আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

শাহীদ কামরুল

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

আজকের লেখা লিখতে গিয়ে একটা গ্রিক মহাকাব্যিক ঐতিহ্যের এক মাশহুর কাহিনি মনে পড়ল, ট্রয়ের রাজপুত্র এনিয়াসের গল্প, যা পরে রোমান মহাকাব্যে নতুন অর্থ পায়। গ্রিক যুদ্ধশেষে ট্রয় ধ্বংস হলে এনিয়াস তার বাবাকে কাঁধে ও ছেলেকে হাতে নিয়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসে। তার সঙ্গে থাকে ট্রয়ের দেবমূর্তি ও স্মৃতি। লম্বা সফরের পর সে পৌঁছায় ইতালিতে, যেখানে তার বংশধরদের থেকেই রোমান জাতির জন্ম বলে কল্পিত হয়। অর্থাৎ এক পরাজিত, বহিরাগত ট্রোজান ঐতিহ্যই রোমান পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে ওঠে। এই কাহিনি পরে রোমান কবি ভার্জিল তার মহাকাব্য ঈনিড-এ রূপ দেন। সেখানে এনিয়াস আর ‘বিদেশি ট্রোজান’ নয়; সে রোমের আদি পূর্বপুরুষ। এই গল্পের ভেতরেই ভাষা-পরিচয়ের এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে : যা একসময় বহিরাগত ছিল, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সেটিই স্থানীয় হয়ে ওঠে এবং নতুন জাতিগত স্মৃতির অংশ হয়। রোমানরা তাদের পরিচয় নির্মাণ করেছে গ্রিক-ট্রোজান ঐতিহ্য গ্রহণ করে; তারা এটিকে অস্বীকার করেনি। বরং বহিরাগত উত্তরাধিকারকে নিজেদের ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ভাষার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে—যে শব্দ বহিরাগত উৎস থেকে আসে, তা যদি সামাজিক স্মৃতি ও ব্যবহারে স্থিত হয়, তবে সেটিই স্থানীয় হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষার আরবি-ফারসি উৎসজাত শব্দগুলোর অবস্থান অনেকটা সেই ট্রোজান উত্তরাধিকারের মতো। এগুলো কোনো বাহ্যিক অনুপ্রবেশ নয়; ইতিহাসের ভেতর দিয়ে এসে স্থানীয় চেতনার অংশ হয়েছে। যেমন : রোমানরা ট্রোজান উৎসকে অস্বীকার করলে তাদের নিজস্ব উৎপত্তির কাহিনি ভেঙে পড়ত, তেমনি বাংলা ভাষা থেকে আরবি-ফারসি স্তর মুছে ফেলতে গেলে বাংলা ইতিহাসের বড় অংশই মুছে যাবে। ইংরেজি সাহিত্যেও অনুরূপ রূপক দেখা যায়। শেকশপিয়ারের নাটকে বারবার পরিচয় বদল ও ভাষিক মিশ্রতার প্রশ্ন উঠে আসে। উদাহরণ হিসেবে দ্য টেম্পেস্টের-এর ক্যালিবান চরিত্রকে ধরা যায়। সে দ্বীপের আদিবাসী, কিন্তু উপনিবেশকারী প্রসপেরোর ভাষা শেখে এবং সেই ভাষাতেই প্রতিবাদ করে। তার বিখ্যাত উক্তি—‘You taught me language, and my profit on’t is, I know how to curse’—দেখায়, ভাষা একবার সামাজিক ব্যবহারে প্রবেশ করলে সেটি ক্ষমতার বিরুদ্ধেও ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ ভাষা উৎসের নিয়ন্ত্রণ ছাড়িয়ে যায়; ব্যবহারকারীর হয়ে যায়। বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি রাজনৈতিক শব্দগুলোর পুনরুত্থানও এই প্রক্রিয়ার মতো। একসময় প্রশাসনিক বা ধর্মীয় স্তরে ব্যবহৃত শব্দগুলো জনতার আন্দোলনে এসে নতুন অর্থ পেয়েছে। যেমন ক্যালিবান উপনিবেশকের ভাষাকে নিজের অস্ত্র বানায়, তেমনি জনগণ ঐতিহাসিক শব্দকে নতুন রাজনৈতিক অর্থে ব্যবহার করে। ভাষা তখন উৎসের নয়; ব্যবহারকারীর। এখানে একটি গভীর দর্শনীয় সমান্তরাল দেখা যায়। এনিয়াস ট্রয়ের স্মৃতি নিয়ে রোম গড়ে; ক্যালিবান উপনিবেশকের ভাষা নিয়ে প্রতিবাদ করে; আর বাংলা সমাজ বহু সংস্কৃতিগত শব্দ নিয়ে নিজস্ব ভাষা নির্মাণ করে। তিন ক্ষেত্রেই একটি সত্য স্পষ্ট : পরিচয় ও ভাষা কখনো বিশুদ্ধ নয়; তা ইতিহাসের মিশ্র ধারাবাহিকতায় গঠিত।

আসল আলাপে আসি, আসলে ইতিহাসের স্তরটি ধরলে দেখা যায়, বাংলা ভাষার গঠনই এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের ফল। পাল-সেন যুগের সংস্কৃত-প্রাকৃত ভিত্তি, তুর্কি-আফগান শাসনামলে আরবি-ফারসি প্রশাসনিক ও ধর্মীয় শব্দ, মোগল আমলের দরবারি ভাষা, ঔপনিবেশিক যুগে ইংরেজি—সব মিলিয়ে বাংলা এক বহু সংস্কৃতিগত ভাষা। উনিশ শতকের নবজাগরণে যখন আধুনিক বাংলা গঠিত হয়, তখন একই সঙ্গে দুই ধারার শব্দভান্ডার তৈরি হয়: সংস্কৃতঘেঁষা ও ফারসি-আরবি উৎসজাত। সাহিত্য, প্রশাসন, ধর্ম, লোকভাষা—সবখানেই এই দ্বৈততা ছিল। ফলে ‘ইনসাফ’ ও ‘ন্যায়’, ‘জালিম’ ও ‘অত্যাচারী’—উভয়ই ঐতিহাসিকভাবে বাংলা। কোনো একটিকে বহিরাগত বলা মানে ইতিহাসের অর্ধেক মুছে ফেলা। এখানে ভাষা-দর্শনের একটি মৌলিক ধারণা প্রাসঙ্গিক বলে অনুমান করি। আদতে ভাষা সমাজের অভিজ্ঞতার স্মৃতি ধারণ করে, যে সমাজ বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম শাসন, সুফি সংস্কৃতি, পারস্য-প্রভাবিত প্রশাসনিক কাঠামো ও উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গেছে, তার ভাষায় সেই ইতিহাসের চিহ্ন থাকবে। এই চিহ্ন মুছে ফেলার কোশেশ আসলে স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা। ইতিহাসতত্ত্বে এটিকে কালচারাল ইরেজার বলা হয়, অর্থাৎ সাংস্কৃতিক স্তর মুছে ফেলা। ভাষার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে।

বিজ্ঞাপন

যাই হোক, কোনো ভাষার শব্দভান্ডার কখনোই একক উৎসে নির্মিত হয় না। বাংলা ভাষা ঐতিহাসিকভাবে সংস্কৃত, প্রাকৃত, আপভ্রংশ, আরবি, ফারসি, তুর্কি, পর্তুগিজ, ইংরেজি—অসংখ্য উৎসের স্তরে গঠিত। ‘শহীদ’ ও ‘মিনার’ শব্দ যেমন আরবি-ফারসি উৎসজাত, তেমনি ‘বাংলা’ শব্দটির মধ্যেই ফারসি ‘বঙ্গ’ ও সংস্কৃত প্রত্যয়ের ঐতিহাসিক স্তর আছে; ‘একাডেমি’ গ্রিক-লাতিন হয়ে ইংরেজির মাধ্যমে এসেছে। সুতরাং উৎসের ভিত্তিতে শব্দকে ‘বিদেশি’ বলে প্রত্যাখ্যান করা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে অসংগত। কারণ ভাষা কোনো রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না; ভাষা সামাজিক ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় হয়ে যায়। যে শব্দ শতাব্দীর ব্যবহারে স্থানীয় অর্থ ও আবেগ ধারণ করেছে, সেটি আর বহিরাগত থাকে না। ভাষাবিজ্ঞানে এটিকে লেক্সিকাল নেটিভাইজেশন বলা হয়—শব্দ উৎসে বিদেশি হলেও ব্যবহারে স্বদেশি হয়ে ওঠে।

এখন আসি ‘ইনকিলাব, আজাদি, ইনসাফ, মজলুম, জালিম’ শব্দগুলোকে ‘পাকিস্তানি’ বলা প্রসঙ্গে। এটি ইতিহাসগতভাবে ভুল। এসব শব্দ আরবি-ফারসি উৎসের; দক্ষিণ এশিয়ার বহু ভাষায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত। মোগল প্রশাসনিক ভাষা, সুফি সাহিত্য, ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন, উনিশ শতকের রাজনৈতিক ভাষা—সবখানেই এগুলোর উপস্থিতি আছে। বাংলা মুসলিম সাহিত্যধারা, পুঁথি, দরবারি ভাষা, এমনকি ঊনবিংশ শতকের জাতীয়তাবাদী বক্তৃতাতেও এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে এগুলো কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। ‘পাকিস্তানি শব্দ’ বলা আসলে ভাষার ইতিহাসকে রাষ্ট্রের ইতিহাসে সংকুচিত করা, যা একটি অনৈতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি। আর ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয় সিঙ্ক্রোনিক ও ডায়াক্রোনিক বিশ্লেষণে। সিঙ্ক্রোনিক অর্থাৎ বর্তমান ব্যবহারের স্তরে দেখলে, এই শব্দগুলো এখন বাংলাদেশের জনভাষায় রাজনৈতিক ন্যায়, প্রতিরোধ, অবিচার, নিপীড়ন ইত্যাদি ধারণার শক্তিশালী চিহ্ন হয়ে গেছে। ২০২৪-এর গণআন্দোলন ও পরবর্তী বিপ্লবী ভাষায় এগুলো ব্যবহৃত হওয়ায় শব্দগুলো নতুন সামাজিক অর্থ পেয়েছে। ভাষায় অর্থ বর্তমান ব্যবহারে নির্ধারিত হয়; উৎসে নয়। তাই সিঙ্ক্রোনিক দৃষ্টিতে এগুলো এখন স্থানীয় রাজনৈতিক শব্দ।

ডায়াক্রোনিক অর্থাৎ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় দেখলে, শব্দগুলো বহু শতাব্দী ধরে বাংলা ভাষিক অঞ্চলে ব্যবহৃত। সুফি ও দরবেশ সাহিত্য, মুসলিম শাসনামলের প্রশাসনিক শব্দভান্ডার, উপমহাদেশীয় জনআন্দোলনের ভাষা—সব মিলিয়ে এগুলোর দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এই ধারাবাহিকতা দেখায়, শব্দগুলো পাকিস্তান রাষ্ট্রের আগেই স্থানীয় ছিল। ফলে ডায়াক্রোনিক বিশ্লেষণেও ‘পাকিস্তানি’ তকমা টেকে না।

এখন সিনট্যাগম্যাটিক ও প্যারাডিগম্যাটিক বিশ্লেষণ ধরলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট। সিনট্যাগম্যাটিক মানে বাক্যের মধ্যে শব্দের সম্পর্ক। বাংলা বাক্যে ‘ইনসাফ চাই’, ‘জালিমের বিরুদ্ধে’, ‘মজলুমের পক্ষে’—এই গঠনগুলো পুরোপুরি বাংলা ব্যাকরণে বসে গেছে। শব্দগুলো বাংলা বাক্যরীতির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যুক্ত। কোনো বহিরাগত ব্যাকরণগত বিচ্ছিন্নতা নেই। অর্থাৎ সিনট্যাগম্যাটিক স্তরে এগুলো বাংলা।

প্যারাডিগম্যাটিক মানে একই অর্থক্ষেত্রে বিকল্প শব্দসমষ্টি। ‘ন্যায়’ ও ‘ইনসাফ’, ‘অত্যাচারী’ ও ‘জালিম’, ‘নিপীড়িত’ ও ‘মজলুম’—এই জোড়াগুলো একই অর্থক্ষেত্রে অবস্থান করে। বাংলা ভাষা এখানে দ্বৈত শব্দভান্ডার ধারণ করে : সংস্কৃতধর্মী ও আরবি-ফারসি উৎসজাত। এই দ্বৈততা বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য। ফলে কোনো এক সেটকে বাদ দেওয়া মানে প্যারাডিগম্যাটিক ক্ষেত্র সংকুচিত করা—অর্থাৎ ভাষার প্রকাশক্ষমতা কমানো।

এখন রাজনৈতিক প্রসঙ্গে আসা যাক। বিপ্লব ও গণআন্দোলনে শব্দচয়ন শুধু ভাষাগত নয়; আবেগ ও ঐতিহাসিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। উপমহাদেশের বহু গণআন্দোলনে আরবি-ফারসি উৎসজাত রাজনৈতিক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে—কারণ এগুলো জনতার অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। ‘ইনকিলাব’ শব্দটি উপমহাদেশীয় প্রতিরোধের দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ; এটি বিপ্লবের আবেগ, পরিবর্তনের তীব্রতা বহন করে।

‘আজাদি’ মুক্তির অনুভূতি বহন করে; ‘ইনসাফ’ ন্যায়বিচারের নৈতিক শক্তি প্রকাশ করে। এসব শব্দ মানুষের মনে ঐতিহাসিক প্রতিরোধের প্রতিধ্বনি জাগায়। তাই বিপ্লবী জনতা এগুলো ব্যবহার করে—কারণ শব্দ শুধু অর্থ নয়, স্মৃতি ও আবেগ বহন করে। ভাষাতত্ত্বে একে কনোটেটিভ পাওয়ার বলা হয়। যে শব্দ ঐতিহাসিক সংগ্রামের স্মৃতি বহন করে, সেটি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়। তাছাড়া বিপ্লবী ভাষা সবসময় সেই শব্দ বেছে নেয়, যা মানুষের ঐতিহাসিক স্মৃতি ও আবেগ জাগায়। তাই সাম্প্রতিক আন্দোলনেও এই শব্দগুলোর পুনরুত্থান স্বাভাবিক; ভাষা ইতিহাসের স্মৃতি থেকে শক্তি নেয়।

এখানে একটি গভীর দার্শনিক সত্য আছে: ভাষা কখনো বিশুদ্ধ নয়; ভাষা সবসময় মিশ্র। মানবসভ্যতার ইতিহাসই সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ইতিহাস। কোনো ভাষা অন্য ভাষা থেকে ধার না নিলে তার বিকাশ থেমে যেত। বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে কারণ, সে বহিরাগত শব্দকে গ্রহণ করে নিজস্ব করেছে। যারা এই শব্দগুলোকে অগ্রহণযোগ্য বলছে, তাদের অবস্থান মূলত ভাষাগত শুদ্ধতাবাদ বা সাংস্কৃতিক একরৈখিকতার ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রকৃতি বহু সংস্কৃতিগত। ভাষাকে এক উৎসে সীমাবদ্ধ করতে চাওয়া মানে ভাষার ইতিহাস অস্বীকার করা। এখানে একটি মৌলিক যুক্তি আছে : যদি উৎসের কারণে শব্দ বাতিল করতে হয়, তবে ‘শহীদ’, ‘মিনার’, ‘বাংলা’, ‘একাডেমি’—সবই প্রশ্নের মুখে পড়ে। কিন্তু বাস্তবে কেউ এগুলো বাতিল করে না, কারণ এগুলো ইতোমধ্যে স্থানীয় হয়ে গেছে। একই যুক্তি ‘ইনকিলাব’ বা ‘ইনসাফ’-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভাষাতাত্ত্বিকভাবে নীতি এক হলে সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে হবে; বাছাই করে নয়।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভাষা ও পরিচয়ের সম্পর্ক। ভাষা শুধু যোগাযোগ নয়; পরিচয়ের বাহক। বাংলা ভাষার পরিচয় বহুস্বরের ওপর দাঁড়িয়ে। এখানে সংস্কৃতধর্মী ও আরবি-ফারসি উভয় স্তর আছে। একটিকে বাদ দেওয়া মানে পরিচয়ের একটি অংশ অস্বীকার করা। ফলে এসব শব্দের বিরুদ্ধে অবস্থান আসলে ভাষার একাংশকে অস্বীকার করা—যা সাংস্কৃতিকভাবে বিভাজন সৃষ্টি করে।

২০২৪-এর বিপ্লব-পরবর্তী জনভাষায় এই শব্দগুলোর পুনরুত্থান দেখায় যে ভাষা সামাজিক বাস্তবতায় পুনর্গঠিত হয়। জনগণ যে শব্দে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করে, সেটিই ভাষায় টিকে থাকে। ভাষা উপর থেকে নির্ধারিত হয় না; নিচ থেকে গড়ে ওঠে। তাই জনতার ব্যবহারে প্রতিষ্ঠিত শব্দকে কৃত্রিমভাবে অগ্রহণযোগ্য বলা ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনের বিরুদ্ধে যায়।

এখন দর্শনের দিকটি ধরলে দেখা যায়, ভাষা ও অর্থকে স্থির ধরা যায় না—এই ধারণা আধুনিক দর্শনের কেন্দ্রীয় বিষয়। অর্থ শব্দের উৎসে নয়; ব্যবহারে তৈরি হয়। কোনো শব্দ শতাব্দীর সামাজিক ব্যবহারে নতুন অর্থ পেলে সেটিই তার প্রকৃত অর্থ। তাই ‘ইনকিলাব’ শব্দটি আর শুধু আরবি উৎসের শব্দ নয়; এটি উপমহাদেশীয় প্রতিরোধ, বিপ্লব ও জনআন্দোলনের ঐতিহাসিক আবেগ ধারণকারী চিহ্ন। দর্শনের ভাষায়, শব্দ একটি sign হলেও তার অর্থ সামাজিক চর্চায় গঠিত। ফলে যে সমাজে শব্দটি প্রতিরোধের স্মৃতি বহন করে, সেখানে সেটি স্থানীয় ও বৈধ। দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ভাষা ও ক্ষমতার সম্পর্ক। যে গোষ্ঠী ভাষার ‘শুদ্ধতা’ নির্ধারণ করতে চায়, সে আসলে সাংস্কৃতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ভাষাকে এক উৎসে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা মানে একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রকৃতি বহুস্বরের ওপর দাঁড়িয়ে; এখানে সংস্কৃতধর্মী ও ফারসি-আরবি উভয় স্তর ঐতিহাসিকভাবে সমানভাবে উপস্থিত। তাই একটিকে অগ্রাহ্য করা মানে ভাষার ভেতর ক্ষমতার অসমতা তৈরি করা। ভাষাতত্ত্বে এটি লিঙ্গুইস্টিক হেজেমনি নামে পরিচিত—অর্থাৎ এক ভাষিক স্তরের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা।

আখেরে বলা যায়, ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের ইতিহাস, কান্না, সংগ্রাম ও স্বপ্নের ধারক। যে শব্দগুলোকে কেউ ‘বহিরাগত’ বলে দূরে সরাতে চায়, সেগুলোই হয়তো কোনো জনতার আর্তি, কোনো মায়ের হাহাকার, কোনো বিপ্লবীর শপথ, কোনো শহীদের শেষ উচ্চারণ হয়ে আমাদের স্মৃতিতে বেঁচে আছে। ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’, ‘ইনসাফ’, ‘মজলুম’, ‘জালিম’—এই শব্দগুলো শুধু ভাষাগত চিহ্ন নয়; এগুলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষের কণ্ঠস্বর ও ইতিহাসের অগ্নিস্মৃতি। ভাষা যখন রক্তের ইতিহাস বহন করে, তখন তাকে বিশুদ্ধতার খাঁচায় বন্দি করা যায় না। বাংলা ভাষা নদীর মতো—অসংখ্য স্রোত এসে তাকে পূর্ণ করেছে; কোনো স্রোতকে অস্বীকার করলে নদীরই সত্তা ক্ষীণ হয়ে যায়। তাই শব্দের উৎস নিয়ে বিদ্বেষ আসলে স্মৃতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, ইতিহাসের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, মানুষের অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ। বাংলা ভাষার গভীর সৌন্দর্য তার এই বহুস্বরিক হৃদয়ে যেখানে ন্যায় ও ইনসাফ পাশাপাশি বাঁচে, মুক্তি ও আজাদি একই আকাঙ্ক্ষায় জ্বলে, অত্যাচারী ও জালিম একই প্রতিবাদের মুখে ধরা পড়ে। এই সহাবস্থানই তাকে মানবিক করেছে, জীবন্ত করেছে। ভাষাকে ভালোবাসা মানে তার সব উত্তরাধিকারকে ভালোবাসা—তার সমস্ত ক্ষত, সমস্ত গৌরব, সমস্ত স্মৃতিসহ। অতএব কোনো শব্দকে বর্জন নয়, গ্রহণের আলিঙ্গনে ধারণ করাই ভাষার প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা। কারণ ভাষা শেষ পর্যন্ত মানুষেরই—আর মানুষের ইতিহাস কখনো লিনিয়ার নয়, সর্বদাই হাইব্রিড, পলিফোনিক এবং গভীরভাবে মানবিক।

লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি

sahidkamrul25@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন