মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের মে মাসে মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় আঞ্চলিক নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে এই অঞ্চলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি নতুন যুগের সূচনা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ সময় তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তার সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে এই অঞ্চল পুনর্গঠন বা কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করার লক্ষ্যে পরিচালিত হবে না। এ সময় ট্রাম্প তার পূর্বসূরি প্রেসিডেন্টদের তিরস্কার করে বলেছিলেন, ‘তথাকথিত জাতি নির্মাতারা শেষ পর্যন্ত যতটা জাতি তৈরি করেছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি জাতিকে ধ্বংস করেছেন এবং হস্তক্ষেপকারীরা এমন জটিল সমাজে হস্তক্ষেপ করছেন, যা তারা নিজেরাই বুঝতে পারেননি।’
এর এক বছরেরও কম সময় পরে ট্রাম্প ইরানে ‘স্বাধীনতা’ আনার লক্ষ্যে দেশটিতে সর্বাত্মক আক্রমণের নির্দেশ দেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ট্রাম্পের ঘোষিত রাজনৈতিক মতাদর্শ, নীতিগত লক্ষ্য বা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না। বরং, বেশ কয়েকজন ইরান বিশেষজ্ঞ আল জাজিরাকে বলেছেন, ট্রাম্প ইসরাইলের সঙ্গে একত্রে এমন একটি যুদ্ধ শুরু করেছেন, যা শুধু ইসরাইল এবং তার প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উপকারে আসবে; এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না।
এ সম্পর্কে ওয়াশিংটন ডিসির সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটি আবার ইসরাইলের চাপে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা একটি পছন্দের যুদ্ধ। এটি আরেকটি ইসরাইলি যুদ্ধ, যা যুক্তরাষ্ট্র শুরু করছে। ইসরাইল দুই দশক ধরে ইরানে আক্রমণ করার জন্য আমেরিকাকে চাপ দিয়ে আসছে এবং অবশেষে তারা তা পেয়েছে।’ এ সময় মোর্তাজাভি তার পূর্বসূরিদের সমালোচনা করেন, যারা এই অঞ্চলে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘এটি বিদ্রুপাত্মক, কারণ তিনি এমন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি নিজেকে শান্তির প্রেসিডেন্ট বলে অভিহিত করেছেন।’
ইরানের ‘হুমকি’ সম্পর্কে সতর্কীকরণের ইতিহাস
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আক্রমণকে উৎসাহ প্রদানকারী নেতানিয়াহু দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সতর্ক করে আসছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টার কথা বারবারই অস্বীকার করেছে। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ওয়াশিংটনের কাছে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, ইরান তার ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির প্রধান স্থাপনাগুলোয় বাংকার বিধ্বংসী বোমা হামলা চালায়। এরপর ট্রাম্প বলেছেন, তাদের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে। এরপর নেতানিয়াহু ইরানের কথিত একটি নতুন ‘হুমকির’ দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। সেই হুমকিটি হচ্ছে তেহরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। নেতানিয়াহু গত অক্টোবরে ইসরাইলপন্থি পডকাস্টার বেন শাপিরোকে বলেছিলেন, ইরান তার এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আমেরিকার যেকোনো শহরকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারে।
কিন্তু নেতানিয়াহুর এই দাবিকে কোনো মানুষই বিশ্বাস করবে না। কারণ ইরান ৮,০০০ কিলোমিটার (৫,০০০ মাইল) পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, এর সঙ্গে আরো ৩,০০০ (১,৮০০ মাইল) যোগ করে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে হামলা চালাতে পারবে—এমন কল্পনা করা শুধু নেতানিয়াহুর পক্ষেই সম্ভব।
কিন্তু ট্রাম্প এই সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে নেতানিয়াহুর সেই দাবির পুনরাবৃত্তি করেছেন, যা কোনো প্রমাণ বা পরীক্ষা দ্বারা সমর্থিত হয়নি। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, ‘তারা ইতোমধ্যেই এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যা ইউরোপ এবং বিদেশে আমাদের ঘাঁটিগুলো হুমকির মুখে ফেলতে পারে। শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্যও তারা কাজ করছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই অভিযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত বছর জুনে ১২ দিনের সংঘাতের পর থেকে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আরো বিস্তৃত যুদ্ধের জন্য ক্ষেত্র তৈরি করছেন, বারবার দেশটিতে আবার বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইরাক এবং আফগানিস্তানের যুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী সংঘাতের বিষয়ে সতর্ক মার্কিন জনগণ ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার ঘোর বিরোধী। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে মাত্র ২১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পক্ষে। কিন্তু জনমতকে অগ্রাহ্য করে ট্রাম্প ইরানে হামলার জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সামরিক সমাবেশ ঘটান। শনিবার হামলার আগে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে মার্কিন সেনাদের হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে।
অথচ ট্রাম্প প্রশাসন ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে তেহরানের সঙ্গে কূটনীতির পথ অনুসরণ করে আলোচনায় জড়িত হয়ে সংঘাতের দ্বারপ্রান্ত থেকে সরে এসেছেন বলে মনে করা হচ্ছিল। কারণ এরপর মার্কিন ও ইরানি আলোচকরা একটি চুক্তি তিন দফা আলোচনা করেছেন। এ সময় ইরানি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপক পরিদর্শনে সম্মত রয়েছেন।
আলোচনায় ওমানের মধ্যস্থতাকারী এবং ইরানি কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তৃতীয় দফার পরোক্ষ শেষ দফার আলোচনাকে ইতিবাচক বর্ণনা করেন। তারা বলেছিলেন, আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আল বুসাইদি ওয়াশিংটন ডিসিতে সিবিএস নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শুক্রবারও বলেছেন, ‘একটি শান্তি চুক্তি আমাদের নাগালের মধ্যে... যদি আমরা শুধু কূটনীতিকে সেখানে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় স্থান দিতে পারি।’
কিন্তু এরপরই শনিবার সকালে ইরানে হামলা চালানো হলো। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, কথিত শান্তি আলোচনা ছিল লোকদেখানো বা আইওয়াশ মাত্র। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কখনোই চাননি, শান্তি আলোচনা সফল হোক বা একটি চুক্তি হোক। সে জন্য তিনি সবসময়ই তৎপর ছিলেন।
২০২৫ সালের জুন মাসেও কোনো উসকানি ছাড়াই ইরানে হামলা শুরু করে ইসরাইল। ওই হামলাটিও মার্কিন-ইরান আলোচনার মাঝামাঝি সময়ে চালানো হয়েছিল। নেতানিয়াহুর এজেন্ডা সর্বদাই ছিল একটি কূটনৈতিক সমাধান রোধ করা এবং তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, ট্রাম্প আসলে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সে জন্যই সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিকে ভন্ডুল করতে আলোচনার মাঝখানে আবার ইরানে হামলা চালালেন।
এ সম্পর্কে ‘ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের (এনআইএসি)’ সভাপতি জামাল আবদি আলজাজিরাকে বলেছেন, এটি নেতানিয়াহুর জন্য একটি বড় সাফল্য, গত জুনেও তিনি একই কায়দায় সফল হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের করার ব্যাপারে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ নেতানিয়াহুর জন্য আরো একটি বিজয় এবং আমেরিকান জনগণের জন্য ক্ষতি। কারণ এটি ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ এবং অপ্রত্যাশিত সামরিক লড়াইয়ের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে পারে।’
শনিবার হামলার ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেছেন, তার লক্ষ্য হলো ইরানকে ‘আমেরিকা এবং আমাদের মূল জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি’ হতে বাধা দেওয়া। কিন্তু ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনের কিছু সমর্থকসহ মার্কিন সমালোচকরা যুক্তি দিয়েছেন যে, ইরান যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১০,০০০ কিলোমিটারের (৬,০০০ মাইল) বেশি দূরে, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনোভাবেই হুমকি নয়।
এ মাসের শুরুতে ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি রক্ষণশীল ভাষ্যকার টাকার কার্লসনকে বলেছিলেন, ‘যদি ইরান না থাকত, তাহলে হিজবুল্লাহ থাকত না, লেবাননের সীমান্তে আমাদের সমস্যা হতো না।’ এর জবাবে কার্লসন বলেন, ‘লেবাননের সীমান্তে কী সমস্যা? আমি একজন আমেরিকান এবং আমি মেইনে রাজ্যে থাকি। লেবাননের সীমান্তে কী হচ্ছে, তা নিয়ে আমার তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’
মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব এক বিবৃতিতে বলেছেন, মার্কিন জনগণ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না। তারা স্পষ্টভাবে বলছেন, ‘আর যুদ্ধ নয়’। কিন্তু ‘ট্রাম্প সব সময়ই যুদ্ধের পক্ষে থাকা আমেরিকান রাজনৈতিক অভিজাত এবং ইসরাইলি বর্ণবাদী সরকারের হিংসাত্মক প্ররোচনায় কাজ করছেন। ইরানে আগ্রাসন তারই প্রমাণ।
আলজাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


আজ তাপমাত্রা কেমন থাকবে, জানাল আবহাওয়া অফিস