নতুন সময়সূচি ও অর্থনীতিতে প্রভাব

খালেদ হোসেন আরমান

নতুন সময়সূচি ও অর্থনীতিতে প্রভাব

দেশে জ্বালানিসংকটের কারণে দোকান ও শপিং মল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখার নিয়ম চালু করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের দাবি ছিল রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা। ব্যবসায়ীদের এহেন দুশ্চিন্তা দেখে নিজের অভিজ্ঞতা ও একাডেমিক অধ্যয়নের আলোকে এ বিষয়ে দু-চার লাইন লিখতে আগ্রহ হলো।

প্রথমেই অভিজ্ঞতার দিকে যাই। আত্মীয়-স্বজনদের অনেকের মোটরগাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসায় আছে। সেখানে বেশ যাওয়া-আসা হয় এবং সেই সুবাদে সেসব দোকানের চিত্রও চিরচেনা। সেগুলো সপ্তাহে ছয় দিন এবং প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। অর্থাৎ গড়পড়তা সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা হচ্ছে ৫৪ থেকে ৫৫ ঘণ্টা।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সারা দিনের খুব অল্প সময় এসব দোকানে, বিশেষ করে পাইকারি দোকানগুলোয় কাস্টমার থাকে। খুচরা দোকানের জন্যও সময়টা গড়ে ছয়-সাত ঘণ্টার বেশি হবে না। বাকি সময়টা দোকানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মোবাইল ফোন স্ক্রল করে বা ভিডিও গেমস খেলে কাটায়। মোবাইল ফোন ব্যবহার করার ফুরসত সেখানে এত বেশি যে, অনেককে বাসা থেকে চার্জার নিয়ে আসতেও দেখা যায়।

নতুন সময়সূচি অন্তত এই ব্যবসায়ের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। কারণ যদি তাদের অফিস আওয়ার কমিয়ে বিকেল পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়, তাহলে তাদের কাস্টমাররা নিশ্চয়ই নিজেদের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে সন্ধ্যায় আসবে না। সবাই যার যার প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কিনতে নির্দিষ্ট অফিস আওয়ারের মধ্যেই আসবে। এতে আমরা ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের সেই সময়টা বাঁচাতে পারি, যেটা তারা দোকানে অবস্থান করে মোবাইল ফোনের পেছনে ব্যয় করে। অতঃপর তারা সেই সময়টা নিজেদের পরিবারের সঙ্গে কাটাতে পারে বা অন্য কোনো উৎপাদনশীল (প্রোডাক্টিভ) কাজের পেছনে ব্যয় করতে পারে।

আরো অনেক ব্যবসায় নিশ্চয়ই থেকে থাকবে, যেখানে অনুরূপ চিত্র বিদ্যমান এবং এই কারণে এসব ব্যবসায়ের ওপর নতুন সময়সূচির কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। বরং এসব দোকানের সময়সূচি সবসময়ের জন্য এমনভাবে পরিবর্তন করে দেওয়া যেতে পারে যেন দোকানিরা ফুলটাইম বেচাকেনা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন এবং এরপরে অন্য কোনো কাজে নিজের সময় ও শ্রম নিয়োজিত করতে পারেন।

এবার একাডেমিক অধ্যয়নের ভিত্তিতে কিছু বিষয় তুলে ধরতে চাই। এর ওপর ভিত্তি করে দু-এক লাইন লিখে কথা শেষ করতে চাই।

আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশ বহির্বিশ্ব থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। যেমন বাংলাদেশে প্রথম কম্পিউটার এসেছিল কম্পিউটার আবিষ্কারের মোটামুটি ২০ বছর পর; আর সেটার ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে শুরু করে আরো ৩০ বছর পর। একইভাবে যে ফেনোমেননটা এখন ইউরোপজুড়ে চালু হচ্ছে, সেটাও হয়তো বাংলাদেশে আসবে ৫০ বছর পর।

সাপ্তাহিক ৩২ কর্মঘণ্টার কথা বলছি। ডাচ ইতিহাসবিদ রাজার ব্রেগম্যান জানাচ্ছেন, শিল্পবিপ্লবের পর ইউরোপীয়দের শুধু ‘সার্ভাইভ করতে’ বছরে তিন হাজার ঘণ্টা কাজ করতে হতো, যা মধ্যযুগের একজন কৃষকের কর্মঘণ্টার দ্বিগুণ। ম্যানচেস্টারে সাপ্তাহিক ৭০ কর্মঘণ্টা চালু ছিল; ছিল না কোনো অবকাশ বা সাপ্তাহিক ছুটি। ১৮৫৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম আট ঘণ্টা কর্মদিবস শুরু হয়। আর ফোর্ড কোম্পানির মালিক হেনরি ফোর্ড তার নিজের ফ্যাক্টরিতে সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবস চালু করেন। তার যুক্তি ছিল, শ্রমিকদের ছুটি না দিলে তারা অর্জিত টাকা ব্যয় করবে কীভাবে?

সেই ধারাবাহিকতায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে—যেমন আইসল্যান্ড, স্পেন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, বেলজিয়াম—২০১৫ সালের দিকে কিছু কোম্পানিতে পরীক্ষামূলকভাবে চার কর্মদিবস চালু হয়। এর বাইরে নিউজিল্যান্ড, জাপান ও সিঙ্গাপুরও চার কর্মদিবসের ঘোষণা দেয়। এর ফলাফল কী ছিল? এর ফলে তাদের উৎপাদনক্ষমতা ও বার্ষিক জিডিপি কি কমে গেছে? গবেষণা কী বলে? হেনরি ফোর্ড কোনো গবেষণা ছাড়া যুক্তি দেখিয়েছিলেন, শ্রমিকদের ছুটি না দিলে তাদের শরীর থেকে ক্লান্তি দূর হয় না এবং এ কারণে বেশিদিন কাজ করলেও তাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো কমে যায়। আধুনিক একাডেমিক গবেষণায়ও অনুরূপ ফলাফল পাওয়া গেছে।

বোস্টন কলেজের সমাজতত্ত্বের প্রফেসর জুলিয়েট শর এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। তিনি চার কর্মদিবস চালু আছে, এমন ২৪৫টি কোম্পানির আট হাজার ৭০০ কর্মকর্তার ওপর কাজ করে দেখতে পেয়েছেন যে, সপ্তাহে চার দিন কাজ করে তারা আগে পাঁচ দিনে যেটুকু উৎপাদনশীল ছিল, এখনো একই পরিমাণ উৎপাদনশীলতার পরিচয় দিচ্ছে। নিজের গবেষণালব্ধ তথ্য নিয়ে তিনি একটি বইও লিখেছেন, যেটি হার্পার থেকে ২০২৫ সালে ‘Four Days a Week: The Life-Changing Solution for Reducing Employee Stress, Improving Well-Being, and Working Smarter’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখ্য, এই ব্যবস্থা সব কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য নাও হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

Autonomy Institute-এর প্রধান নির্বাহী উইল স্ট্রংও আমাদের একই কথা জানিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানটি স্কটল্যান্ডের সরকার কর্তৃক নিয়োজিত হয়ে সাপ্তাহিক চার কর্মদিবস চালু করা কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের ওপর গবেষণা চালায়। তেমনই দুটি কোম্পানি হলো Accountant in Bankruptcy ও South of Scotland Enterprise, যেখানে গবেষণা করে Autonomy Institute খুঁজে পেয়েছে, ‘মনস্তাত্ত্বিক কারণে’ কর্মকর্তাদের অসুস্থতাজনিত ছুটির হার ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমে গেছে এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ উন্নতি লাভ করেছে।

উইল স্ট্রং আরো জানিয়েছেন যে, শুধু কর্মীদের ওপরই নয়, চার কর্মদিবসের ব্যাপারে কোম্পানি মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গিও দারুণ ইতিবাচক ছিল। বলাবাহুল্য, কর্মীদের উৎপাদনশীলতা না বাড়লে কোম্পানি মালিকদের চার কর্মদিবসকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার কোনো কারণ নেই। উপরিউক্ত কোম্পানি দুটি পরীক্ষামূলকভাবে চার কর্মদিবস চালু করলেও তারা এখন সেটার মেয়াদ বাড়াবেন বলে জানিয়েছেন।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামও আমাদের একই ফলাফল জানাচ্ছে। কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার কারণে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হয়েছে। কিছু জিনিস অবশ্য হ্রাস পেয়েছে, যেমন কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ। ২০২৩ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ডাভোসের বার্ষিক মিটিংয়ে সন্ডার ভান্ট নুরদেন্দে এসব জানিয়েছেন। জাপানে মাইক্রোসফট কোম্পানি ২০১৯ সালে চার কর্মদিবস চালু করার পর থেকে কোম্পানির কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করা হয়। বিশ্বজুড়ে পরীক্ষামূলকভাবে সাপ্তাহিক চার কর্মদিবস চালু করা কোম্পানিগুলোর লাভ বেড়েছে প্রায় আট শতাংশ।

যেহেতু ইতোমধ্যে আমেরিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-জনক বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের চার কর্মদিবসের ব্যাপারে করা ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে, তাহলে কি বিখ্যাত ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেয়নার্ড কিনসের অনুমানও সত্য হতে যাচ্ছে? তিনি ১৯৩০ সালে দাবি করেছিলেন, ২০৩০ নাগাদ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অবসর—‘কী করবে এত অবসর সময়ে?’ ভবিষ্যৎ কি তাহলে কর্মময় নয়, বরং অবসরময়? মানুষ কি অবসর কাটাতে কাটাতে বিরক্ত হয়ে যাবে? ভবিষ্যতে কর্ম করার সুবিধা কি তাহলে শুধু এলিট সমাজের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, যেমনটা রাজার ব্রেগম্যান অনুমান করছেন? এখানে না বললেই নয় যে, ২০৩০ সাল থেকে মানুষ সপ্তাহে মাত্র ১৫ ঘণ্টা কাজ করলেই চলবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

এমনটা হোক বা না হোক, অন্তত আমাদের দেশের সরকারেরও এখন চার কর্মদিবসের ব্যাপারে সিরিয়াসলি ভাবা উচিত—চলমান জ্বালানি সংকটের আগে ও পরে। আর নতুন সময়সূচি অর্থনীতির ওপর কেমন প্রভাব ফেলতে পারে, সেটা এরই মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা।

লেখক : মাস্টার্স শিক্ষার্থী, ইবনে হালদুন ইউনিভার্সিটি, ইস্তানবুল

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন