বিজেপির ঘুম হারাম: তাড়া করছে ভিন্নমতের ভূত

বিজেপির ঘুম হারাম: তাড়া করছে ভিন্নমতের ভূত

দিল্লির রাস্তায় ১০ অক্টোবরের দৃশ্য থেকে এটি স্পষ্ট, এখন থেকে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারকে আর এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি দেবে না জনগণ। দুশ্চিন্তায় তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তারা সব জায়গায় তাদের প্রতিপক্ষকে দেখতে পাচ্ছে। ভিন্নমতের ভূত সর্বত্রই তাদের তাড়া করে ফিরছে।

বিজ্ঞাপন

রাস্তার প্রবেশপথগুলোতে বসানো বিশাল সব ব্যারিকেড আর শত শত পুলিশ সদস্যের কড়া নজরদারির কারণে পথচারীদের পক্ষে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি না হয়ে পার হওয়া সম্ভব ছিল না। কারো কথায় সন্দেহ হলেই পুলিশ তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছিল। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, রাস্তায় চলাচলকারী প্রত্যেক মানুষকেই পুলিশ সন্দেহ করছিল। আমার শিক্ষার্থীরা আমাকে জানাল, মিন্টো ব্রিজের কাছে পাকোড়া খাওয়ার সময় পুলিশ তাদের তুলে নিয়ে গিয়েছিল। তারা দেখেছে, কাছের একটি গণশৌচাগারে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যাওয়া এক যুবককে সেখান থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনছে পুলিশ।

আমরা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নর্থ ক্যাম্পাসে থাকি। আমি আর আমার স্ত্রী ভাবছিলাম, কীভাবে প্রতিবাদস্থলে পৌঁছানো যায়। আমরা জানতাম, সেখানে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হবে। আমাকে কলকাতায় যাওয়ার ফ্লাইট ধরতে হবে, তাই আটক হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কিন্তু আমরা সেই প্রতিবাদের অংশ হতে চেয়েছিলাম। একজন প্রবীণ আইনজীবী বন্ধু ফোন করে জানতে চাইলেন, কীভাবে যন্তর মন্তরে যাওয়া যায়। যানবাহন চলাচলের অনুমতি না থাকলে তিনি হেঁটেই যাবেন বলে জানালেন। আর ঠিক তখনই লেখিকা নয়নতারা সায়গালের মেয়ে গীতা সায়গালের ফোন পেলাম। তিনি জানতে চাইলেন, দিল্লিতে আমাদের দিনটি কীভাবে কাটছে। ভারতের এই মহীয়সী নারী ফোন করেছিলেন সেই তরুণদের আশীর্বাদ জানাতে, যারা এক বিশাল ও শক্তিশালী শক্তির (গোলিয়াথ) বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

আমরা জানতাম, দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্য ও শহরের পুলিশ অলিগলিতে টহল দিচ্ছে। পথের প্রতিটি তরুণকে খুঁটিয়ে দেখছে আর ভাবছে—এও কি ১০ তারিখের যন্তর-মন্তরের বিক্ষোভে যোগ দিতে পারে? কারণ, সরকারের দৃষ্টিতে প্রত্যেকেই ছিল সম্ভাব্য বিক্ষোভকারী। দিল্লি পুলিশ রাস্তায় চলাচলকারী প্রত্যেকের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল, তারা যন্তর-মন্তরের দিকে মোড় নিচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য। সেই মুহূর্তে সরকারের চোখে প্রত্যেকেই ছিল সম্ভাব্য বিক্ষোভকারী।

দিল্লিকে কার্যত একটি সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, জম্মু-কাশ্মীর এবং ছত্তিশগড় থেকে অতিরিক্ত পুলিশ আনা হয়েছে। দিল্লিতে আগে থেকেই আধা সামরিক বাহিনীর প্রায় ২০ হাজার সদস্য মোতায়েন আছেন এবং আরো ১২ হাজার সদস্য আনা হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দিল্লি পুলিশের সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২২১টি কোম্পানিকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রাখার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ১০টি আটক কেন্দ্র। ওলা ও উবারের মতো ট্যাক্সি কোম্পানিগুলোকে বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবর ও এর আশপাশের দিনগুলোতে দিল্লির রাস্তায় গাড়ি না নামাতে।

হোটেলগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন কোনো অতিথির থাকার ব্যবস্থা না করে। শহরের প্রধান দুটি রেলওয়ে স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া বা সেখানে আসা সব ট্রেন আগেই বাতিল করা হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে ৫৭টি মেট্রো স্টেশন। প্রায় প্রতিটি রাস্তায় বসানো হয়েছে ব্যারিকেড। দোকানপাট ও রেস্তোরাঁগুলোকে দ্রুত বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দিল্লির বিশাল এলাকাজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোর ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু ইন্টারনেট ছাড়া ক্লাসগুলো চলবে কীভাবে, এর কোনো উত্তর নেই ক্ষমতাসীনদের কাছে। সব ক্যাম্পাসের চারপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। কারণ, সরকারের আশঙ্কা, শিক্ষার্থীদের প্রবেশের অনুমতি দিলে ক্যাম্পাসগুলো বিক্ষোভের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তাই ক্লাসগুলো অনলাইনে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়ের চারপাশেও মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ। বেশ কয়েকজন ইউটিউবার অভিযোগ করেছেন, তাদের ফোন করে সরকারের সমর্থনে ভিডিও তৈরির জন্য যন্তর-মন্তরে যেতে বলা হচ্ছে এবং এর বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।

সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সরকার আর নিজ দেশের মানুষের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। অন্যদিকে, সরকারের সমর্থকরা, যাদের অনেকের বিরুদ্ধেই অর্থের বিনিময়ে কাজ করার অভিযোগ আছে, তারা প্রকাশ্যে ভিডিও তৈরি করছেন এবং যন্তর-মন্তরের আশপাশে ঘোরাফেরা করছেন। তারা সরকারের বিরোধীদের উচিত শিক্ষা দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। যারা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি দিচ্ছে, পুলিশ সেই গুন্ডাদের গ্রেপ্তার করছে না। অথচ যারা বিক্ষোভে যোগ দিতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। অন্যদিকে, ওই গুন্ডাদের ময়দানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এরাই স্লোগান দিয়েছে—‘দিল্লি পুলিশ, লাঠি চালাও, আমরা আছি তোমাদের সঙ্গে।’

তাই আজ যারা লাঠি চালায়, তারা মুক্ত; আর যাদের সম্বল শুধু চিন্তাধারা, তারা গ্রেপ্তার হয়ে জেলহাজতে। শত শত তরুণ-তরুণীকে আটক করা হয়েছে; এ সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক বাড়িতে পুলিশ ক্যাম্প করে বসে আছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। কোনো আদেশনামা না দেখিয়েই পুলিশ সদস্যরা বাড়িতে ঢুকে পড়ে এবং জেদ ধরে বসে থাকে। মোদি সরকারের ১৩ বছরের শাসনামলে এটাই স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এতে আদালতেরও কোনো আপত্তি নেই। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের বিচারকরা একটি ‘হেবিয়াস কর্পাস’ (বন্দি ব্যক্তিকে সশরীরে আদালতে হাজির করার) আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। তারা বলেছেন, পুলিশ যেন তাদের মা-বাবার কাছে ফেরত পাঠায়। একবার ভাবুন—যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই পুলিশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের গায়েব করে দিচ্ছে, আর আদালত এতে কোনো আপত্তির বিষয় দেখছে না। উল্টো, আদালত আমাদের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলছে। অর্থাৎ, পুলিশ যখন খুশি এবং যত দিন খুশি আপনাকে ধরে গায়েব করে রাখতে পারে।

একইভাবে, সুপ্রিম কোর্ট মনে করে, সরকারের পক্ষে পুরো দিল্লি লকডাউন করাটা যৌক্তিক। নাগরিকদের অবাধ চলাচলের অধিকারের এখন আর কোনো অর্থ নেই। কারণ, সরকারের টিকে থাকার অধিকার নিয়েই আদালত বেশি চিন্তিত বলে মনে হয়। আদালত বলেছে, বিক্ষোভের অনুমতি নেওয়া না হয়ে থাকলে তা বেআইনি এবং সরকার তা থামাতে পারে। এমনকি পুরো একটি শহরকে অচল করে দেওয়াকেও আদালত পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে। যদি একটি রাষ্ট্র তার সর্বশক্তি দিয়ে আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে তা কী প্রমাণ করে? কে বেশি শক্তিশালী? কে ভীত? আসলে ভীত সেই ব্যক্তিই, যে লাঠি ও বন্দুক ব্যবহার করে স্লোগান তোলা মানুষদের ভয় দেখাচ্ছে। তবু স্লোগান উঠছে। সরকার হয়তো নিজের কানে বুলেট গুঁজে দিয়ে সেই আওয়াজ শোনা থেকে বিরত থাকতে পারে, কিন্তু বাকি সবার কানে তা ঠিকই পৌঁছাচ্ছে।

এই নীরবতার গর্জন শুনেই আতঙ্কিত সরকার

প্রেস ক্লাবে যাওয়ার পথে কস্তুরবা গান্ধী মার্গের প্রবেশপথে আমাদের থামানো হলো। তিনটি জায়গায় আমাদের পরিচয়পত্র দেখাতে হলো এবং এমন দুর্যোগপূর্ণ দিনে রাস্তায় বেরোনোর কারণ ব্যাখ্যা করতে হলো। আমাদের পাকা চুল এ ক্ষেত্রে সহায়ক হলো এবং কোনোমতে আমরা প্রেস ক্লাবে পৌঁছালাম। প্রেস ক্লাবের প্রধান ফটক বন্ধ থাকায় আমরা পেছনের গেট দিয়ে ঢুকলাম। বিশ্বদীপক নামের এক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে এইমস পর্যন্ত পৌঁছে দিতে চাইলেন। সেখান থেকে মেট্রো ধরে দিল্লি বিমানবন্দরে যাওয়া সম্ভব। যাওয়ার পথে দিল্লি হাট ফ্লাইওভারের কাছে আমরা আটকা পড়লাম। সেখানে পরিচিত কিছু মুখ চোখে পড়ল। আমাদের দৃষ্টি বিনিময় হলো। হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানালাম।

সে সময়ই শুনলাম, বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়া নেহা ও যোগেন্দ্র যাদবকে আটক করা হয়েছে। আরেক নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্য সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কিছু তরুণ-তরুণী ফ্লাইওভারের ওপর বসেছিলেন। গাড়ি এগোচ্ছিল খুব ধীরগতিতে। কিন্তু দিল্লির রাস্তায় এই প্রথমবার ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে আমার কোনো বিরক্তিই হলো না। আমি খুশি ছিলাম যে, অন্তত এমন একটি জায়গার পাশ দিয়ে যেতে পেরেছি, যা ভিন্নমত ও প্রতিবাদের শক্তিতে স্পন্দিত ছিল।

সরকার হয়তো নিজেদের জয়ী বলে দাবি করবে, কারণ যন্তর-মন্তরকে তারা একটি ‘নিস্তব্ধ এলাকা’য় (সাইলেন্ট জোন) পরিণত করতে পেরেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকা যায়, সেই নিস্তব্ধতার গর্জন, যা সবাই শুনতে পাচ্ছে, সরকারকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছে।

দ্য ওয়্যার অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন