কবি মামা কবির মামা

কবি মামা কবির মামা

ঋদ্ধির ছোট মামার নাম কবির হোসেন। কিন্তু পাড়ার কেউ তাকে ‘কবির হোসেন’ বলে ডাকে না; সবাই ডাকে ‘কবি মামা’। কারণ তিনি প্রায় সারাক্ষণই কবিতা লেখেন। সকালে কবিতা লেখেন। দুপুরে কবিতা কাটাকুটি করেন। বিকালে কবিতার খাতা নিয়ে হাঁটতে বের হন। রাতে আবার সকালের কবিতা বদলে ফেলেন।

ঋদ্ধির বাবা আরিফুর রহমান মাঝে মাঝে মজা করে বলেন, ‘কবিতা লিখতে লিখতে একদিন দেখবে, নিজের নামটাই কবিতায় বদলে ফেলেছ!’

বিজ্ঞাপন

কবি মামা হেসে উত্তর দেন, ‘নাম বদলালে ক্ষতি নেই। কবিতাটা যেন ঠিক থাকে।’

মা লতা তখন বলেন, ‘আগে চশমাটা ঠিক রাখ্‌। কাল তো ফ্রিজে রেখে খুঁজছিলি!’

এ কথা সত্যি। একদিন চশমা ফ্রিজে, আরেক দিন মোবাইল আলমারিতে। একবার তো কবিতার খাতা খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, সেটি বালিশের নিচে রেখে তার ওপর দিব্যি ঘুমিয়েছেন!

তবু সবাই কবি মামাকে খুব ভালোবাসে; কারণ তিনি কখনো রাগ করেন না। শুধু কবিতার কথা উঠলেই তার চোখ দুটো এমন চকচক করে ওঠে, যেন কেউ আকাশ থেকে একমুঠো তারা এনে দিয়েছে।

একদিন বিকালে কবি মামা দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকেই ঘোষণা করলেন—সুখবর!

ঋদ্ধি দৌড়ে এলো।

: চাকরি পেয়েছ?

কবি মামা হেসে মাথা নাড়লেন।

: তার চেয়েও বড় খবর।

আরিফ সাহেব পত্রিকা নামিয়ে বললেন, ‘মন্ত্রী-মিনিস্টার বানিয়েছে নাকি?’

: না। আগামী শুক্রবার বিকাল ৪টার সময় জেলা শিল্পকলা একাডেমির কবিতা উৎসবে আমাকে নিজের কবিতা আবৃত্তি করতে ডেকেছে।

বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন ছোট মামা। মামার কথা শুনে ঋদ্ধির চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

: মাইকে কবিতা আবৃত্তি করবে?

: হ্যাঁ।

: অনেক লোকের সামনে?

: যতজনই থাকুক, একজন মন দিয়ে শুনলেও কবিতা সার্থক।

দুই.

অনুষ্ঠানের দিনদুপুরেই কবি মামা প্রস্তুত—নতুন সাদা পাঞ্জাবি, চুল আঁচড়ানো, হাতে নীল মলাটের কবিতার খাতা।

বের হওয়ার ঠিক আগে তিনি খাতাটা ঋদ্ধির হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা তুই তোর ব্যাগে সামলে রাখ্‌। আমার হাতে থাকলে ভুলে কোথাও রেখে আসতে পারি।

ঋদ্ধি খুব গম্ভীর মুখে ব্যাগে খাতাটা রেখে দিল।

জেলা শিল্পকলা একাডেমির হলঘর ছোট হলেও বেশ সুন্দর।

প্রথম সারির মাঝখানে বসলেন আরিফ সাহেব, লতা আর ঋদ্ধি। কবি মামা মঞ্চের পেছনের সারিতে অন্য কবিদের সঙ্গে বসেছেন।

একজন… দুজন… তিনজন কবি কবিতা পড়লেন। তারপর ঘোষক বললেন, ‘এবার নিজের কবিতা আবৃত্তি করবেন তরুণ কবি কবির হোসেন।’

হাততালির মধ্যে কবি মামা মাইকের সামনে দাঁড়ালেন। তিনি হাসিমুখে শ্রোতাদের সালাম দিলেন। তারপর কবিতা শুরু করলেন—

‘বাতাস যখন...’

বলেই থেমে গেলেন।

কিছুক্ষণ চুপ। আবার চেষ্টা করলেন।

:‘বাতাস যখন...’

এরপর আর একটি শব্দও বেরোলো না। মনে হলো, বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে কবিতাটাও কোথায় যেন উড়ে গেছে!

হলঘরে অদ্ভুত নীরবতা।

কবি মামা একবার ছাদের দিকে তাকালেন। একবার মেঝের দিকে। তারপর নিজের পাঞ্জাবির দুই পকেট হাতড়ালেন।

কিন্তু খাতা তো তার কাছেই নেই!

প্রথম সারিতে মা-বাবার সঙ্গে বসা ঋদ্ধি সব বুঝে ফেলেছে।

বের হওয়ার আগে খাতা তো সে-ই ব্যাগে রেখেছিল। সে বাবার দিকে তাকাতেই বাবা আস্তে করে বললেন, ‘যা, নিয়ে যা।’

ঋদ্ধি আস্তে করে ব্যাগ খুলল। যেন গোপনে কিছু করছে। ব্যাগ থেকে খাতাটা বের করল। তারপর দৌড়ে মঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দুহাতে খাতাটা বাড়িয়ে দিল।

: মামা... তোমার কবিতা।

পুরো হলঘরে হালকা হাসির ঢেউ উঠল।

কবি মামা এমন মুখ করলেন, যেন এতক্ষণ এটাই হওয়ার কথা ছিল। খাতা হাতে নিয়ে বললেন, ‘আমি আসলে দেখতে চাচ্ছিলাম, আমার খুদে সহকারী তার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে কি না!’

এবার হাসির ঢেউ আরো দীর্ঘায়িত হলো।

ঋদ্ধি বুঝল, ‘মামা বিপদ সামলাতে জানেন।’

এরপর তিনি খাতা খুলে এমন সুন্দর করে কবিতা পড়লেন যে শেষে সবাই অনেকক্ষণ হাততালি দিল।

তিন.

অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে ঋদ্ধি জিজ্ঞেস করল, ‘মামা, সত্যি করে বলো তো, কবিতা ভুলে গিয়েছিলে?’

কবি মামা একটু লজ্জা পেয়ে হেসে ফেললেন।

: ভুলিনি রে...

: তাহলে?

: তোদের তিনজনকে একসঙ্গে সামনে বসে থাকতে দেখে এত ইমোশনাল হয়ে গেলাম যে, কবিতার পরের লাইনটা হঠাৎ লুকিয়ে পড়ল।

ঋদ্ধি অবাক হয়ে বলল, ‘কবিতাও লুকোচুরি খেলতে পারে?’

কবি মামা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘পারে। বেশ পারে। তবে খুঁজে পেলে আবার ফিরে আসে।’

সেদিন রাতে ঋদ্ধি নিজের স্কুলব্যাগটা গুছিয়ে রাখার সময় নীল মলাটের খাতাটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

সে বুঝে গেছে, পৃথিবীর সব কবিতারই একটা বাড়ি থাকে।

আর তার কবি মামার কবিতাগুলোর বাড়ি হলো ওই ‘নীল মলাটের খাতা’!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...