ঝুম বৃষ্টির একদিন

ঝুম বৃষ্টির একদিন

স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজার কিছুক্ষণ পরেই আকাশের চেহারা গম্ভীর হয়ে এলো। আর এর পরপরই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। কালো মেঘে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল, আর আকাশ কাঁপিয়ে উঠতে লাগল বজ্রের গর্জন। ভয় পেয়ে অনেক ছাত্রছাত্রী দুহাতে কান চেপে বসে রইল।

মুষলধারে বৃষ্টির শব্দ টিনের চালের ওপর পড়ে এক অপূর্ব সুর তুলছিল। কেউ সেই সুর মুগ্ধ হয়ে শুনছিল, কেউ আবার বারান্দায় এসে বৃষ্টির ছিটা গায়ে মেখে আনন্দ নিচ্ছিল। এমন সময় সহকারী প্রধান শিক্ষক উৎপল স্যার হাতে মাইক নিয়ে ঘোষণা করলেন, ‘কেউ রুম থেকে বের হবে না। বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত সবাই নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষে থাকবে।’

বিজ্ঞাপন

উৎপল স্যার ছিলেন অত্যন্ত শৃঙ্খলাপ্রিয়। তার কথা অমান্য করার সাহস কারো ছিল না। তিনি বারান্দা দিয়ে বারবার হেঁটে যাচ্ছিলেন, যেন কোনো শিক্ষার্থী বাইরে বেরিয়ে না পড়ে।

বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ ছিল না। সময় গড়িয়ে এক ঘণ্টারও বেশি হয়ে গেল। শ্রেণিকক্ষের ভেতর একসময় ভয় কেটে গিয়ে উৎসবের আবহ তৈরি হলো। কেউ গল্প করছে, কেউ গান ধরেছে। গানের সুরে তাল-লয় না থাকলেও আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। বাইরে প্রকৃতি নিজের ছন্দে নেচে চলেছে, আর ভেতরে শিক্ষার্থীদের মনে বইছে খুশির জোয়ার।

এদিকে শিক্ষকদের চিন্তার শেষ নেই। ভেজা পথে শিশুদের বাড়ি পাঠানো নিরাপদ নয়। বজ্রপাতের আশঙ্কাও ছিল। তখন প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওহাব মোল্লা মাইকে ঘোষণা দিলেন, ‘যারা বাড়িতে খবর দিতে চাও, আমার মোবাইল থেকে কথা বলতে পার। অভিভাবকরা ছাতা নিয়ে এলে তাদের সঙ্গে চলে যেতে পারবে।’

ঘোষণা শুনে অনেকেই বাড়িতে ফোন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর একে একে অভিভাবকেরা ছাতা নিয়ে স্কুলে আসতে শুরু করলেন। সন্তানদের হাত ধরে তারা বাড়ির পথে রওনা দিলেন।

জানালা দিয়ে তাকিয়ে আমরা দেখলাম, বিশাল স্কুলমাঠটি পানিতে থইথই করছে। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে সবুজ ঘাস দেখা যাচ্ছিল, সেখানে এখন ছোট্ট একটি হ্রদের মতো দৃশ্য। মনে হচ্ছিল, যদি নেমে গিয়ে বৃষ্টির জলে সাঁতার কাটা যেত!

অবশেষে বিকালের দিকে বৃষ্টি কিছুটা কমল। শিক্ষকদের পরামর্শে সবাইকে ছুটি দেওয়া হলো। ছুটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন খাঁচা খুলে দেওয়া পাখির মতো আমরা বেরিয়ে পড়লাম। কেউ ছাতা মাথায়, আবার কেউ ভিজতে ভিজতেই বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল।

সেদিনের সেই বৃষ্টিভেজা বিকাল ছিল ভয়, আনন্দ আর স্মৃতির এক অপূর্ব মিশেল। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়; কিন্তু টিনের চালের ওপর বৃষ্টির সেই সুর, বন্ধুদের দুষ্টুমি মেশানো হাসি আর আমাদের নিয়ে শিক্ষকদের স্নেহময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছবি আজও স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে আছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন