আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাংলাদেশের ইতিহাসে কেন আলাদা এই নির্বাচন

আমার দেশ অনলাইন

বাংলাদেশের ইতিহাসে কেন আলাদা এই নির্বাচন

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের দিনেও প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সংবাদ সম্মেলন করে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ জানিয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবারের সংসদ নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত, এমন কথা বলছে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ।

বিজ্ঞাপন

কেমন হবে ভোট- এই প্রশ্নও রয়েছে আলোচনার কেন্দ্রে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন। সেখানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতন ও এরপর রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের বিষয়টি রয়েছে।

একইসঙ্গে দেড় দশকে পর পর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এবার মানুষের ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মোটাদাগে এই দুটি কারণে এই নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচন করেছে একতরফাভাবে। এখন বিএনপি, জামায়াতসহ যে দলগুলো নির্বাচনে প্রধান অংশগ্রহণকারী, তাদের ওই নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা হয়েছিল।

আর এর মাঝে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতসহ সব দলই অংশ নিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সেই ভোট পরিচিতি পায় ‘রাতের ভোট’ হিসেবে।

এসব নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। নির্বাচনী ব্যবস্থাই ভেঙে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে।

এমন প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন ভোটারদের কাছে গুরুত্ব বহন করছে বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন। তবে তারা মনে করেন, নিরাপত্তার প্রশ্নে শঙ্কাও কাজ করছে।

মেরুকরণ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি অন্যতম প্রধান দলের অবস্থানে রয়েছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী পাল্টেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘পার্শ্ব চরিত্রে’ ছিল জামায়াত। এখন দলটি সামনে চলে এসেছে।

নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, রাজনীতিতে ডানপন্থি দলগুলোর প্রভাব বেড়েছে। এমন পটভূমিতেই এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন আলোচনায় আসছে।

নির্বাচনে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে ১১ দলীয় জোট করেছে জামায়াত। এই জোটে ইসলামী দলের সংখ্যা বেশি।

গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্বের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিও জামায়াতের জোটে রয়েছে।

বিএনপি আসন ভাগাভাগি করেছে তাদের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও ইসলামপন্থি কয়েকটি দলের সঙ্গে।

আগের দিনেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

এতদিন সাধারণ ভোটার, এমনকি রাজনীতিকদেরও অনেকের মাঝে শঙ্কা ছিল, নির্বাচন হবে কি না।

শেষপর্যন্ত যখন নির্বাচন হচ্ছে এবং পুরো দেশ ভোটের অপেক্ষায়, এমন প্রেক্ষাপটেও বিএনপি ও জামায়াত সংবাদ সম্মেলন করে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ জানিয়েছে।

জামায়াতের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার আমির ধরা পড়েছেন ৭৪ লাখ টাকা নিয়ে। তিনি ঢাকা থেকে বিমানে নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নেমে এই বড় অংকের অর্থসহ ধরা পড়েন।

এটি একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এই অর্থের বিষয়টি অস্বীকার না করলেও জামায়াত সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, ভোটের আগের দিনে তাদের বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমির শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘জামায়াতের জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থনে ভীত হয়ে একটি গোষ্ঠী ভোটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য এ ধরনের অপচেষ্টায় লিপ্ত।’

জামায়াত জোটের অন্যতম শরিক এনসিপিও ভোটের কয়েক ঘণ্টা আগে অর্থ্যাৎ বুধবার মধ্যরাতের পর সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেছে।

এদিকে, বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন এক সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘বিএনপি'র অনিবার্য বিজয়ের বিপরীতে একটি গোষ্ঠী নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।’

জামায়াতের ঠাকুরগাঁও জেলা আমিরের কাছে বড় অংকের টাকা উদ্ধারের ঘটনাও উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ঘটনা ছাড়াও শরিয়তপুর ও কুমিল্লায় জামায়াত নেতার কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের অভিযোগ উঠেছে।

গত মধ্যরাতে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খানও এক সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন।

অন্যদিকে, লক্ষ্মীপুরে যৌথবাহিনীর তল্লাশীচৌকিতে একটি গাড়ি থেকে ১৫ লাখ টাকা উদ্ধার ও তিনজনকে আটকের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় আটকরা বিএনপি প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সমর্থক বলে স্থানীয় পুলিশ জানায়।

এ্যানি দাবি করেন, ঘটনাটি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা হচ্ছে।

দুই দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে টাকা উদ্ধারের ঘটনাগুলোই বড় বিষয় হয়েছে।

বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, দুই পক্ষই একে অপরকে সন্দেহ করছে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার প্রশ্নে।

কেমন হবে ভোট

সারাদেশে সেনাপুলিশসহ সব বাহিনী বেশ সক্রিয় রয়েছে। ভোটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেছে নির্বাচন কমিশন।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ একটা বড় ইস্যু হয়ে রয়েছে।

এমন পটভূমিতে ভোটের নিরাপত্তার প্রশ্নে ভোটারদের পাশাপাশি দলগুলোর মধ্যেও শঙ্কা কাজ করছে।

সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব বেশি বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

এ প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরকে সন্দেহ করছে বলে মনে হয়েছে।

তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবিসি বাংলাকে বলেন,শেষপর্যন্ত ভোট শান্তপূর্ণ হবে বলে তারা আশা করছেন।

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানও বিবিসির কাছে একইরকম আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

দল দুটির শীর্ষ নেতারা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করছেন।

কিন্তু ভোটের কয়েক ঘণ্টা আগে দুই দলই নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে এবং তাতে তাদের পরস্পরের প্রতি সন্দেহ-অবিশ্বাসের বিষয়ই প্রকাশ পেয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো সতর্ক থাকবে এবং নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে বলে তার প্রত্যাশা।

নির্বাচনের পরে চ্যালেঞ্জ

বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতারা বলছেন, ভোটের পরই বড় চ্যালেঞ্জ। যে দল ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্য আইনশৃঙ্খলা এবং অর্থনীতি প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে।

বিশ্লেষকেরাও একইভাবে দেখেন পরিস্থিতিটাকে।

তারা বলছেন,আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত আঠারো মাসে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আর অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ স্থবির হয়েছে।

যদিও বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে সামাল দেওয়ার কথা বলছে সরকার।

কিন্তু বিশ্লেষকেরা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা এবং দেশের অর্থনীতির স্থবিরতাই নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারকে ভোগাতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন