‘যে দেশে গুণের সমাদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মাতে পারে না।’ এ কথাটি বাংলাদেশের বিখ্যাত মনীষী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর। তিনি শুধু বাংলাদেশেরই নন, সমগ্র ভারতবর্ষের বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ছিলেন বহুভাষাবিদ ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি ভাষাবিজ্ঞানী ও গবেষক। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্ম ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই। জন্মস্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার পেয়ারা গ্রামে।
ছোটবেলা থেকেই শহীদুল্লাহ্ ছিলেন বিচক্ষণ ও মেধাবী। ছেলেবেলায় তিনি বাড়িতেই আরবি ও ফার্সি ভাষা শিখে ফেলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য প্রথম ভর্তি হন হাওড়া ইংরেজি স্কুলে। ১৮৯৯ সালে বার্ষিক পরীক্ষায় তিনি রৌপ্যপদক অর্জন করেন।
১৯০৪ সালে তিনি সাফল্যের সঙ্গে এনট্রান্স পাস করেন। এরপর তিনি কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯০৬ সালে সাফল্যের সঙ্গে এফএ পাস করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশের যশোর জিলা স্কুলে ১৯০৮-০৯ সালে শিক্ষকতা করেন। অতঃপর ১৯০৯-১০ সেশনে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯১২ সালে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এমএ পাস করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত বসিরহাটে আইন ব্যবসা করেন। আইন পেশায়ও তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেন। এদিকে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে তিনি বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯২৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯২৮ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের জন্য ফ্রান্সের প্যারিসে গমন করেন। তিনি প্রাচীন বৈদিক, পার্সি ও তিব্বতি ভাষায় গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের পর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান হন। তিনি ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৫৫ সালেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬১ থেকে ১৯৬৪ সালে ইসলামী বিশ্বকোষ প্রকল্পের অস্থায়ী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলা ভাষার গবেষণামূলক বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এগুলো হলো—‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’, ‘ভাষা ও সাহিত্য’, ‘বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত’ ও ‘আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’। এছাড়া তার লেখা বইগুলো হলো—‘রকমারি’, ‘পদ্মাবতী’ ও ‘প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে শেষ নবী’। তিনি অনুবাদ করেছেন ‘রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম’ ও ‘দীওয়ানে হাফিজ’। তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন প্রাইড অব পারফরম্যান্স পদক।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলা, ইংরেজি, ফার্সি, আরবি, তিব্বতি, ওড়িয়া, অসমীয়া ও উর্দু ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন। এই বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই ঢাকায় মারা যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পাউন্ডে মুসা খান মসজিদের পশ্চিম পাশে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র কবর রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

