অষ্টম সংসদ নির্বাচনের প্রচারণাকালে বিএনপি নির্বাচনি ইশতেহারে সরকার গঠন করতে পারলে আওয়ামী আমলের বর্ধিত সন্ত্রাস দমনের ওয়াদা করে। পরে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচনে জয়লাভের পর দলটি জামায়াতসহ আরো দুটি দল নিয়ে চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে (২৮-১০-২০০১—২৭-১০-২০০৬)। কিন্তু ২০০২ সালে সন্ত্রাস বাড়তে থাকলে সরকারের সমালোচনা শুরু হয়। খালেদা জিয়া তখন সন্ত্রাস দমনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
বিভিন্ন পোশাকধারী বাহিনী থেকে বাছাই করা সদস্য নিয়ে গঠন করা হয় যৌথ বাহিনী। এ বাহিনী ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করতে থাকে। এ অভিযানে যারা ধরা পড়া বা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তাদের বেশিরভাগই ছিলেন বিএনপি নেতাকর্মী। এ অভিযানে পোশাকধারী বাহিনীর প্রায় ৫০ হাজার সদস্য অংশগ্রহণ করেন। ২০০২ সালের মধ্য অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত এ অভিযানে ১১ সহস্রাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, ২ সহস্রাধিক অবৈধ অস্ত্র ও ৩০ হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। কিন্তু সেনা হেফাজতে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি নিহত হন। প্রথম দিকে এমন নিহতের ঘটনাকে ‘হার্ট অ্যাটাক’ বলে আখ্যায়িত করা হলে তা বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি। যুগপৎ স্বদেশি ও বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর নিন্দা করলে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি অপারেশন ক্লিন হার্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ অভিযানের বিরুদ্ধে যাতে কেউ মামলা করতে না পারেন, সেজন্য ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন—২০০৩’ পাস করা হয়। পরে ২০১২ সালে এ দায়মুক্তি আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করলে আদালত আইনি প্রক্রিয়া শেষে এ আইনকে অবৈধ এবং সংবিধানের পরিপন্থী বলে রায় দেন।
তবে ২০০৩ সালে অপারেশন ক্লিন হার্ট অভিযান বন্ধ হওয়ার পর প্রত্যাশিত মাত্রায় সন্ত্রাস না কমায় সরকার নতুন পরিকল্পনা করে। বিভিন্ন পোশাকধারী বাহিনীর বাছাই করা সদস্যদের নিয়ে ২০০৪ সালে সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যে গঠন করে এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। এ বাহিনীকে এফবিআইয়ের আদলে উন্নত প্রশিক্ষণ, আধুনিক যানবাহন এবং নতুন পোশাকে সজ্জিত করা হয়। তবে কালো রঙের পোশাকের সঙ্গে র্যাব সদস্যদের মাথায় ধাতব কালো হেলমেটের পরিবর্তে কালো কাপড়ের রুমাল কেন ব্যবহার করা হয়েছিল, তা ছিল এক রহস্য। তবে র্যাব গঠন করে সন্ত্রাসীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়। সন্ত্রাস দমনে র্যাবের সঙ্গে নামানো হয় ডিবি পুলিশের বিশেষ দল ‘অস্কার চার্লি’, ‘কোবরা’ এবং একই প্রকৃতির আরেকটি বাহিনী ‘চিতা’। কোবরা ও অস্কার চার্লি এক মাসে (সেপ্টেম্বর ২০০৪) ৩৭টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং ১০২ জন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে। চিতা মাঠে নেমেই শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের সহযোগী ভুট্টোকে পাকড়াও করে। ওই সরকারের প্রথম দুই বছর আট মাসে ৫১ জন পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের সম্পর্কের অবনতি প্রমাণ করে (প্রথম আলো, ৫-১২-২০০৫)। চারদলীয় জোট সরকারের সময় পুলিশ, কোবরা, অস্কার চার্লি, চিতা, র্যাব প্রভৃতি বাহিনীর সম্মিলিত চাপে সন্ত্রাসীদের মনোবল ভেঙে পড়ায় তাদের অনেকে বিদেশে পালিয়ে যায়।
র্যাব কাজ শুরু করার পর সন্ত্রাস পরিস্থিতির উন্নতি হয়। র্যাবের হাতে ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটায় সুশীল সমাজে সমালোচনা ওঠে। তবে র্যাব রাজনৈতিক বিরোধিতা মনে না করে সন্ত্রাস দমনে দলীয় পরিচয় না দেখে কাজ করেছিল। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চট্টগ্রামে র্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে প্রথম যে ১৬ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছিল, তার মধ্যে ১৫ জনই ছিল যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা এবং মাত্র একজন ছিল ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা (প্রথম আলো, ০৪-১২-২০০৪)। মানবাধিকারকর্মীরা র্যাবের ক্রসফায়ারের সমালোচনা করলেও সন্ত্রাস দমনের বিকল্প ব্যবস্থার উদ্ভাবন করতে পারেননি। তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত ছিল র্যাবের ব্যবহার সন্ত্রাস দমনে সীমিত রাখা। কিন্তু সরকার ওই সময় তাবলিগ জামায়াতের বিশ্ব ইজতিমায়ও র্যাবকে ব্যবহার করেছিল। এখানে বিকল্প হিসেবে অস্কার চার্লি, কোবরা, চিতা প্রভৃতি বাহিনী ব্যবহার করা যেত।
পরে ক্রমান্বয়ে র্যাব সন্ত্রাস দমনে পেশাদারিত্ব হারাতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে র্যাব সদস্যরা নিজেরাই সন্ত্রাসী কাজে জড়িত হয়ে পড়েন। এতে র্যাবের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া র্যাবকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিয়ে একে পুলিশ বাহিনীর অধীনে রাখায় এবং এ এলিট ফোর্সের জন্য পৃথক নিয়োগব্যবস্থা না করে বিভিন্ন পোশাকধারী বাহিনী থেকে সদস্য নিয়ে কাজ করানোয় বাহিনীতে সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হয়, যা র্যাবের আভিজাত্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারসহ বেশ কিছু ঘটনা র্যাবের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত করে। তাছাড়া বেনজীর আহমেদ র্যাবের ডিজি (জানুয়ারি ২০১৫—মধ্য এপ্রিল ২০২০) থাকাকালে নিজেও নানা অপকর্মে জড়িত হয়ে পড়েন। র্যাবের উপস্থিতিতে রাজধানী ঢাকায় প্রায় ডজনাধিক ক্যাসিনোতে জুয়া খেলা ও নানা অপকর্ম সংঘটিত হতো। ২০১৯ সালে এসব ক্যাসিনোতে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
বেনজীর র্যাবের ডিজি থেকেও কীভাবে বোট ক্লাব সভাপতি ছিলেন, সে বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। আওয়ামী কর্তৃত্ববাদী সরকারের আমলে র্যাব অনেক ক্ষেত্রে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ভূমিকা পালন করে। সবকিছু মিলিয়ে র্যাব তার চরিত্র ও আভিজাত্য হারায়। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সাতজন র্যাব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও র্যাব বিলুপ্তির দাবি ওঠে এবং পুলিশ প্রশাসন ও সংস্কারবিষয়ক কমিটিও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। এসব কারণে বর্তমান সরকার র্যাব বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং এ লক্ষ্যে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সংসদে বিল পাস করে। এ বাহিনী সন্ত্রাস দমনে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে কি না, তা দেখতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
সরকার যদি সত্যিই সন্ত্রাস দমনে আগ্রহী হতো, তাহলে পুলিশ বাহিনী দিয়েই সন্ত্রাস দমন করা অসম্ভব হতো না। এক-এগারোর ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন স্বল্পায়ু সরকারের আমলে যে পুলিশ সংস্কার অধ্যাদেশটি অবসরপ্রাপ্ত আইজি শাহজাহানকে দিয়ে তৈরি করানো হয়েছিল, তা যথেষ্ট ভালো ছিল। সরকার যদি ওই অধ্যাদেশটি যাচাই-বাছাই করে পাস করত, তাহলে পুলিশ বাহিনী সন্ত্রাস দমনে পেশাদার হয়ে উঠতে পারত। নতুন নতুন বাহিনী সৃষ্টি করলেই যে সন্ত্রাস দমন সম্ভব হবে, এমনটা বিশ্বাস করার কারণ নেই। নবগঠিত বাহিনী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, নাকি কোনো বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করবে, সে বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ না হলেও একজন নাগরিক হিসেবে পরামর্শ দেব, সন্ত্রাস দমনে কোনো বিশেষ বাহিনী গঠন করলে তার জন্য পৃথকভাবে লোকবল নিয়োগ করা দরকার। র্যাবের মতো বিভিন্ন বাহিনী থেকে ধার করে সদস্য এনে বাহিনী তৈরি করলে সে বাহিনীতে সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হয়। যেকোনো বাহিনী থেকে ডেপুটেশনে অল্প কিছুদিনের জন্য অন্য বাহিনীতে এলে আগত কর্মকর্তাদের ওই বাহিনীর প্রতি একাত্মতা ও নিষ্ঠা গড়ে ওঠে না। এজন্য বলব, সরকার যদি এসআরবিকে একটি অভিজাত এবং স্থায়ী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, তাহলে এসআরবির জন্য পৃথকভাবে লোকবল নিয়োগের কথা ভাবতে পারে। তা না হলে প্রথমে কাজে নেমে চমক দেখালেও পরে ক্রমান্বয়ে এ বাহিনীকে র্যাবের পরিণতি বরণ করতে হতে পারে।
কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনার সোয়া এক দশকের অপশাসনে রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সর্বত্র সন্ত্রাস ও দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়। এ দুরবস্থা থেকে দেশকে সুশাসনের পথে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন কঠোর দলীয় শৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। পুলিশ বাহিনীর গতানুগতিক কর্মতৎপরতায় এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা কঠিন হবে। সে জন্য পরিস্থিতি ও বিরাজমান বাস্তবতা বিবেচনা করে সরকারের এসআরবি গঠনের সিদ্ধান্ত ঠিক আছে। কারণ, র্যাব বিগত বছরগুলোতে যে দুর্নাম অর্জন করেছে, তাতে এ বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস হ্রাস পেয়েছে। তবে এসআরবিতে র্যাবের মতো বিভিন্ন বাহিনী থেকে ধার করা লোকবল নিয়োগ করে সন্ত্রাস দমন করতে চাইলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ ক্ষেত্রে নতুন লোকবল নিয়োগ করে তাদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে মাঠে নামালে সন্ত্রাস পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
সরকারকে মনে রাখতে হবে, একটি সাবেক বড় দল রাজনীতি থেকে বিতাড়িত হলেও প্রতিটি সেক্টরে সে দলের লোকজন ও সমর্থক রয়েছেন। তারা এ সরকারের কাজে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করতে চাইবে। সেদিকটা মনে রেখে সরকারের উচিত হবে যত দ্রুত সম্ভব এসআরবিকে সক্রিয় করা। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করা হয়েছে। সেজন্য সরকারকে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।
দেশের পুলিশ বাহিনীর প্রতি জনমনে আস্থা নেই। আর এসআরবি যেহেতু পুলিশের একটি শাখা হিসেবে কাজ করবে, সেজন্য এ বাহিনী কতটা নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, তা নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। জনগণ চান, নবগঠিত এসআরবির যেন র্যাবের পরিণতি বরণ করতে না লাগে। এ বাহিনীকে বিশেষভাবে গড়ে তুলতে হলে বিভিন্ন বাহিনী থেকে ভাড়া করা লোকজন নিয়ে তা করা কঠিন হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার যদি এসআরবিতে নতুন লোকবল নিয়োগ করে দ্রুততম সময়ে তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগায়, তাহলে এ নতুন বাহিনীর পক্ষে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কাজ করা সম্ভব হবে। তা না হলে নতুন বোতলে পুরোনো মদ রাখার মতো নতুন বাহিনী সৃষ্টি করলে সে বাহিনী অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে কতটা সফল হবে, তা দেখতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
akhtermy@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

