বিধ্বস্ত স্বপ্ন

বিধ্বস্ত স্বপ্ন

গতকাল থেকে থেমে থেমে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষা এলেই প্রতিবছর এ রকম একটানা কয়েক দিন তুমুল বৃষ্টি হয়। রাঙামাটির পাহাড়ি এলাকায় বর্ষা এলে সমস্যার এবং দুর্ভোগের শেষ থাকে না। একটানা কয়েক দিন বৃষ্টি হলে আবার পাহাড়ি ঢল নামে। সেই ঢলে ভেসে যায় মানুষের ঘরবাড়ি। নদীর পানি ফুলে ওঠে প্রচণ্ড স্রোত আর ক্রমাগত ঢলে আশপাশের জনপদ তলিয়ে যায়। বাড়িঘরসহ সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপারটি হলো, বড় বড় পাহাড় ধসে পড়া। এখন প্রতিবছর বর্ষা এলেই পাহাড়ি এলাকায় প্রায়ই ভূমিধসের ঘটনা দেখা যায়। তবে কখন কোন পাহাড় ধসে পড়বে, তা আগে থেকে বলা যায় না। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি—তিন পার্বত্য জেলায় এখন বর্ষা এলেই একধরনের আতঙ্ক বিরাজ করে এখানে বসবাসকারীদের মধ্যে। কয়েক দিনের প্রচণ্ড বৃষ্টিতে রাঙামাটির জনজীবনে একধরনের দুর্ভোগ হানা দিয়েছে বটে। তবে এখানকার জীবনযাপন থেমে যায়নি। কষ্ট, দুর্ভোগ, নানা সমস্যা মোকাবিলা করেও এখানকার মানুষগুলো তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এখানকার মানুষগুলো প্রকৃতির বিচিত্র আচরণ দেখে অভ্যস্ত। বিরূপ প্রাকৃতিক আচরণ মোকাবিলা করেই তারা জীবনযাপন করে। সহজ-সরল মানুষের বুকে অনেক সাহস। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে দুর্ভোগ সৃষ্টি হলেও তারা দমে যায়নি। এসবে যেন তারা সবসময় অভ্যস্ত। রাঙামাটির কাউখালী উপজেলায় উয়াইনচিমা মারমার বাড়ি। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে মেয়েটি। কাউখালীর বেতবুনিয়া ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী সে। পাহাড়ের পাদদেশে তাদের বাড়ি। আশপাশে তাদের মতো আরো অনেকেই পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে বাড়িঘর তৈরি করে বসবাস করছে। পরীক্ষায় ভালো ফল করার স্বপ্ন দেখছে সে। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য অনেক পরিশ্রম করছে। উয়াইনচিমার বয়স মাত্র দশ। এ বয়সেই সে নিজেকে একজন যোগ্য মেয়ে হিসেবে গড়ে তোলার সংকল্প করেছে। কারণ, সে লেখাপড়া করে জীবনে বড় কিছু হতে চায়। দরিদ্র বাবা-মায়ের দুঃখ-কষ্ট দূর করতে চায়। অভাবের সংসার তাদের। বড় বোন আনুমা লেখাপড়া করতে পারেনি। সে এখন কক্সবাজারে এক আত্মীয়ের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে। কিশোরী উয়াইনচিমা বড় হয়ে সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখে। তখন তাদের সংসারের দুঃখ-কষ্ট, অভাব, দারিদ্র্য কিছুই থাকবে না। ছোট ভাই বোন দুটিকে তার মতো শিক্ষিত করতে চায় সে।

প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যেও উয়াইনচিমা সন্ধ্যায় পাশের এক বান্ধবীর বাড়িতে পড়তে এসেছে। দুই বান্ধবী মিলে অঙ্ক করে তারপর বাংলা, ইংরেজি, সমাজ বইগুলো পড়ে। বৃষ্টির কারণে স্কুলে এখন ছুটি চলছে। তাই পরদিন স্কুলে যাওয়ার তেমন তাড়া নেই। রাতে বৃষ্টির পরিমাণ আরো বাড়ে। নিজের বাড়ি ফিরতে পারে না উয়াইনচিমা। রাতে বান্ধবীর সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ে। বাবা-মা, ভাই-বোনদের জন্য অনেক দুশ্চিন্তা হয়। অনেকক্ষণ ঘুম আসতে চায় না। শুধুই ছটফট করতে থাকে মনটা। বৃষ্টির মাত্রা বাড়তে থাকায় অজানা আশঙ্কায় দুলে ওঠে উয়াইনচিমার মনটা। ছটফট করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে সে। পরদিন সকালে আশপাশে অনেক চিৎকার, হইচই, আর্তনাদ শুনে ঘুম ভেঙে যায় উয়াইনচিমার। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সবাই এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। বাবা-মা, ভাই-বোনের কথা মনে আসতেই নিজের বাড়ির দিকে ছুটে যায়। আশপাশে পাহাড়ধসে পড়েছে বসতবাড়ির উপর। চারপাশে আতঙ্কগ্রস্ত নারী-পুরুষ, শিশু বাঁচার জন্য ছুটছে। সবার চিৎকার, আর্তনাদে ভয়ংকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ভয় পেয়ে যায় উয়াইনচিমা। তারপরও সে ছুটতে থাকে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পিচ্ছিল কর্দমাক্ত পথে ছুটতে গিয়ে পড়ে যায় কয়েকবার। পেছন থেকে কে যেন তাকে সাবধান করতে থাকে, তাকে সামনে এগোতে নিষেধ করে। সব নিষেধ উপেক্ষা করে সামনে ছুটতে থাকে উয়াইনচিমা। নিজের অতি পরিচিত এলাকাটি চিনতে পারে না। মনে হয়, অচেনা এক জনপদে এসে পড়েছে সে। সামনে কোথাও নিজের বাড়িটি খুঁজে পায় না সে। পাহাড়ের পাদদেশেই তো ছিল তাদের বাড়িটি। টিনের ছাউনি দেওয়া মাটির ঘর ছিল পাহাড়ের পাদদেশে। রাতের বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে পুরো বাড়িটি মাটিচাপা পড়েছে। মাটির ঘরে উয়াইনচিমার বাবা-মা আর ছোট-ভাই বোন দুটি ছিল। পাহাড়ধসে পড়ায় পুরো বাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ঘরের সবাই মাটিচাপা পড়েছে। পাড়া-প্রতিবেশীরা সবাই ছুটে আসে তাদের উদ্ধারে। প্রাণপণে চেষ্টা চালায় তারা।

বিজ্ঞাপন

উয়াইনচিমা অস্থিরভাবে হন্য হয়ে তার বাবা-মা আর ভাই-বোনকে খুঁজতে থাকে। সামনে ধসে পড়া পাহাড়ের মাটির স্তূপ আর কাদা ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে মেয়েটি। তাকে সান্ত্বনা দিতে কেউ এগিয়ে আসে না। সবাই ধসেপড়া পাহাড়ের কাদামাটির স্তূপ থেকে আহত, নিহতদের উদ্ধারে ব্যস্ত। কারো আশপাশে দেখার কোনো সুযোগ নেই। উয়াইনচিমা চিৎকার করে শুধু কেঁদে যায়। তার কান্নায় আশপাশের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। একসময় প্রতিবেশীরা বিধ্বস্ত স্তূপ পাহাড়ের নিচ থেকে তার বাবা-মা, ভাই-বোনের লাশ মাটি খুঁড়ে বের করে আনে। তাদের নিথর দেহগুলো সামনে এক সমতল জায়গায় সারি সারি করে রাখা হয়েছে। উয়াইনচিমা মৃতদেহগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারে না, গত রাতে তাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে পরিবারের সবাই। তাকে কিছু না বলে চুপিচুপি চলে গেছে তারা। নির্বাক হয়ে যায় উয়াইনচিমা। কাঁদতে পারে না। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মৃত বাবা-মা আর ভাই-বোনের দিকে। তার দুচোখের দৃষ্টিতে ঝরে পড়ছে অনেক শূন্যতা। একসময় তার দুচোখে ছিল অনেক স্বপ্ন। মনের মধ্যে ছিল কত আশা। আজ সেই স্বপ্ন হারিয়ে একেবারেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছে উয়াইনচিমা। তার বুকের ভেতরটা গভীর শূন্যতায় তলিয়ে গেছে। বড় হয়ে একদিন বাবা-মায়ের দুঃখ-কষ্ট দূর করবে, লেখাপড়া শেষে বড় সরকারি কর্মকর্তা হবে, তেমন স্বপ্ন লালন করেই বড় হচ্ছিল সে। তার সব স্বপ্ন, সব আশা কে যেন হঠাৎ করে কেড়ে নিয়েছে। উয়াইনচিমা এখন কোথায় যাবে? স্বপ্ন আর আশা নিয়ে বেঁচে থাকে মানুষ। তার সব স্বপ্ন আর আশা বিধ্বস্ত পাহাড়ের নিচে হারিয়ে গেছে। মাত্র দশ বছর বয়সি পাহাড়ি মেয়েটি হঠাৎই যেন বদলে গেছে। যে পাহাড়কে জন্মের পর থেকে বন্ধু ভেবে এসেছে, পাহাড়ের কোলে হেসেখেলে বেড়ে উঠেছে, যে পাহাড়কে জীবনের শেষ আশ্রয় মনে করেছে, সেই পাহাড় এভাবে তার জীবনের সবকিছু কেড়ে নিল? ভাবতে ভাবতে কঠিন হয়ে ওঠে তার নিষ্পাপ গোলগাল চেহারাটা। উয়াইনচিমার কাছে পাহাড়কে ভয়ংকর শত্রু মনে হতে থাকে এই মুহূর্তে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন