আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

হারিয়ে যাওয়া একুশে ফেব্রুয়ারি

ড. আহমদ আনিসুর রহমান

হারিয়ে যাওয়া একুশে ফেব্রুয়ারি

এখন যে একুশে দেখি, বিশেষ করে গত দশক দুয়েক থেকে—তা আমরা, একুশের প্রজন্ম যে ঐতিহ্যবাহী একুশে পালন করে এসেছি ছোটবেলা থেকেই, তা থেকে বহু যোজন দূর মনে হয়।

আমার জন্মের মাস দেড়েকের ভেতরই ঘটে, ঢাকেশ্বরীতে আমাদের বাসারই নিকট, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সেই বিষাদময় ঘটনা। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের কবল থেকে প্রায় সদ্যই মুক্ত হওয়া, নিজেরই স্বাধীন দেশে, নিজের মুখের ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে মিছিল করে নিজেদেরই গণপ্রতিনিধিদের গণপরিষদে গিয়ে তার কথা বলতে যাওয়ার যাত্রায়, পরিষদের অদূরেই পৌঁছে যাওয়া নিরস্ত্র নাগরিকের ওপর নিজেরই দেশের শান্তিরক্ষা বাহিনীর গুলিতে অশান্তির পথ খুলে দেওয়া রক্তপাতে নিরস্ত্র দেশপ্রেমিকদের শহীদ হওয়ার ঘটনা।

বিজ্ঞাপন

সক্রিয় ভাষাসৈনিক তরুণ বাবা-মায়ের নবজাত সন্তান আমি জীবনের সেই শুরুতেই শ্বাস নিই ২১ ফেব্রুয়ারির সেই গোলাগুলির বারুদের ঘ্রাণমাখা বাতাসেই, বলা চলে। আমার রক্ত-মাংস, হৃদয়-মন-মস্তিষ্কে সেই একুশের চেতনা মিশে আছে সহজাতই।

বাল্যকাল থেকেই ভাবগম্ভীরভাবে, বিনম্র স্মরণে, কৃতজ্ঞতায় একুশে পালনের আচার-অনুষ্ঠানগুলোয় যোগ দিয়েছি। খালি পায়ে ভোরে আজিমপুর কবরস্থানে খোদার দেওয়া ভাষার মর্যাদা রক্ষার অধিকার আদায়ে প্রাণ দেওয়া পিতৃতুল্য শহীদদের জিয়ারতে গিয়ে, দোয়া-দরুদ পড়ে, অশ্রুসিক্ত নয়নে বেরিয়ে এসে হেঁটে গিয়েছি সবাই শহীদদের শহীদ হওয়ার স্মৃতিমণ্ডিত জায়গাটিতে, যার চিহ্ন ধরে রাখার জন্য বেঁচে যাওয়া ভাষা সংগ্রামী বাবা-চাচারা একটি মিনার তুলেছিলেন।

বলা হতো, ‘শহীদ মিনার।’ উদ্দেশ্য ছিল—ইতিহাসে প্রথম মিনারের গড়ন যিনি, নবীজির মামা ও ‘সাহাবি’ আবু ওয়াক্কাস (রা.), উচ্চতর ধর্মীয় মূল্যবোধ শেখাতে বাংলাদেশের উপকূল ঘেঁষে অবশেষে চীনের ক্যান্টনে গিয়ে সমুদ্রতীরে সুউচ্চ মিনার গড়ে তাতে আলোর মশাল জ্বালিয়ে অন্ধকার সমুদ্রের পথভোলা নাবিকদের পথের দিশা দিতেন; আর তার ওপর থেকে আজান দিয়ে লোককে ‘ফালাহ’, তথা মঙ্গলের দিকে ডাক দিয়ে জানান দিতেন যেভাবে, হৃদয়-মনের আঁধার দূর করতে—সেভাবেই নিরস্ত্র সেই শহীদ ভাষাসৈনিকদের স্মৃতির চিহ্ন সেই কাঁচা মিনারটিও জাতিকে পথ দেখাবে, মঙ্গলময় মূল্যবোধে উজ্জীবিত করে ন্যায্য অধিকার রক্ষার প্রেরণা জোগাবে, জাগরূক রাখবে।

এভাবেই বাংলার এই জাতীয় পার্বণের সূচনা হয়। ভাষাসৈনিক মা-বাবার কাছ থেকে, তাদের সহযোদ্ধা ‘চাচা’দের কাছে যা শুনেছি, তা থেকে জানি।

আজকের একুশে আড়ম্বরপূর্ণ হৈ-হট্টগোল, পদক বিতরণ, তা অর্জনের প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে যুব-যুবতীর অশ্লীল মিলনমেলা—এসবই চোখে পড়ে। সে সময়ের সেই আন্তরিক, ভাবগম্ভীর ও শোকাহত হৃদয়ের বেদনা আর অধিকার আদায় ও রক্ষার প্রত্যয়ের কিছুই দেখি না। হয়তো আছে—হলে এত কম, যে অন্যসব অবান্তরের ভিড়ে তা চোখে পড়ে না।

যে ঐতিহ্যের প্রকাশ ও ফল ছিল একুশের পার্বণ, পার্বণের সে প্রাণধারাহীন কলস মাত্র রয়ে গেছে মনে হয়। এই কলসে অনেক রঙ ঢেলে মাখিয়ে উৎসব করা হচ্ছে। আমাদের শৈশব, কৈশোর, যৌবনের ঐতিহ্যমণ্ডিত একুশে যেন হারিয়ে গেছে। তার পুনরুজ্জীবন দরকার, জাতির স্বাধীন এবং মর্যাদাবান হিসেবে বেঁচে থাকার স্বার্থেই।

মহান বাঙলা জাতির মহত্ত্বের উৎস ও ভিত্তিই হলো তার বিবর্তনশীল সুদীর্ঘ মহান ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে জাতির অবস্থা হবে মহাসমুদ্রের ঝোড়ো বাতাসে নোঙরহীন পালতোলা জাহাজের মতো। তার সব যাত্রীই ডুববে। যারা জাহাজটি বাঁচাতে চান, যারা তার কান্ডারির আসনে আসীন, যারা দাঁড় টেনে জাহাজ ভাসিয়ে নিয়ে যেতে ব্যস্ত, জাহাজভর্তি যেসব যাত্রী পরিস্থিতি সম্পর্কে একেবারে অচেতন, গভীর নিদ্রায় সুখস্বপ্নে বিভোর যা সহসাই দুঃস্বপ্নে পর্যবসিত হতে যাচ্ছে, তারা ঘুমন্ত অবস্থায়ই ডুববে। আর তারা, সবার অলক্ষ্যে খেলতে খেলতে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ছিদ্র করছে জাহাজটির পাটাতন বা নীরবে কেটে ফেলছে জাহাজের মাস্তুল, তারাও—সবাই।

এই অবস্থাই হয়েছিল পলাশীর বছর পঞ্চাশেক আগে। তখন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী, ঐশ্বর্য-মদিরার সুরা পানে অচেতন ঘুমে বিভোর, মূলত ও প্রধানত অনার্য সেমিটিক ধর্মের মূল ও প্রধান ‘সুন্নি’ ধারার অনুসারী, মূলত ও প্রধানত অনার্য, বাংলাভাষী বাঙলা জাতির ওপর ঐতিহাসিক ঘটনাচক্রে এক পারস্যনিবাসী, সম্ভবত অনার্য, বিহারী ‘শিয়া’ বংশের ‘নবাবি’ কায়েম হলে, তার সুবাদে পাঞ্জাব ও রাজস্থান থেকে আগত জগৎ শেঠ ও উমিচাঁদদের মতো লুটেরা, কৃষ্ণনগরের ‘রাজা’ বনে বসা এক আর্য ষড়যন্ত্রী, আর মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত অবাঙালি শিয়া সেনাপতি মীর জাফরদের সঙ্গে মিলে সাত সমুদ্র তেরো নদী পারের আর্য খ্রিষ্টান গোরারা, শাসক বিহারী শিয়া বংশের শেষ তরুণ নবাব, মুহম্মদ হায়বত জং ‘সিরাজউদ্দৌলা’-কে উৎখাত ও নিষ্ঠুরভাবে খুন করে সারাটা জাতির জাহাজ ডুবিয়ে দেয়, যখন তখনো বাঙলা জাতির সবে তামাশা দেখে হাততালি দিচ্ছিল। নিজেদের ভাগ্যসূর্য যে তখন দীর্ঘ দুই শতাব্দীর অধিক কালের জন্য পুরো জাতিটির জন্য দুঃসহ দুঃখ, দারিদ্র্য, নিপীড়নের রাস্তা খুলে দিয়ে নির্বাপিত হয়ে যাচ্ছিল, তা বোঝেনি।

আজও অনেকটা সেভাবেই বাঙলা জাতি অপসংস্কৃতিক খেল-তামাশায় বিভোর; তার ঐতিহ্য বিস্মৃত করিয়ে লুপ্ত করে দেওয়ার কাজ চলছে, যখন তাদেরই চোখের সামনে, অথচ তাদের বেখেয়ালে। হা হতস্মি, হায় বাঙলা জাতি!

বাংলার ঐতিহ্যবাহী পার্বণসমূহ, যা তার ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের প্রতীকরূপ ব্যঞ্জনার মাধ্যম হিসেবে তার সামগ্রিক অবচেতনায় স্মৃতির গভীরে জাগরূক থেকে ওইসব সংশ্লিষ্ট মূল্যবোধ দ্বারা চালিত হয়ে প্রাগ্রসর থাকতে শক্তি জোগায়—তা সবই ক্রমান্বয়ে অবহেলিত হয়ে বিস্মৃত, অথবা অপসংস্কৃতিক নতুনত্বের রূপায়ণে তাতে বিধৃত মূল মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়ে বিকৃত ও অর্থহীন হয়ে পড়ছে। নববর্ষ-হালখাতা, ঈদ, চাঁদরাত, মহররম, শবে বরাত, শবে কদর—এমনকি সাম্প্রতিক কালে শুরু হওয়া মাতৃভাষা শহীদ দিবস—সবই কমবেশি এমন অবস্থায় পড়েছে। এমন ধর্মীয়, ভাষাগত ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগত সংখ্যালঘুদের পার্বণগুলোও—দুর্গাপূজা, বৌদ্ধ পূর্ণিমা, বিজু—উদাহরণস্বরূপ।

হারানো স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার জন্য যে জাতীয় চেতনার দরকার—তার অবচেতনায় বিধৃত শেকড়রূপ, ব্যাপকতর জাতীয় সংস্কৃতির অন্যান্য বিষয়ের মতো, এই হারানো—বা হারাতে বসা—জাতীয় পার্বণগুলোর মূল মূল্যবোধগত রূপ ও আদি রূপসহ পুনরুজ্জীবন এবং ধরে রাখা অতীব আবশ্যক।

‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ বলেই বেশি পরিচিত হয়ে পড়া ৮ ফাল্গুনে বাংলার জাতীয় ভাষা, মাতৃভাষা বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষারূপে স্বীকৃতি আদায়ের দাবিতে সেকালে বর্তমান মেডিকেল কলেজের কাছে অবস্থিত পুরোনো সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসরমাণ মিছিলে গুলি চালালে যারা নিহত হন, তাদের শহীদ গণ্য করে সেই শোকাবহ দিনের বার্ষিক স্মৃতির উদযাপনের দিনটি ১৯৫২ সালের সেই দিন থেকে উদযাপিত হয়ে আসছে বাংলা জাতির নিজস্ব দেশ বাংলাদেশে। সাম্প্রতিক কালে তা বাংলাদেশ-সংলগ্ন বহু শতাব্দী ধরে বাংলা ভাষাভাষীর নিবাস পশ্চিমবঙ্গ, আসামের বরাক উপত্যকা ও ত্রিপুরাতেও পালিত হচ্ছে। কিন্তু ক্রমেই, বিশেষত ১৯৭১ সালে বাংলার স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পার্বণ উদযাপনে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে তা তার মূল থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে, দুঃখজনকভাবে। হারিয়ে যাচ্ছে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের মূল রূপ; তার উৎস ও ভিত্তি যে মূল্যবোধ, তা এবং তার মূল চেতনা।

ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণেই সব পার্বণই মূলত ধর্ম থেকে উৎসারিত হয়ে থাকে এবং ক্রমে পরিবর্তিত হয়ে বিকৃত হয়ে তার মূল থেকে বিচ্যুত হলেও পরিবর্তনের পর সাধারণত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের রূপেই থেকে যায়। যেমন, উদাহরণস্বরূপ, কোরবানির ঈদ থেকে শারদীয় দুর্গাপূজা, মহররম থেকে বুদ্ধপূর্ণিমা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই। কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ১৭৮৯ সালে সূচিত ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী ‘আধুনিক’ বিশ্বে, কিছু কিছু এমন পার্বণের উদ্ভব হয়েছে, যা ধর্ম থেকে সরাসরি উৎসারিত নয়; দৃশ্যরূপেও তাতে খুব একটা ধর্মীয় কিছু থাকে না। ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ এরকমই একটি পার্বণ; অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘৪ঠা জুলাই’, ফ্রান্সের ‘বাস্তিল দিবস’, বা বিভিন্ন দেশের যার যার ‘স্বাধীনতা দিবস’—এ রকম পার্বণের উদাহরণ। কিন্তু এসব দৃশ্যত ‘সেক্যুলার’ বা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ পার্বণও, চূড়ান্ত উৎসবিচারে, ধর্ম থেকেই পরোক্ষভাবে উৎসারিত।

পার্বণ উদযাপনসহ সব কর্মই উৎসারিত হয় মনের গহিনে, সচেতন মনের অজান্তেই গোপনে সক্রিয় থেকে দৃশ্য আচার-আচরণের প্রায় সবকিছুর রূপ দান করে। আর এটি তা করে মনের গহিনে অবচেতনে রক্ষিত ও সক্রিয় মূল্যবোধ দ্বারা, যা ঐতিহাসিক কারণেই প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা অনুপ্রাণিত ও রূপায়িত হয়। একুশের ক্ষেত্রেও তেমন।

‘একুশে’ উৎসারিত হয় মূলত বহু শতাব্দীর বিবর্তনের ভেতর দিয়ে বাংলা জাতির প্রধান ধর্ম ইসলামের একটি মৌলিক মূল্যবোধ—‘ইনসাফ’, তথা ‘ন্যায্য অধিকার’-এর বিশ্বাস ও চেতনা থেকে।

সব ধর্মের একটি চূড়ান্ত মৌলিক চেতনাগত ভিত্তি থাকে। ইসলামে সেটা ‘ইনসাফ’ ও সাম্য বা সমতা (Justice & Equality or Equitabiliy); যেমন হিন্দু ধর্মে সৃজনশীলতা ও জন্মগত বর্ণ-বিভেদ-ভিত্তিক সামাজিক স্তরবিন্যাস সামাজিক শৃঙ্খলা (Creativity & Caste-based Social Discipline ), বৌদ্ধ ধর্মে অহিংসা (Non-Violence), খ্রিষ্টধর্মে প্রেম (Love), য়াহূদ ধর্মে ‘হা-লাখা’ (Law) ইত্যাদি।

বাংলা জাতির দেশ, ‘বাংলা দেশ’, তথা ‘পূর্ববঙ্গে’ ইসলামই প্রধান ধর্ম, তার ওই চেতনা গত ভিত্তিরূপ ‘ইনসাফ’-এর মূল্যবোধগত চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের অধিকারবঞ্চিত মাতৃভাষার অধিকার উদ্ধারপূর্বক ‘ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রাণ পর্যন্ত দিয়ে দেয়। সীমান্ত পেরিয়েই যে সৃজনশীলতা ও সামাজিক স্তর বিন্যাসভিত্তিক শৃঙ্খলার চেতনায় অনুপ্রাণিত হিন্দুপ্রধান পশ্চিম বঙ্গ আর ত্রিপুরাÑযেখানেও একই মাতৃভাষা বাংলা অধিকার বঞ্চনা প্রকট, সেখানে কেউই ওই একই বাংলা ভাষার অধিকার প্রতষ্ঠার জন্য সংগ্রামে প্রাণোৎসর্গ করেনি পূর্ববঙ্গে ১৯৫২-এর একুশের পর দীর্ঘ পৌনে শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও। আবার বাংলাদেশের সীমান্ত পেরিয়ে হিন্দুপ্রধান ত্রিপুরার উতরে লাগোয়া মুসলিম প্রধান বরাক উপত্যকায়, কিন্তু ‘ইনসাফ’-এর চেতনায় উদ্বুদ্ধ মুসলিম জনসাধারণ বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করেছেন, প্রাণ উৎসর্গ করেছেন । অন্যদিকে সৃজনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হিন্দুপ্রধান পশ্চিম বঙ্গের জনসাধারণ যেই অনিন্দ্য সুন্দর মূর্তি বানাতে সক্ষম; উদাহরণস্বরূপ, শারদীয় দুর্গাপূজার দুর্গা-প্রতিমার ভাস্কর্য। মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশে একে তো ব্যাপকতর জনসাধারণ তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধে মূর্তি বা প্রতিমা সৃজনের নিন্দার মূল্যবোধের প্রভাবে এমন সৃজনে বিরোধিতা করেন; আর যারা তা করেন না, তাদের সৃষ্ট ভাস্কর্য পশ্চিম বঙ্গের মতো তেমন সুন্দর হয় না, ধারেকাছেও যায় না। যে জাতির হাজার বছর ধরে বিবর্তিত হয়ে আসা সামগ্রিক অবচেতনায় সক্রিয় মূল্যবোধে যা ছিল না, নেইÑহঠাৎ তা করার চেষ্টায় আনাড়িসুলভ হাতুড়ে ডাক্তারির মতো কিছু ছাড়া কিছুই অর্জিত হয় না। বাংলাদেশে অতি সাম্প্রতিককালে এসেই শুধু ‘ভাস্কর্য’ বলে কিছু প্রতীমা-প্রতিম মূর্তি নির্মাণ করা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিককালে স্থাপিত একটি, আর জাতীয় নায়কদের দুয়েকজনে তা পশ্চিম বঙ্গসহ ভারতবর্ষ বা ইউরোপের গ্রিক বা রোমানদের সৃষ্ট প্রকৃতই ভাস্কর্যরূপ যেসব শত শত শিল্পকর্ম, তার তুলনায় শৈল্পিক গুনবিচারে হাস্যকর প্রচেষ্টাই শুধু। বাচ্চাদের আনাড়ি হাতে তৈরি মাটির খেলনার মতো। একইভাবে, পূর্ব বঙ্গের হাজার বছরের বিবর্তিত মূল্যবোধে ন্যায় ও ন্যায্যতা, তথা ‘ইনসাফ’-এর চেতনা যেভাবে লালিত হয়ে এসে সময় হলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে, তা পশ্চিম বঙ্গসহ ভারতবর্ষের অন্য কোথাও তো দূরে থাক, সারা বিশ্বেই খুব কমই কোনো জায়গায় হয়।

এমনটি শুধু ধর্মগত কারণে না হয়ে বরং সমাজব্যবস্থা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকের পুঞ্জীভূত প্রভাবে এবং ভিন্ন ভিন্ন ধর্মজাত মূল্যবোধের কারণেই একই ভাষায় কথা বলা এপার ও ওপারের বাঙালি জনগণের ‘ইনসাফ’ চাওয়ার সংগ্রাম বা শহীদ হওয়ার স্পৃহা একরূপ হতে পারেনি; পারে না, পারবেও না। একুশের চেতনা তাহলে হলো ‘ইনসাফ’ কায়েমের সংগ্রামের চেতনা। হারিয়ে যাচ্ছে যে আসল ‘একুশে’, তাকে ধরে রেখে ফিরিয়ে আনার একটি প্রধান কাজ হবে, একুশের পার্বণ উদযাপনে তার সব আচার-অনুষ্ঠানে তার মূল চেতনা ‘ইনসাফ’, তথা ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনার প্রতিফলন । যারা এসব অনুষ্ঠান আয়োজন করবেন, তাদের আয়োজিত সব অনুষ্ঠানে এই প্রতিফলন ঘটাতে সচেতনে সচেষ্ট হতে হবে।

‘একুশ’-এর মূল চেতনায় ‘ইনসাফ’, তথা ‘ন্যায্যতা’র আওতায় আরো বিশেষ প্রধান মূল্যবোধগত চেতনা হলো, সৃষ্টিকর্তার বিশেষ দানস্বরূপ যে ভাষা কেউ পায় তার কথা ফোটার সময়, যাকে সাধারণত ‘মাতৃভাষা’ বলা হয়, তার শুধু বলতে পারারই নয়, তার সম্মানের ও অধিকারের চেতনা। বাংলা জাতির ক্ষেত্রে এই ভাষা সাধারণত হয় বাংলা ভাষা। বাংলার বিশালতর বৃহত্তর জনসংখ্যার ধর্ম হিসেবে, তার সংস্কৃতির শেকড়স্বরূপ মূল্যবোধের উৎসরূপ যে ইসলাম ধর্ম, বিশ্বের আর সব প্রচলিত ধর্ম-রূপের ভেতর একমাত্র তাতেই পরিষ্কারভাবে মনুষ্যভাষার মর্যাদার কথা বলে দিয়ে তার অধিকার নিশ্চিত করেছে, অলঙ্ঘনীয় মানবাধিকার হিসেবে। কোরাআন শরিফে সুরা ‘রহমান’-এ বলা হয়েছে, মোটামুটি ভাবানুবাদেÑ‘দয়াময় সৃষ্টি করেছেন মানুষকে, শিখিয়েছেন ভাষা।’ অর্থাৎ, ভাষা মানুষের সৃষ্টির সঙ্গে এমনই ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যে তা মানুষের মানুষ হওয়ার অনিবার্য অংশ সাধারণত। এজন্যই তা ধর্মতই অলঙ্ঘনীয় মানবাধিকার হিসেবে জগতে এই ধর্মের প্রথম স্বীকৃত, আদিষ্ট ও প্রযুক্ত হয়।

শুধু ভাষাই নয়, প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা ভাষারও মর্যাদার কথা বলে দিয়েছেন স্রষ্টা। কোরাআন শরিফের সুরা রুমের ২২তম আয়াতে বলেছেন, মানুষের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা তাঁরই ‘আয়াত’, তথা নিদর্শন। এজন্য বাংলার নিজের ভাষা, বাংলা ভাষাসহ সব ভাষাকেই তাঁর আয়াত জেনেই সম্মান করে তার মররাদাপূর্ণ আসন প্রতিস্থিত করা ও রাখা, বাংলার বৃহত্তর জনসংখ্যার ধর্ম নির্দিষ্ট দায়িত্ব হিসেবে তার হাজার বছরের ইতিহাসে, তার আমগ্রিক চেতনায় প্রোথিত হয়ে আছে। অবচেতনায় সক্রিয় সেই চেতনা থেকেই বাংলাদেশের মানুষ বাংলা ভাষার মর্যাদার ও অধিকারের জন্য দরকারে প্রাণ উৎসর্গ করে, অন্য কোথাও তার নজির নেইÑথাকে যদি, তা হবে বিরল।

শুধু ভাষাই নয়, প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা ভাষারও মর্যাদার কথা বলে দিয়েছেন স্রষ্টা। কোরআন শরিফের সুরা রুমের ২২তম আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা তাঁরই ‘আয়াত’, তথা নিদর্শন। এজন্য বাংলার নিজের ভাষা, বাংলা ভাষাসহ সব ভাষাকেই তাঁর আয়াত জেনেই সম্মান করা এবং তার মর্যাদাপূর্ণ আসন প্রতিষ্ঠিত করা ও রাখা, বাংলার বৃহত্তর জনসংখ্যার ধর্মনির্দিষ্ট দায়িত্ব হিসেবে তার হাজার বছরের ইতিহাসে, তার সামগ্রিক চেতনায় প্রোথিত হয়ে আছে। অবচেতনায় সক্রিয় সেই চেতনা থেকেই বাংলাদেশের মানুষ বাংলা ভাষার মর্যাদা ও অধিকারের জন্য দরকারে প্রাণ উৎসর্গ করে; অন্য কোথাও তার নজির নেই—থাকলে তা হবে বিরল।

প্রত্যেকটি পার্বণকেই দেখতে হবে তার সমাজের সামগ্রিক অবচেতনায় সক্রিয় যে মূল্যবোধ থেকে তা উৎসারিত, তার আলোকে। যেহেতু তা সব সময়ই হয়ে থাকে ঐতিহ্যে নিহিত, আর ঐতিহ্যের বৈজ্ঞানিক প্রবাহিত হয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে সংশ্লিষ্ট সমাজের প্রধানতম অংশের প্রাচীন ধর্মে, তাই তার বিশ্লেষণেও সব ধর্মের মূল্যবোধ-শিক্ষার আকর যা কিছু, তার আলোকে দেখতে হবে। রোজার ঈদের ক্ষেত্রে তা কোরাআন-কিতাব, হাদিস; দুর্গাপূজার ক্ষেত্রে তা বেদ-বেদান্ত; বড়দিনের ক্ষেত্রে তা বাইবেল।

সঠিকভাবে ঐতিহ্য বিশ্লেষণ করতে পারলে জাতির পার্বণসমূহ প্রতীকী ভাষায় জাতির অবচেতনার যে চাহিদা—পূরণ না হলে যার শান্তি হবে না নিশ্চিত, তা বোঝা যায়। তা বুঝে সেইমতো সংশ্লিষ্ট পার্বণটির অনুষ্ঠান-আয়োজনাদি করলে তা জাতির সংস্কৃতির চিরায়ত ঐতিহ্যবাহী সম্পদ হয়ে বেঁচে থাকে, জাতিকেও বাঁচিয়ে রাখে। নতুবা তা খোলসসর্বস্ব অপসংস্কৃতিক প্রহসনে পর্যবসিত হয়।

আমাদের ঐতিহ্যবাহী একুশে ফেব্রুয়ারি তার মূল উৎসের আলোকে ভাস্বর, স্মৃতিময় আলোর মিনার হয়ে চিরায়ত হোক!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন