সফল নেতৃত্বের যোগ্যতা ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

ড. ইউসুফ জারিফ

সফল নেতৃত্বের যোগ্যতা ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

রাষ্ট্র একটি জটিল রাজনৈতিক প্রকল্প। রাষ্ট্র গঠন কোনো সহজ রাজনৈতিক বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন গভীর জ্ঞান, ধীশক্তি, কৌশলগত ভিশন এবং উন্নত নৈতিকতা। সম্ভবত এসব ঘাটতির কারণে ১/১১ এবং ২০২৪ সালের অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়। নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে রাষ্ট্রের জটিল ইকোসিস্টেমকে বোঝার সক্ষমতা থাকা।

রাজনৈতিক কুটিলতার কারণে জুলাই বিপ্লব তেমন কোনো গুণগত পরিবর্তন আনতে পারেনি দেশে। একটি মানবিক ও ন্যায্য রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন মানুষকে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু বিপ্লব-পরবর্তী হতাশার পরিপ্রেক্ষিতে নেতৃত্বের দক্ষতা, যোগ্যতা ও ভিশন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। বেশ কিছু দেশ কেন সফল, আর আমাদের মতো দেশ কেন সফল হয় না, সেটির বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

স্বাধীনতার পর দেশ গড়ার জন্য আমাদের যে ভিশন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল, তা আমরা দেখতে পাইনি। ফলে সমাজে খুব দ্রুত হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক বিরোধ প্রতিহিংসায় পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পুনর্গঠনের বদলে দখল ও লুণ্ঠনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এ বিষয়ে প্রফেসর তালুকদার মনিরুজ্জামান ও প্রফেসর রওনক জাহান ১৯৭২-৭৫ সময়ে বিস্তারিত লিখেছেন। ফলে শুরু থেকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হতে থাকে। পাশাপাশি ব্যক্তিবন্দনা এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় যে, তা ব্যক্তিপূজায় পরিণত হয়, যার কারণে শুরু থেকে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি উপেক্ষিত হয়।

রাষ্ট্র নির্মাণের একটি বাস্তব ও প্রায়োগিক কল্পনার বদলে একজন ব্যক্তিকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টাই স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতির মূল প্রতিপাদ্য হয়। স্বাধীনতার পর আর একটি বড় ভুল ছিল, তৎকালীন নেতৃত্ব বিরোধী দল বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি কল্পনায়ও আনতে পারেনি। তারা মনে করেছিল বাংলাদেশ একটি একদলীয় দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে (রহমান অ্যান্ড হক, ২০২৬)। কিছু তরুণ অথচ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীর (মূলত অর্থনীতিবিদ) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আচ্ছন্নতা এ রকম ধারণা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভুল পথে পরিচালিত করেছিল।

১৯৭৫ সালের পর দেশ বিভিন্ন ধরনের সামরিক শাসন দ্বারা পরিচালিত হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসন বিভিন্ন ক্ষেত্রে আশার সঞ্চার করলেও তা স্বল্পমেয়াদি ছিল। তিনি ১৯৮১ সালে খুব অল্প বয়সে শাহাদাতবরণ করেন। শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমান ছাড়া তেমন ধীশক্তি ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব আর পাওয়া যায়নি। শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা, আস্থার সংকট, দুর্নীতি, প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট রাজনীতি, ব্যক্তিতোষামোদ প্রভৃতি শাসনব্যবস্থার প্রধান স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

কিন্তু আমরা যদি নিকট অতীতের দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং সাম্প্রতিক কালের রুয়ান্ডার দিকে তাকাই, তাহলে এক ভিন্ন চিত্র পাই। এসব দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যক্তিগত গুণাবলি বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট হবে, শীর্ষ নেতাদের নেতৃত্বগুণে এসব দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থায় অগ্রগতি অর্জন করেছে। এসব দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট ভিশন ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রের ইকোসিস্টেম এবং নিজেদের অগ্রাধিকার সম্পর্কে তারা যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তাই এসব দেশে সংস্কার পরিকল্পনা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। শীর্ষ নেতৃত্ব নিজ বিবেচনায় দৃঢ়ভাবে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। ফলে ক্রমান্বয়ে এসব দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মান ও মর্যাদা লাভ করেছেন।

নীতিসক্ষমতা ও নীতিস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো নেতার পক্ষে যথাযথভাবে তার ভিশন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশ তথাকথিত উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও প্রতিষ্ঠান এবং পাশ্চাত্য সহায়তানির্ভর সিভিল সোসাইটির প্রভাবে নীতি প্রণয়ন করছে এবং এ নির্ভরতা থেকে বের হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষত কোভিড ১৯-এর পর এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এ নীতিনির্ভরতা আরো বাড়ছে।

কোরিয়ার গৃহযুদ্ধের (১৯৫০-১৯৫৩) পর দক্ষিণ কোরিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব দেশ ছিল। দেশটির আর্থিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে, ১৯৬২ সালের আগে পর্যন্ত কোনো উন্নয়ন সহযোগী দেশ দক্ষিণ কোরিয়াকে কোনো বাণিজ্যিক ঋণ দেওয়ার সাহস পায়নি। কারণ তারা আশঙ্কা করেছিল, দেশটি হয়তো ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না। অবশেষে ১৯৬২ সালে প্রথমবারের মতো পশ্চিম জার্মানি ১৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়, যার শর্ত অত্যন্ত কঠিন ছিল। পরবর্তী সময়ে নানা কারণে দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, বিশেষ করে আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে; কিন্তু উন্নয়ন নীতিতে কোরিয়া কোনো আপস করেনি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ উপেক্ষা করে দক্ষিণ কোরিয়া ভারী ও রাসায়নিক শিল্পে বিনিয়োগ করে, যা পরে যথার্থ প্রমাণিত হয়। জেনারেল পার্ক ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বর মাসে পশ্চিম জার্মানি সফরে যান এবং সেখানে কোরিয়ার প্রবাসী শ্রমিকদের সমাবেশে যোগ দেন। সেই সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি স্পষ্টভাবে তার ভিশন ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা তুলে ধরে বলেন, বিদেশে আসার পরিবর্তে দেশেই যদি তারা কঠোর পরিশ্রম করে, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো কোরীয় ছেলেমেয়েকে আর শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যেতে হবে না। সত্যি সত্যি কোরীয় নাগরিকদের আর পরবর্তী সময়ে বিদেশে শ্রমিক হিসেবে যেতে হয়নি। মাত্র তিন দশকে সবচেয়ে গরিব একটি দেশের বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার গল্প আর একটিও নেই।

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মাদও একইভাবে সফল নেতৃত্বের মাধ্যমে কৃষিনির্ভর একটি দেশকে শিল্পায়নের পথে রূপান্তর করেন। বহু নৃগোষ্ঠীর দেশটিকে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টার পাশাপাশি ‘ভূমিপুত্র’ হিসেবে পরিচিত মালয়দের মূল ধারায় নিয়ে আসেন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মালয়েশিয়ার আর্থিক এতটা দৈন্য না থাকলেও মাহাথিরের আগের নেতৃত্ব সমাজে তেমন গতি আনতে পারেননি। তারা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নীতির মধ্যে ছিলেন।

কিন্তু মাহাথির এ ধারা ভেঙে সমাজে আশাবাদ জাগিয়ে তোলেন। তার রাজনৈতিক ধীশক্তি ও কৌশলগত দক্ষতা মালয়েশিয়াকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যখন আর্থিক মন্দা দেখা দেয়, তখন মাহাথির মোহাম্মদ আইএমএফের পরামর্শ উপেক্ষা করে নিজস্ব বিবেচনায় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ নিয়ে সফল হন। এখানেই মাহাথিরের নেতৃত্বের ব্যক্তিগত দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও নেতৃত্বের বিশেষ গুণের কারণে মালয়েশিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং বিশ্বদরবারে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন। তার শিক্ষা, কৌশলগত দক্ষতা, ধীশক্তি ও আত্মমর্যাদাবোধ এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ’র অবদান সবার জানা। তার নেতৃত্বগুণ ও কৌশলগত পরিকল্পনা একটি দ্বীপরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক আর্থিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুরকে যখন মালয় ফেডারেশন থেকে হঠাৎ বের করে দেওয়া হয়, তখন আক্ষরিক অর্থে এ তরুণ আইনজীবী বুঝে উঠতে পারেননি—কীভাবে দেশকে তিনি রক্ষা করবেন। কিন্তু পরবর্তী ঘটনা সব ইতিহাস। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঐতিহ্যবাহী র‍্যাফলস কলেজে উচ্চশিক্ষা হয়তো তাকে বিশেষ নেতৃত্বগুণ দিয়েছিল, যা তিনি পরে সফলভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার উন্নয়ন মডেলের গোপন রেসিপি হচ্ছে, তিনি সব ক্ষেত্রে ‘মেধাতন্ত্র’কে গুরুত্ব দিয়েছেন; আমাদের মতো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাকে গুরুত্ব দেননি। ফলে সমাজে নিয়ম, শৃঙ্খলা ও আস্থা তৈরি হয়েছে।

রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কাগামেও আমাদের জন্য একটি উদাহরণ। ১৯৯৪ সালে হুতু ও তুতসিদের জাতিগত দাঙ্গায় মাত্র তিন মাসে আট লাখ লোকের নিহত হওয়ার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ২০০০ সালের এপ্রিল মাসে এ রকম একটি বিদ্বেষপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এই দেশটির নেতৃত্বে আসেন পল কাগামে। তিনি শক্ত হাতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার এবং জাতিগত পরিচয় উপেক্ষা করে রুয়ান্ডান পরিচয় নির্মাণে গুরুত্ব দেন। একটি বিভক্ত সমাজকে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ করা যায়, তা পল কাগামের নেতৃত্ব আমাদের শিক্ষা দেয়। তিনি একটি পরিচ্ছন্ন সরকারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেন। বৈদেশিক সহায়তার ওপর এখনো নির্ভরশীল থাকার পরও রুয়ান্ডা তার নীতিস্বাধীনতা বিসর্জন দেয়নি। দেশটি শাসনব্যবস্থায় এতটাই উন্নতি করেছে যে, তা অনেকের কাছেই একটি বিস্ময়।

ওপরের উদাহরণগুলো কোনো নেতার স্তুতির জন্য নয়, বরং বাস্তবতা বোঝার জন্য তুলে ধরা হয়েছে। এটা ঠিক যে, এসব দেশ সব ক্ষেত্রে আদর্শ নয়, তবে তাদের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো আমাদের বিবেচনা করা উচিত। শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যক্তিগত নৈতিকতা, রাজনৈতিক ধীশক্তি ও দূরদৃষ্টি বাদ দিয়ে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারবে না। বাংলাদেশ কীভাবে এ ঘাটতি পূরণ করবে, তা আমাদের জানা নেই। তবে এ ঘাটতি পূরণ না হলে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে।

শীর্ষ নেতৃত্ব যখন যোগ্যতা ও দক্ষতায় দুর্বল থাকেন, তখন ব্যক্তিপূজা ও স্তুতির রাজনীতি শাসনব্যবস্থার প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়। সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান ইউ’র নামেমাত্র একটি প্রতিষ্ঠান আছে; সেটি হলো লি কুয়ান ইউ স্কুল অব পাবলিক পলিসি। সিঙ্গাপুরের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী কিশোর মাহবুবানির মতে, লি’র নামে এ প্রতিষ্ঠান করতে জোর করে তাকে রাজি করানো হয়েছিল। হয়তো এ কারণে সিঙ্গাপুর বা রুয়ান্ডা এগিয়ে যায়, আর অনেক দেশ সম্ভাবনা সত্ত্বেও পিছিয়ে থাকে। মুক্তির পথ কোথায় তারা তাও জানে না। বাংলাদেশ কোন পথে যাবে—ইতিহাস হয়তো এর উত্তর দেবে।

লেখক : গভর্ন্যান্স ও পাবলিক পলিসি এক্সপার্ট, ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং একাধিক গবেষণা গ্রন্থের লেখক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...