নতুন সংসদে নতুন হাওয়া

কেমন হলো প্রথম অধিবেশন

সৈয়দ আবদাল আহমদ

নতুন সংসদে নতুন হাওয়া

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হওয়ার পথে। কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ অধিবেশন চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনা শেষ করার জন্য অধিবেশনের সময়সীমা আরো দুয়েক দিন বাড়তে পারে। অথবা একাধিক দিন সকাল-বিকাল অধিবেশন বসে নির্ধারিত সময়ে শেষ হতে পারে। আজ সোমবার পর্যন্ত সংসদের ২২টি কার্যদিবস হচ্ছে। সরকারি ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন সাধারণত বেলা ৩টা থেকে অধিবেশন শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত চলছে। অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা অর্ডিন্যান্সগুলো বিল আকারে পাস করার সময় সংসদ অধিবেশন ছুটির দিনে এবং সকাল থেকে চলেছে। সংসদে রাষ্ট্রপতি যে উদ্বোধনী ভাষণ দেন, তার ওপর সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন।

দীর্ঘ ১৫ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে এই সংসদ গঠিত হওয়ায় একে ‘গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে প্রথম অধিবেশনেই গত দেড় দশকের মৌলিক ‘স্তুতি’র বদলে গঠনমূলক বিতর্ক শুরু হওয়াকে ইতিবাচক বলে মনে করেন অনেকে।

বিজ্ঞাপন
ত্রয়োদশ সংসদের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশালসংখ্যক নতুন সদস্য। সংসদের নির্বাচিত ৩০০ আসনের মধ্যে ২২৭ সংসদ সদস্যই (এমপি) এবার প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়ে সংসদে এসেছেন। এর মধ্যে বিএনপির ১৫০ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৭২, এনসিপিসহ ছোট দলগুলোর ৫ ও স্বতন্ত্র ৫ জন। সংসদ নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেমন নতুন সদস্য, তেমনি বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও সংসদে নতুন সদস্য। সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালও নতুন সদস্য। সংসদে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করেছেনÑএমন সদস্য খুব কম। এর মধ্যে রয়েছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ড. মঈন খান, মনিরুল হক চৌধুরী, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মুশফিকুর রহমান প্রমুখ।

সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই নতুন মুখ হওয়ায় সংসদীয় রীতিনীতি ও শিষ্টাচার পালনে ভুল-ভ্রান্তি লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে লক্ষণীয় বিষয়, নতুন সদস্যরা সংসদীয় রীতিনীতি ও আচরণ শেখার ব্যাপারেও খুব আগ্রহী। এ ব্যাপারে সংসদের পুরোনো সদস্য এবং সংসদের অভিভাবক হিসেবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাদের সুন্দরভাবে গাইড করছেন। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন সদস্য সংসদে বলেছেন, তারা সংসদের অনেক কিছু এখনো বুঝতে পারছেন না এবং সংসদীয় শিষ্টাচার তারা শিখতে চান। তারা একটি ভালো সংসদীয় সংস্কৃতিচর্চার ওপর জোর দেন। এর আগে আমরা দেখেছি, সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার দলের নতুন সদস্যদের সংসদীয় রীতিনীতি শেখার জন্য একটি সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছিলেন। এটি সংসদ শুরুর আগে ৬ মার্চ ২০২৬ শুরু হয়ে দুদিনব্যাপী চলে। এতে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি ও আচরণবিধি ভালোভাবে বোঝা, পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপন এবং বিল প্রণয়ন ও আলোচনায় অংশ নেওয়ার নিয়ম, বাজেট-সংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণ এবং সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করা হয়। সংসদ নেতা তারেক রহমান সংসদ শুরুর আগের দিন সংসদীয় দলের সভায় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে সংসদে মন্ত্রী ও এমপিদের সংযমী এবং মার্জিত আচরণ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। গণমাধ্যমে কথা বলার সময় সতর্ক ও দায়িত্বের বাইরে মন্তব্য না করারও উপদেশ দেন। তিনি সময়ানুপর্তিতার পাশাপাশি সংসদে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা ও জাতীয় সমস্যা সমাধানের মূল ফোরাম হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

সংসদের প্রথম অধিবেশনটি এখন পর্যন্ত চলেছে ৩০০ জন সরাসরি নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে। পূর্ণাঙ্গ সংসদের সদস্য সংখ্যা ৩৫০। ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী ১২ মে ভোটগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী জোট ১টি আসন লাভ করেছে। ২৯ এপ্রিল মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা নির্বাচিত হয়ে যাবেন। তবে প্রথম অধিবেশনে তারা অংশ নিতে পারবেন কি না, তা নিশ্চিত নয়। গেজেট এবং শপথ নেওয়ার পর তারা সংসদ সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। যদি ২৯ এপ্রিল গেজেট ও শপথ অনুষ্ঠান হয় এবং অধিবেশনের মেয়াদ যদি কয়েক দিন বাড়ে, তাহলে তারা চলতি অধিবেশন ধরতে পারবেন। নইলে আগামী জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে শুরু হওয়া সংসদের বাজেট অধিবেশন থেকে ৫০ নারী সদস্যসহ ৩৫০ সদস্যের সংসদ কার্যক্রম শুরু হবে।

লুই কানের সংসদ ভবনে এক চিলতে আলো

শেরেবাংলা নগরের লুই আই কানের সেই স্থাপত্যে নির্মিত সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষ বা হাউসে দীর্ঘদিন পর শোনা যাচ্ছে টেবিল চাপড়ানোর ধ্বনি। না শুধু ধ্বনিই নয়, সেখানে দীর্ঘ সময় পর শোনা যাচ্ছে ভিন্নমত আর গঠনমূলক সমালোচনার তেজ। সংসদের প্রথম অধিবেশনকে যখন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে ‘জাতীয় সমস্যা’ বলে বিরোধী দলকে পাশে ডাকেন, তখন বিরোধী দলও ইতিবাচক সাড়া দেয়। এ ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে এক চিলতে স্বস্তি জাগাচ্ছে। এই স্বস্তি কতক্ষণ স্থায়ী হবেÑএ আশঙ্কাও আছে তাদের মনে। তবে সাধারণ মানুষ চায় সংসদ যেন সরকার ও বিরোধী দলের এমন পারস্পরিক সহযোগিতা ও বোঝাপড়ায় এগিয়ে যায়। সংসদ যেন আলোচনা ও সংকট সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গণতন্ত্রের চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

সংসদীয় গণতন্ত্রে বিতর্কই সংসদের প্রাণ। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে প্রাণবন্ত বিতর্ক হোক, যা সংসদকে একটি প্রাণবন্ত সংসদে পরিণত করে। দীর্ঘ দেড় দশকে আমরা দেখেছি, একটি একদলীয় সংসদ চলেছে। ভুয়া তিনটি নির্বাচনের মাধ্যমে ওই সময় সংসদ ছিল রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট। ওই সংসদ নিয়ে পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি আওয়ামী লীগ ছাড়া কারো আগ্রহ ছিল না। অবশেষে সেই অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও ভারতে পলায়নের মাধ্যমে। দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের দেশ পরিচালনা শেষে অনুষ্ঠিত ১২ ফেব্রুয়ারির সুন্দর, সুষ্ঠু নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা ২০২৬-এর বসন্তে বাংলাদেশ দেখল এক নতুন ভোরের সংসদ। ১২ মার্চ ২০২৬ যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলো, তা শুধু একটি আইনসভার আনুষ্ঠানিক যাত্রা ছিল না; বরং তা ছিল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এক আকাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের মহড়া। প্রথম অধিবেশনেই বিদ্যুৎ খাতের বিশেষ বিধান বাতিলকরা হয়, যা ছিল শেখ হাসিনার করা দুর্নীতির এক কালো আইন। এছাড়া দুর্নীতিবিরোধী শ্বেতপত্র প্রকাশের মতো সাহসী সিদ্ধান্তও সংসদে নেওয়া হয়েছে। এগুলো জানান দিচ্ছেÑএই সংসদ শুধু সংখ্যাতত্ত্বের নয়; বরং জনমতের প্রতি দায়বদ্ধ এক নতুন পথচলার দিশারি, যা দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা ।

নতুন-সংসদে-নতুন-হাওয়া

একনজরে সংসদের প্রথম অধিবেশনের কার্যক্রম

সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ ২০২৬ শুরু হয় পূর্ববর্তী স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদের জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বা নিয়ম মেনে। অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে মুক্তিযুদ্ধের বীরবিক্রম মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। প্রথম অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও বিশেষ আলোচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল জাতীয় ঐক্যের ডাক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, অর্ডিন্যান্স উপস্থাপন, বিরোধী দলের সক্রিয় অবস্থান, রাষ্ট্রপতির ভাষণ, ওয়াকআউট ইত্যাদি। প্রথম অধিবেশনে এ পর্যন্ত যে গঠনমূলক বিতর্ক ও ঐক্যের পরিবেশ দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে একটি ইতিবাচক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত।

সংসদে এ পর্যন্ত ৯১টি বিল পাস হয়েছে। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষ আলোচনার মধ্যে ছিল জ্বালানি সংকট, কৃষি ও কৃষক, গণতন্ত্র এবং ঐক্য বিষয়ে প্রাণবন্ত বিতর্ক। দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি ও পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিসের ওপর আলোচনা হয়। প্রান্তিক কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’ সহায়তা এবং সারের কৃত্রিম সংকট রোধে নতুন ডিলার নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়। বিভাজন পরিহার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানে সংসদকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। প্রথম অধিবেশনে এ পর্যন্ত বিরোধী দল কয়েকবার ওয়াকআউট করে। এর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদ, গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে এবং ৯ এপ্রিল বিল পাসের সময় কয়েকটি বিলে আপত্তির জেরে।

প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান দেশের বর্তমান জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সংকটকে ‘জাতীয় সংকট’ আখ্যায়িত করে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনে বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবে সাড়া দেন। এজন্য বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। গতকাল সংসদে এ কমিটি গঠিত হয়েছে। এটি সংসদীয় রাজনীতিতে একটি নজিরবিহীন ঐক্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। গত দেড় দশকের শিক্ষা খাতের দুর্নীতির মূলোৎপাটনে একটি ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশের সিদ্ধান্ত অধিবেশনে গৃহীত হয়। জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে এবং দেশের রাজনীতির কিংবদন্তি বেগম খালেদা জিয়ার অবদান নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয় এবং শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ এই অধিবেশনে পেশ হয়।

সংসদ ভবন থেকেই লোডশেডিং শুরু করার মতো প্রতীকী ও গঠনমূলক প্রস্তাব বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষ থেকে আসে এবং বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের আধিক্য (৭১ বিধিতে ২৭টি এবং ১৩১ বিধিতে ৯৭টি) প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়।

বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী তদারকি সেল গঠন এবং সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের করা অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দেশের একটি বড় পক্ষ এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে। বিদেশি কিছু মানবাধিকার সংস্থা অবশ্য এর সমালোচনা করেছে। অধিকাংশের মত হচ্ছে, বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্য এ উদ্যোগ অপরিহার্য ছিল। কারণ আওয়ামী লীগ দলগতভাবেই মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে এবং দেশের সম্পদ লুট করেছে। শুধু জুলাই আন্দোলনে জাতিসংঘের হিসেবেই তারা ১৪০০ ছাত্র-জনতা হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে আহত করেছে, যাদের বেশিরভাগই এখন পঙ্গুত্ব। দুর্নীতি, মানুষ খুন, লুটপাট ও গণতন্ত্র ধ্বংস করাই ছিল তাদের শাসন। ফলে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ রাখা যথোপযুক্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগকে নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি হচ্ছে ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন চালিয়ে দেশের মানুষকে কষ্ট এবং গণতান্ত্রিক কার্যক্রম ধ্বংস করে দেওয়া।

সংসদে অবশ্য গুম কমিশন এবং গণভোট অধ্যাদেশসহ ২০টি অধ্যাদেশ বিল হিসেবে পাস না করে আপাতত বাতিল বা স্থগিত রাখার সরকারি দলের সিদ্ধান্তের সমালোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ্যে এ নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী এবং গুম হওয়া পরিবারগুলোর স্বজনরা এ নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশা ব্যক্ত করেছে। তারা মনে করছেন, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশটি পাস না হওয়ার গুমের শিকার ব্যক্তিদের জন্য আইনি প্রতিকার পাওয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং অপরাধীদের দায়মুক্তির সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে ব্যাখ্যা দেন, এই অধ্যাদেশগুলো পুরোপুরি বাতিল হচ্ছে না। এগুলো আরো শক্তিশালী এবং যুগোপযোগী করে পরে সংসদে তা বিল আকারে আনা হবে।

সংসদের কার্যক্রমের জন্য আলোচিত যারা

সংসদ নেতা : প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের ভূমিকা আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার ও বিরোধী দলের সমানসংখ্যক ১০ সদস্য নিয়ে ‘যৌথ কমিটি’ গঠন নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করেছে। তার নিয়মিত ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব’ সংসদ সদস্যদের মধ্যে বেশ আগ্রহের জন্ম দিচ্ছে। সবাই এ সময়টাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে নিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ নিচ্ছেন। এটাকে ‘জনগণের সংসদ’ গড়ার প্রত্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিরোধীদলীয় নেতা : সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানি সংকট এবং বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গঠনমূলক ও জোরালো বক্তব্য রাখছেন। সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে একই সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার তার কৌশলকে ‘পরিণত রাজনীতির’ পরিচয় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

সংসদের স্পিকার : স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে সংসদ পরিচালনা করছেন, যা মানুষের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে, সংসদকে প্রাণবন্ত রাখা এবং নতুন সদস্যদের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ইতোমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে। বিরোধী দলের ওয়াকআউটকে তিনি গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তবে সংসদকে কার্যকর রাখতে তিনি নিয়মিতভাবে বিরোধী দলকে আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায়ের পরামর্শ দেন। স্পিকারের সভাপতিত্বে প্রথম অধিবেশনের শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলো পর্যালোচনা ও আলোচনার সুযোগ দেওয়া, ৯ এপ্রিল ৩১টি বিল নিয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা এবং অর্থ বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিলগুলো পাসের সময় প্রশ্ন করার সুযোগ প্রদান স্পিকার হিসেবে তার সক্রিয়তার পরিচয়। রেকর্ডসংখ্যক বিল পাসের মাধ্যমে আইনপ্রণয়নে গতি আনা এবং সংসদ পরিচালনায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টার জন্য তাকে কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সংসদের স্পিকার বা অভিভাবক হিসেবে হাফিজ উদ্দিন নতুন সদস্যদের সংসদীয় রীতিনীতি ও শিষ্টাচার শেখানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় ও ভালো ভূমিকা রাখছেন। তিনি তাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিচ্ছেন। তিনি নতুন সদস্যদের সংসদের ‘কার্যপ্রণালি বিধি’ বইটি গুরুত্ব সহকারে পড়ার পরামর্শ দেন। তিনি নিয়মিত লাইব্রেরিতে গিয়ে অতীতের রেকর্ড দেখা, সংসদ কক্ষে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় সম্মান প্রদর্শনের বৈশ্বিক রীতি অনুসরণ, অধিবেশন চলাকালে স্পিকার এবং মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে যাতায়াত না করা, অধিবেশন কক্ষে মোবাইল ফোন ও খাওয়া-দাওয়া থেকে বিরত থাকা, দর্শক গ্যালারিতে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে কুশলবিনিময় বা হাত না মেলানো, প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে সঠিক পদ্ধতিতে ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ তোলা, বক্তৃতা দেওয়ার সময় সরাসরি লিখিত বক্তৃতা না পাঠ করে নোট দেখে বক্তব্য দান, ফ্লোরে দাঁড়িয়ে মৌখিকভাবে কিছু না বলে নোটিস জমা দেওয়ার পরামর্শ, রাস্তাঘাটের আন্দোলনের মতো বক্তব্য না দেওয়া এবং হট্টগোল না করে বিধি মেনে বক্তব্য প্রদান, কার্যপ্রণালি বিধির পাশাপাশি সংসদীয় রীতিনীতি, রেওয়াজ ও শিষ্টাচার ভালোভাবে রপ্ত করা ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন, যা সংসদ সদস্যরা ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন।

স্পিকারের পাশাপাশি ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সংসদ পরিচালনাও সবার দৃষ্টি কেড়েছে। সংসদে তিনিও নতুন। তবে অধিবেশন পরিচালনায় তার মুনশিয়ানা এবং আইনি ব্যাখ্যাগুলো সংসদ সদস্যদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বেশ সক্রিয় এবং প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছেন। সংসদে তিনি ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপনকালে স্পষ্টভাবে জানান, এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও পরিবর্তন সম্পূর্ণ সংসদের এখতিয়ারভুক্ত। তিনি নতুন সংসদীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, অতীতের নেতিবাচক উদাহরণগুলো পরিহার করে আমাদের জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং অপরাধ করলে কেউ ছাড় পাবে না, দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তার আইনি ব্যাখ্যা ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ছাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোনো কোনো সদস্য কিছু বিষয়ে তার সমালোচনা করলেও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও আইনি অভিজ্ঞতায় দেওয়া বক্তব্য ও যুক্তিতর্কের প্রশংসাও করছেন।

চিফ হুইপ : সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ডও ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন সংসদ সদস্যরা। বিশেষ করে সংসদে বিরোধী দলের মতামত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া এবং সার সংকটের মতো তৃণমূলের সমস্যাগুলো সাহসের সঙ্গে তুলে ধরার কারণে তিনি আলোচনায় রয়েছেন।

তরুণদের মধ্যে এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ ও প্রবীণ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যও দৃষ্টি আকৃষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে হাসনাত আবদুল্লাহ সংসদে ভালো করার জন্য নিয়মিত স্টাডি করে যাচ্ছেন এবং সক্রিয় থাকছেন। মনিরুল হক চৌধুরীর হিউমার সবার দৃষ্টি কাড়ছে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, আমার দেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন