কিছু মানুষকে সবসময় বোকা বানিয়ে রাখা যায়; কিছু মানুষকে সাময়িকভাবে বোকা বানিয়ে রাখা যায়। ছলছাতুরীর আশ্রয়ে লোভনীয় কর্মের মাধ্যমে বা স্যাবোটাজ সৃষ্টি করে সামনে উপস্থিত সমাবেশকে হয়তো কিছু সময় বোকা বানিয়ে রাখা যায়। কিন্তু সব মানুষকে সবসময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখা যায় না। আমাদের জেন-জি প্রজন্মকেও বেশিদিন বোকার স্বর্গে আটকিয়ে রাখা যায়নি। কোনো কিছুই তাদের পথে বাদ সাধতে পারেনি।
ঐতিহাসিক নির্মোহ সৃষ্টিকারী ও সাড়া-জাগানিয়া ৩৬ দিনের আন্দোলনে এদেশের দামাল-কামাল তরুণরা আপামর জনতার সমর্থন লাভে বেশ সফল হয়। জগদ্দল পাথরের মতো দীর্ঘকাল ক্ষমতার পিঞ্জরে আস্তানা গেড়ে বসা দানবীয় শক্তিকে ক্ষমতা থেকে সরানো যখন অসম্ভব (!) মনে করা হতো, তখনই ভয়াল ঘূর্ণিঝড় রূপে জুলাই হাজির হয়। নিপীড়িত, নিগৃহীত, নির্যাতিত ও শান্তিপ্রিয় জনতা দ্ব্যর্থহীনচিত্তে এতে শক্তি সঞ্চার করে। জনপদের অধিকাংশ মানুষ যেমন এতে কমবেশি আক্রান্ত হয়, তেমনি এর মসনদে কাঁপন ধরাতেও ফ্যাসিজমের ভাইরাস বহনকারী ছাড়া জাত-শ্রেণি নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এ কারণেই জুলাই এত তাৎপর্যবহ। এর সর্বজনীন রূপ সহজেই অনুমেয়, ব্যাপক আবেদনময়ী। তাই জুলাই শুধু একটি পঞ্জিকা মাস নয়, অপশক্তির কপালে কলঙ্ক তিলক।
সম্প্রতি আমার দেশ পত্রিকায় প্রখ্যাত কলামিস্ট গোলাম সোহরাওয়ার্দি স্যারের জুলাই-বিষয়ক একটি উপসম্পাদকীয় প্রকাশ পেয়েছে। শিরোনাম ছিল ‘জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো’। এর শেষ বাক্যটির সূত্রে বলা যায়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক যে রাষ্ট্র অর্জিত হয়, চব্বিশের জুলাইয়ে তার আরোগ্য লাভের সিঁড়ি নির্মিত হয়েছে। এই আরোগ্য হলো রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মহামারি আকারে বিস্তৃত ফ্যাসিজম তথা ঔপনিবেশিক ও আধিপত্যবাদী কাঠামো থেকে নিষ্কৃতি। প্রকৃতই জুলাই বিপ্লবের ফলে শুরু থেকেই এতদঞ্চলে বিরাজিত রুগ্ণদশা ও ভগ্নাবস্থা থেকে মুক্তির দিশা মেলে।
সামগ্রিকভাবে জুলাই বিপ্লবের অভাবনীয় সাফল্য অনেক। জনরোষে টিকতে না পেরে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে খুনি হাসিনা পালিয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য হন। অতঃপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ফ্যাসিস্ট সরকার কর্তৃক রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে চরমভাবে নিগৃহীত দেশের একাধিকবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী কিংবদন্তি রাজনীতিক বেগম খালেদা জিয়ার তাৎক্ষণিক মুক্তি ঘটে। অন্যায় কারাভোগ ও পুনর্বাসন থেকে অসংখ্য মজলুম ব্যক্তিত্ব মুক্ত জীবনে ফিরে আসেন। আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং গণহত্যাকারী হিসেবে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ রাঘব বোয়ালদের দোষী সাব্যস্ত করে রায় ঘোষণা করা হয়। বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন সুসম্পন্ন করে দেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটে।
এর চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে, তথাকথিত চেতনাবাজির বিরুদ্ধে গিয়ে, ট্যাগিংয়ের রাজনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রক্তাক্ত জুলাইয়ের আয়নায় একঝাঁক তরুণ বিপ্লবী চরিত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এটি নিঃসন্দেহে খুবই ইতিবাচক অর্জন, যা রাষ্ট্রের উগ্র কর্তৃত্ববাদী ধারণাকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।
স্বৈরাচারের নিয়ামক শক্তি কথিত গণমাধ্যমগুলোর ফ্যাসিবাদী চরিত্রে তেমন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না এলেও সময়ের নির্ভীকতায় প্রতিশ্রুতিশীল আমার দেশ পত্রিকার পুনঃপ্রকাশে মিডিয়া পাড়ার অনেকে চাপে রয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
রাজনীতির বাইরে সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতেও জুলাই আন্দোলনের প্রণিধানযোগ্য প্রভাব রয়েছে। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ রচনায় এবং গ্রাফিতি নির্মাণ, ডকুমেন্টারি প্রকাশ ও আবৃত্তি উৎসব প্রভৃতি আয়োজনে জুলাইয়ের ত্যাগ ও অর্জনকে ধারণ করার প্রবণতা নবীন-প্রবীণদের নিত্যনতুনভাবে আকৃষ্ট করছে। ডক্টর মাহমুদুর রহমান স্যার যথার্থই বলেছেন, ‘অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে জুলাই ঘটনাপ্রবাহ এদেশের সাহিত্যকে প্রস্ফুটিত করবে স্বতঃস্ফূর্ত ধারায়।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

