জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি

অর্থনীতি কতটা সইতে পারবে

অর্থনীতি কতটা সইতে পারবে

সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি বাংলাদেশ অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ নিয়ে তিন দফায় প্রকারভেদে জ্বালানি তেলের দাম শতকরা ৩৫ থেকে ৩৮ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হলো। কেন জানি সন্দেহ হচ্ছে, উপযুক্ত পর্যালোচনা না করেই দাম বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর চাপানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে প্রায় সব পন্যের দাম বৃদ্ধি অবধারিত। সার্বিকভাবে দ্রব্যের দাম বৃদ্ধিকে অর্থনীতির ভাষায় মূল্যস্ফীতি বলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী আগস্টে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ, যদিও যৌক্তিক কারণেই বিবিএসের তথ্য মানুষ প্রায়ই অবিশ্বাস করে। এমনকি যদি মূল্যস্ফীতি সম্পর্কিত উপরোক্ত তথ্য সঠিকও বিবেচনা করা হয়, তবু বলতে হবে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান। সাধারণত শতকরা ৫ ভাগের আশপাশের মূল্যস্ফীতিকে সহনশীল হিসেবে দেখা হয়। এমতাবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে।

১৯৭৪ সালের ৮ অক্টোবর মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া এক ঐতিহাসিক ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮তম রাষ্ট্রপতি জেরাল্ড ফোর্ড মূল্যস্ফীতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জনগণের ‘এক নম্বর শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করেন, কারণ তার মতে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। ফোর্ডের একই সুরে সুর মিলিয়ে ৪০তম রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রিগ্যান মূল্যস্ফীতিকে সব মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শত্রু আখ্যা দেন। কেইনসীয় অর্থনীতির জনক জন মেনার্ড কেইনসের মতে, অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি সরকারকে তার নাগরিকদের সম্পদ ইচ্ছামতো বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ করে দেয়, যা সমাজে অশান্তি এবং রাজনৈতিক বিপ্লবকে উসকে দেয়। সত্যিকার অর্থে মূ্ল্যস্ফীতির মন্দ দিকগুলো বুঝতে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক নেতা কিংবা অর্থনীতিবিদের ভবিষ্যদ্বাণী শোনার প্রয়োজন হয় না। বাজার-ঘাটে গিয়ে সওদা কেনার চেষ্টা করলেই যথেষ্ট। বড় থলি নিয়ে বাজারে ‍গিয়ে অর্ধেক খালি রেখে বাড়ি ফিরে পরিবারের সদস্যদের কাছে কৈফিয়ত দিতে দিতে মূল্যস্ফীতির খবর পরিষ্কার হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

মূল্যস্ফীতি বা ‘ইনফ্লেশন’-এর সঙ্গে স্থবিরতা বা ‘স্ট্যাগনেশন’ যুক্ত করে অর্থনীতি শাস্ত্রে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ নামের একটি পৃথক শব্দ প্রচলিত আছে। বাংলাদেশ অর্থনীতি বর্তমানে গভীর মাত্রার না হলেও মধ্যম মাত্রার স্ট্যাগফ্লেশনে আক্রান্ত। দীর্ঘ সময় চলমান মূল্যস্ফীতির সঙ্গে নিম্ন প্রবৃদ্ধির হার এটিই প্রমাণ করে। ভয়ের বিষয় হলো, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি যদি মূল্যস্ফীতিকে আরো বাড়ায়—যেই সম্ভাবনা খুব বেশি এবং বিনিয়োগের মন্দাবস্থার কারণে যদি নিম্ন প্রবৃদ্ধিহার অব্যাহত থাকে, তবে স্ট্যাগফ্লেশনের ধরন হবে তীব্র এবং পরিণাম হবে সর্বনিকৃষ্ট। কারণ, এমন পরিস্থিতিতে একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায় আর অন্যদিকে আয় হ্রাস পায়। নীতিনির্ধারকরা দিশাহারা হয়ে পড়েন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি হ্রাস করতে সুদহার বাড়াতে চাইলে বিনিয়োগ কমার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি আরো কমে। আবার সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চেষ্টা করলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। বাংলাদেশ অর্থনীতি এমন একটি ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সরকার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান ঠেকানোর যুক্তি দেখিয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানে হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালিতে সহিংসতা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ। জ্বালানি আমদানিতে বিপিসির ব্যয় সন্দেহাতীতভাবে আগের তুলনায় বেড়েছে। সরকার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান ঠেকাতে পারবে বলে এমন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বিপিসির কাঠামোগত ত্রুটিগুলো সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। বিপিসি যখন তেল বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুনাফা অর্জন করে, তখন তো তেলের দাম কমানো হয়নি। বিপিসি প্রকাশিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে ওই সংস্থা তেল বিক্রি করে ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। সুতরাং বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে তেলের দাম এত বেশি বৃদ্ধির মাধ্যমে লোকসান কমানোর যুক্তি ভোক্তা কিংবা উৎপাদক কাউকে সন্তুষ্ট করার মতো নয়। বরং বিপিসির দুর্নীতি এবং অপচয় রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে বিপিসি নিয়মিতভাবেই সংবাদ শিরোনাম হয়ে থাকে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়কারী, কম অর্জনকারী এবং জবাবদিহিহীন বিপিসি অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর তুলনায় একধাপ এগিয়ে বলে অনেকেই মনে করেন। চুরি এবং অনিয়ম আড়াল করতে বিপিসি কখনোই বাহ্যিক নিরীক্ষার ব্যবস্থা নেয় না। ২০২২ সালের আগস্টে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংসদীয় সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রধান বিপিসির আর্থিক অনিয়মের পরিধি দেখে ‘বিস্ময়’ প্রকাশ করেছেন। প্রতিবেদনে কমিটির অনুসন্ধান বা প্রাপ্ত তথ্যাদি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আগের ১০ বছর বিপিসির হিসাবের কোনো বহিঃনিরীক্ষা (এক্সটার্নাল অডিট) করা হয়নি। ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে এটি শুধু অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা (ইন্টারনাল অডিট) পরিচালনা করেছে। তাছাড়া, বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) লক্ষ করেন, আগের দুই অর্থবছরে বিপিসিতে ৯,২৯৫.৪ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। বিপিসির নিজস্ব হিসাব বিবরণী (ব্যালান্স শিট) অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে দেওয়া ঋণের পরিমাণে ২,৫৯৭ কোটি টাকার অসংগতি রয়েছে। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিনটি ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানির কাছ থেকে ৫,৯৫৭ কোটি টাকা বকেয়া আদায়ে ব্যর্থ হওয়ায় বিপিসির সুদ বাবদ ৭০৮ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। ২০১২-১৩ সাল পর্যন্ত টানা আট বছর তারা কোনো হিসাব সমন্বয়ও (রিকনসিলিয়েশন) করেনি। সিএজির নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিবেদন অনুযায়ী অন্যান্য অনিয়মের মধ্যে আছে, বিপিসি অকার্যকর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে ফার্নেস অয়েল বিক্রি করা, ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ আমানত থাকা সত্ত্বেও সরকারের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ভ্যাট হিসেবে সংগৃহীত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজেদের কাছে রেখে দেওয়া, বেশি দামে পণ্য ও সেবা ক্রয়ের জন্য নিয়মের বাইরে ব্যয় করা, অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা লঙ্ঘন করা, গ্যাস বিক্রয় বিধিমালা ২০০৪ ও ২০১৪, বাংলাদেশ গ্যাস আইন ২০১০, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, সরকারি ক্রয় আইন ২০০৬ এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা ২০০৮-এর বিধান উপেক্ষা করা।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের অদক্ষতার আরেকটি উদাহরণ উল্লেখ করা হলো। দেশের এলপিজি (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) বাজারের মাত্র ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ সরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে, আর বাকি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে বেসরকারি খাত। বেসরকারি অপারেটরদের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এবং সংকটের সময়ে সরকারি হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত জানুয়ারিতে প্রথমবারের মতো সরাসরি এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেয়। তবে সাত মাস চেষ্টার পরও সংস্থাটি এক টন এলপিজিও আমদানি করতে পারেনি। সাত মাসে বিপিসি পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করেছে। তবে দরপত্রের জবাবে তারা কোনো গ্রহণযোগ্য সরবরাহকারী খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়। এরপর তারা নিয়মিত দরপ্রক্রিয়ার বাইরে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড) পাঁচ হাজার টন এলপিজি কেনার উদ্যোগ নেয়। বলা বাহুল্য, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে অনিয়ম-দুর্নীতির যথেষ্ট সুযোগ থাকে।

২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণে পরিদৃষ্ট হয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং পেট্রোবাংলার প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা একাধিক দুর্বল ও অস্তিত্ব-সংকটে থাকা বেসরকারি ব্যাংকে আটকে পড়েছে। বিপিসির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সংরক্ষিত আয়ের পরিমাণ ছিল ৩১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ১৩২ কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদি আমানত এবং ২৫ হাজার ২০৫ কোটি টাকা চলতি হিসাবে জমা আছে। বিপিসির ২ হাজার ১৯০ কোটি টাকা ১১টি বেসরকারি ব্যাংকে জমা আছে, যেগুলোর বেশিরভাগই দুর্বল কিংবা বিলুপ্তির পথে। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৭০১ কোটি, মেঘনা ব্যাংকে ২৮৫ কোটি, এসবিএসি ব্যাংকে ২১৯ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকে ২০৬ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ১৯৬ কোটি এবং এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে ১২৭ কোটি টাকা। ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকে অর্থ লগ্নি করার কারণে পতিত ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর কমিশন বাণিজ্য কার্যকর ছিল। আওয়ামী সরকার চোর এবং দুর্নীতিবাজদের সুযোগ করে দিয়ে লুণ্ঠিত অর্থ নিজেরা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়ে পালিয়েছে। এসব ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ কবে নাগাদ ফেরত পাওয়া যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

বিপিসির অদক্ষতা হ্রাস এবং অব্যবস্থাপনা রোধ করার পরিবর্তে ওই সংস্থাকে রেয়াত দেওয়ার কৌশল হিসেবেই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সাম্প্রতিক পদক্ষেপ। কিন্তু এর ফলে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব জন-অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। সুতরাং কর্তৃপক্ষের উচিত জ্বালানি তেলের দাম পুনঃসমন্বয় করে তুলনামূলক জনবান্ধব বিকল্পগুলো গ্রহণ করা।

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন