায়ে সেই আন্দোলন রূপ নেয় বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানে। এক বছর পর ফিরে দেখা সেই জুলাই তাই শুধু আন্দোলনের দিনপঞ্জি নয়—ফিরে দেখা ক্যাম্পাসের সেই তরুণদের, যাদের সাহস, ত্যাগ ও প্রত্যয় জুলাইয়ের ইতিহাসকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। সবার মতামত তুলে ধরেছেন উম্মে কায়নাত আফরাহ

জুলাইয়ের প্রতিটি লড়াইয়ে সামনে ছিলাম
মমিনুল ইসলাম জিসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কোটাপ্রথা বিলোপের দাবিতে সংগঠিত ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছি। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনেও প্রথম দিন থেকেই রাজপথে ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিছিল থেকে শুরু করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে আহতদের চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতা করেছি। এরপর আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছি।
১৯ জুলাই রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি। পরদিন ২০ জুলাই কারফিউ ভেঙে আবারও রামপুরায় আন্দোলন জোরদার করি। ওই দিন সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্কের সামনে নিজের পরা স্যান্ডো গেঞ্জি খুলে সাদা পতাকা বানিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একাত্মতা তৈরির চেষ্টা করেছিলাম। মালিবাগ, কাকরাইলসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। ৩ আগস্ট ছিল আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি হলের তালা ভেঙে শিক্ষার্থীদের জন্য হল খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিই। রামপুরা থানার সামনে গুলির মুখেও পড়েছি; একপর্যায়ে মনে হয়েছিল হয়তো আর বেঁচে ফিরতে পারব না। শাহবাগ, আজিমপুর, চানখারপুল, পলাশী, ঢাকা মেডিকেল—আন্দোলনের এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল না, যেখানে আমার উপস্থিতি ছিল না।
গায়েবানা জানাজার দিনও ছিলাম রাজপথে। হামলার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও ৫০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে শহীদ মিনারে জানাজায় অংশ নিই। সেই সময় একজনের পক্ষেও একা আন্দোলন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।
৫ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে শাহবাগ হয়ে গণভবনের দিকে যাই। শেষ পর্যন্ত গণভবন অভিমুখী সেই বিজয়যাত্রার অংশ হতে পেরেছি। মহান আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া—এত তাজা প্রাণের বিনিময়ে, জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে আমরা ফ্যাসিবাদমুক্ত হতে পেরেছি। জুলাইয়ের সেই দিনগুলো আমার কাছে শুধু একটি আন্দোলনের স্মৃতি নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার, ত্যাগ স্বীকারের এবং বিজয় ছিনিয়ে আনার এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা।

জুলাইয়ের আত্মত্যাগ পূর্ণতা পাবে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়
শাহাব উদ্দিন চৌধুরী, কক্সবাজার সরকারি কলেজ
জুলাইয়ের আত্মত্যাগ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন রাষ্ট্র সর্বস্তরের নাগরিকের অধিকার ও সম্মান বৈষম্যহীনভাবে সুরক্ষিত করতে সক্ষম হবে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। শত শত ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগ, অকাতরে জীবনদান এবং অদম্য সাহসের স্মৃতি আমাদের জাতীয় চেতনায় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে থাকবে।
জুলাইয়ের ১৬ তারিখের পর কোটা সংস্কারের আন্দোলন দ্রুত এক দফা দাবির আন্দোলনে রূপ নেয়। এরপর ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ, সাহস ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে ৩৬ জুলাই দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছে চব্বিশের জুলাই। তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষ প্রমাণ করেছে, ঐক্যবদ্ধ হলে যেকোনো স্বৈরাচারী শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব।
এই আন্দোলনের মূল প্রত্যাশা ছিল কেবল ক্ষমতার রদবদল নয়; বরং অন্যায্য ব্যবস্থার অবসান ও রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক সংস্কার। একটি গণতান্ত্রিক, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণই ছিল গণমানুষের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা, যেখানে মেধার মূল্যায়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্জিত সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনকে রক্ষা করে জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ত্বরান্বিত করা, আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
আবু সাঈদ, ওয়াসিমসহ নাম না জানা শত শত শহীদ এবং আহত ভাইবোনের রক্তে ভেজা জুলাইয়ের দিনগুলো আমাদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সেই দিনগুলোই আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা হয়ে থাকবে। জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে অর্থবহ করতে হলে রাষ্ট্রকে এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো নাগরিক বৈষম্য, অন্যায় কিংবা অধিকারহীনতার শিকার না হন।

মেয়েরাও থামেনি জুলাইয়ের লড়াইয়ে
সাইয়েদা হাফছা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
কোটা সংস্কারের দাবি ছিল একটি যৌক্তিক আন্দোলন। তাই শুরু থেকেই আমরা এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছি। ২০২৪ সালের আন্দোলনেও আমাদের অবস্থান একই ছিল। আমাদের সংগঠনের সদস্যরা ৭ জুলাই থেকেই অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ নেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল থেকেই নারী শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যুক্ত হন।
১৪ জুলাই রাতে বেগম খালেদা জিয়া হলের ছাত্রীরা হলের তালা ভেঙে বেরিয়ে মিছিলে যোগ দেন। অন্য হলগুলোর ছাত্রীরাও একইভাবে বেরিয়ে এসে আন্দোলনে শামিল হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলনে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। সেদিন কেউ লাঠি, কেউ মরিচের গুঁড়া, আবার কেউ বেডের স্ট্যান্ড হাতে নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। হলে অবস্থানরত প্রায় সবাই দলে দলে আন্দোলনে যুক্ত হন।
১৬ জুলাই সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দ এবং গ্যাসের প্রভাব মেয়েদের হল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে—ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে আসছে। এতে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
সেদিন রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরদিন সকাল থেকে অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ছাড়তে শুরু করেন। তবে কিছু সাহসী ছাত্রী হল না ছাড়ার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের নির্দেশে তাদেরও হল ছাড়তে হয়।
হল ছাড়তে হলেও আন্দোলন থামেনি। ক্যাম্পাসের বাইরে থেকেও আমরা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। ভয়, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা—সবকিছুর মধ্যেও আমরা পিছু হটিনি। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যে বিজয় এসেছে, সেই বিজয়ের অংশ হতে পারাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

জুলাইয়ের স্বপ্ন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের পরিবর্তন
জাহিদুল ইসলাম শিহাব, ঢাকা কলেজ
জুলাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম। তরুণদের সাহস, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং বহু মানুষের আত্মত্যাগে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলন ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। জুলাই এলেই ফিরে আসে এক অস্থির সময়ের স্মৃতি। রাজপথে শিক্ষার্থীদের স্লোগান, টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়া, আতঙ্কে ছুটে চলা মানুষ, আহতদের আর্তনাদ এবং হাসপাতালের করিডোরে স্বজনদের উদ্বিগ্ন অপেক্ষা—সবকিছুই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আন্দোলনের দিনগুলো ছিল উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা, আশা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় ভরপুর।
চব্বিশের জুলাইয়ের একজন সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল, তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে? মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। পরিবর্তনের অর্থ শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ করে তোলাও এর অংশ। বর্তমান সরকার এসব প্রত্যাশা বাস্তবায়নে কাজ করছে। তবে এখনো বেশ কিছু ঘাটতি রয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের এই প্রক্রিয়াকে আরো এগিয়ে নেওয়া জরুরি। জুলাইয়ের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সংলাপ, সহনশীলতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ইতিহাসের এই অধ্যায়কে শুধু দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষার জায়গা হিসেবে ধারণ করতে হবে। কারণ একটি আন্দোলনের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন তার চেতনা রাষ্ট্র ও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে প্রতিফলিত হয়। অধিকার আদায়ের পথ কঠিন হতে পারে, কিন্তু সেই পথের প্রতিটি ত্যাগ জাতির বিবেককে দীর্ঘদিন আলোড়িত করবে।

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটেও থামেনি রাবি
সালাউদ্দিন আম্মার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে একটি নাটকীয় অধ্যায় রয়েছে। কয়েকবার কমিটি গঠন, ভেঙে দেওয়া এবং আবার নতুন করে কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো বদলেছে। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। আন্দোলনের প্রায় প্রতিটি দিনেই রাবির কোনো না কোনো অবদান ছিল।
আমাদের কিছু স্বতন্ত্র ইতিহাসও রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ১৬ জুলাই ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করা। ১৮ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময়টিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তখন দেশের মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছিল না। আমরা ভারতীয় সিম ব্যবহার করে দেশের বাইরে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের রেমিট্যান্স বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছি। আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রবাসীরা বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের মিশন ও হাইকমিশনের সামনে কর্মসূচি পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এরপর কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসা এবং ‘শেইম শেইম ডিক্টেটর’ স্লোগানও রাজশাহী থেকে ছড়িয়ে পড়ে। ২৯ জুলাই কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিই, পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির আগেই আমরা মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেব। রেডিও বেতার মাঠের পাশে গাছের আড়ালে লুকিয়ে ছিলাম, উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষকরা এলে তাদের সঙ্গে সামনে যাওয়া।
সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ কয়েকজন শিক্ষক মূল ফটকের সামনে উপস্থিত হন। শিক্ষার্থীরাও সাহস করে মাজার এলাকা পেরিয়ে ফটকের সামনে জড়ো হন। সেখানে পুলিশ স্লোগান না দেওয়ার নির্দেশ দিলেও শিক্ষকরা তা প্রত্যাখ্যান করে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান। এরপর ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থী সম্মিলিত কণ্ঠে স্লোগান দিতে থাকেন—‘নির্লজ্জ ভিসি পদত্যাগ করতে হবে’, ‘তুমি কে, আমি কে—সমন্বয়ক, সমন্বয়ক।’
এরই মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে একটি ইংরেজি স্লোগান মাথায় আসে। আমরা এমন একটি স্লোগান দিতে চেয়েছিলাম, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও পৌঁছাবে। আমি বলি, ‘শেইম শেইম’; অন্যরা জবাব দেয়, ‘ডিক্টেটর।’ মুহূর্তের সেই স্লোগান পরে আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়। আমরা দেখিয়েছিলাম, নেতৃত্ব হারিয়ে গেলেও আন্দোলনের চেতনা হারিয়ে যায় না। দুঃখের বিষয় হলো, এসব ইতিহাস অনেক সময় সামনে আসে না। এগুলোকে নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখা হয়। অথচ জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল আরো বিস্তৃত। আমরা মৌলিক কিছু সংস্কার চাই—পুলিশ ও প্রশাসনের সংস্কার, গণমাধ্যমের সংস্কার। গণমাধ্যম যেন যা ঘটেছে, সেটিই তুলে ধরে। একই সঙ্গে ছাত্ররাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণকারী শিক্ষক রাজনীতিরও অবসান চাই। জুলাইয়ের চেতনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটবে।

জুলাইয়ের অর্জন রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব
সাগর উল ইসলাম, কক্সবাজার সিটি কলেজ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলন। হাজারো মানুষের রক্ত, আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। বহু মানুষের কাছে এটিই ছিল গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিকামী মানুষ রাজপথে নেমেছিল, তার সবটুকু বাস্তবায়িত না হলেও বাংলাদেশপন্থি রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য এবং আন্দোলনের ঐতিহাসিক অর্জন অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
অনেকে নানা ধরনের বয়ান তৈরি করে গণঅভ্যুত্থানকে ছোট করার চেষ্টা করেন। বিচ্ছিন্ন কিছু অপকর্ম বা লুটপাটের অভিযোগ দিয়ে এত বড় একটি গণআন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে খাটো করা যায় না। ইতিহাসের প্রতিটি বড় বিপ্লবেই বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।
তবে আজকের বড় উদ্বেগ হলো, অতীতের শাসকগোষ্ঠী আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। জুলাইয়ের আত্মত্যাগের প্রতি সত্যিকারের সম্মান দেখাতে হলে গণহত্যাসহ সব মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র।
প্রায় দুই বছর আগে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে রাজপথের একজন অংশীদার হতে পারাটা আমার জন্য গর্বের। এই গর্বই আমাকে এবং জুলাইয়ের সব অংশগ্রহণকারীকে আজীবন সত্য, ন্যায় ও গণতন্ত্রের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর প্রেরণা দেবে।

জুলাই উদ্যাপনের নয়, নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার
মো. আনিছুর রহমান, কক্সবাজার সিটি কলেজ
২৪ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় এক অবিস্মরণীয় দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গণ-অভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্মের আত্মত্যাগ ও আপসহীন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটে। সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের অংশ হতে পেরে এবং একজন জুলাইযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে গর্বিত মনে করি।
এই দিনটি একদিকে রাজপথে ঝরা তাজা রক্তের শোকাবহ স্মৃতি বহন করে, অন্যদিকে স্বৈরাচারমুক্ত একটি স্বাধীন ও নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে আরো গভীর করে। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনে মূল প্রত্যাশা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
একটি দুর্নীতিমুক্ত দেশ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ছিল আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশ একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল সংস্কার এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাকে কাজে লাগানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও জরুরি। ২৪ জুলাইয়ের স্মৃতি কেবল উদ্যাপনের বিষয় নয়; এটি একটি নতুন পথচলার অঙ্গীকার। বীর শহীদদের রক্ত ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। ছাত্র-জনতার ঐক্যের যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা অটুট রেখে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

রাজশাহী থেকে ‘শেইম শেইম ডিক্টেটর’ গর্জন
মেহেদী সজীব, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
জুলাই আন্দোলনে যেমন বেশ কিছু বিভীষিকাময় ঘটনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে রোমাঞ্চকর ও অনুপ্রেরণাদায়ী অসংখ্য স্মৃতি। নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া থেকে শুরু করে গ্রেপ্তার এড়িয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া—সব ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে। আন্দোলনের কয়েকটি পর্যায় ছিল। প্রথম পর্যায়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও কোটাবৈষম্যের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করতে হয়েছে। এরপর ১৫ জুলাই আমরা দেখি, শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা। ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনা আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সারা দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলন চলতে থাকে। রাবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ১৬ জুলাই ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করা। আমার মনে হয়, এর মধ্য দিয়েই হাসিনার পতনের ভিত্তি আরো শক্ত হয়। ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছাত্রলীগ আর কোনো ক্যাম্পাসেই আগের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি। ১৭ জুলাই জোহা স্যারের কবরের কাছে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ১৮ জুলাই থেকে শুরু হয় ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট। তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে ছিলাম। যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হয়ে যেতে পারতাম। গ্রেপ্তার হলে আন্দোলনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও ছিল। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের গ্রেপ্তার করে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এরপর ২৯ জুলাই আমরা কারফিউ ভেঙে নেমে আসি। সেদিন রাজশাহী থেকে ‘শেইম শেইম ডিক্টেটর’ স্লোগান ওঠে। মুহূর্তেই সেই স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

