আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

স্থগিত হচ্ছে নিবন্ধন

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে স্বস্তি, উল্লাস

এমরান এস হোসাইন

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে স্বস্তি, উল্লাস

রাজনীতির মাঠে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর নির্বাচনি রাজনীতি থেকেও ছিটকে পড়তে যাচ্ছে গণঅভ্যুত্থানে পতিত দল আওয়ামী লীগ। অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দলটির নিবন্ধনের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধের গেজেট প্রকাশসাপেক্ষে নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথা জানা গেছে। এক্ষেত্রে বিচারিক কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত রাখা হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরই মূলত দলটির আর রাজনৈতিক কোনো কার্যক্রম নেই। প্রথম কয়েক সারির নেতাদের অধিকাংশই দেশের বাইরে পলাতক। দেশের ভেতরেও অনেকে গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছেন। এ অবস্থায় দলটির সব কার্যালয় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। আইনে কোনো নিবন্ধিত দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সক্রিয় না থাকলেও নিবন্ধন বাতিল করার কথা বলা আছে। তা ছাড়া সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ দলের নিবন্ধন বাতিলের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে আইনে।

এদিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের সরকারি সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। উচ্ছ্বাস ও উল্লাস প্রকাশ করেছেন দেড় দশকে নিপীড়নের শিকার রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। দেরিতে হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ব্যক্তি ও মহল। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির মহাসচিব বিবৃতি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন।

সরকারের সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ায় শনিবার রাত থেকেই সারা দেশে আনন্দ মিছিল, মিষ্টি বিতরণ, শোকরানা মোনাজাতসহ নানাভাবে বিজয় উল্লাস করেছে ছাত্রসমাজসহ জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের সব রাজনৈতিক শক্তি। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দলটিকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধের দাবি তুলেছে। আজ দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হলে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা রাজধানীতে আনন্দ মিছিল করার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ গত সাড়ে ১৫ বছর হত্যা, গুম, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করে। এজন্য দলটিকে আজ অনিবার্য পরিণামের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে নির্বাহী আদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে শাস্তির মুখোমুখি করার আহবান জানিয়েছেন তারা। সেই সঙ্গে দলটির শীর্ষ নেতাসহ ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিচার শেষ করে তা বাস্তবায়ন করার কথাও বলেছেন।

গত শনিবার রাতে উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে গণহত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের বিধান যুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইব্যুনালের সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ওই রাতেই রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন তা অধ্যাদেশ আকারে জারি করেন।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিষয়ে সব আনুষ্ঠানিকতা গুছিয়ে এনেছে অন্তর্বর্তী সরকার। গতকাল রোববার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী অনুমোদন দেয় উপদেষ্টা পরিষদ। গতকালই সেটা অধ্যাদেশ আকারে জারি হয়। এক্ষেত্রে আজই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে।

শনিবার রাতে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, পরবর্তী কার্যদিবসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের আদেশ জারি করা হবে। এ হিসাবে আজ সোমবারই সেটা সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

গত ৬ মে গভীর রাতে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ‘গোপনে’ দেশত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিটি জোরালো হয়। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আসেন। তারা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে জামায়াত ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ রাজপথে নেমে পড়েন। শুক্রবার তারা শাহবাগে ব্লকেড কর্মসূচি পালন করেন। পরে শুক্রবার রাতেই তারা এক ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। ছাত্রদের এ আন্দোলনের মুখে প্রধান উপদেষ্টা উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকেন। ওই বৈঠক থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত আসে।

সরকারের ওই সিদ্ধান্ত জানার সঙ্গে সঙ্গেই আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ফিরে আসে স্বস্তি। ওই রাতেই শাহবাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ শুরু হয়। ধর্মীয় দলগুলো শোকরানা মোনাজাত করে। রাজনৈতিক দলগুলোও সরকারের এ সিদ্ধান্তে দলীয় অবস্থান তুলে ধরে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ওই রাতেই দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আদালতের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করা হয়। আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতসহ অন্যান্য দলও সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।

গতকাল এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিলম্বে হলেও অন্তর্বর্তী সরকার ফ্যাসিবাদী সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দ্রুত করার এবং বিচারকার্য নির্বিঘ্ন করার স্বার্থে ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ ও তার সঙ্গে যুক্ত সব সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রাসঙ্গিক আইন সংশোধন করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুম, খুন, নিপীড়ন ও জনগণের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন অপশাসন চালনাকারী, ফ্যাসিবাদী দলের বিচার করার সিদ্ধান্তকে আমরা সঠিক বলে মনে করি। এতে আমরা আনন্দিত।

বিএনপি আগেই এ দাবি করেছিল-এমন দাবি করে বিবৃতিতে ফখরুল বলেন, আমাদের দাবি মেনে আগেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে চাপের মুখে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো বিব্রতকর ও অনভিপ্রেত অবস্থায় সরকারকে পড়তে হতো না।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধে সরকারের সিদ্ধান্তকে বিএনপি স্বাগত জানিয়েছে উল্লেখ করে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেন, আওয়ামী লীগ ইজ নো মোর পলিটিক্যাল পার্টি। একটা মাফিয়া পার্টি, এটা একটা ফ্যাসিবাদী দল। সুতরাং রাজনৈতিক তকমা দিতে চাই না। আওয়ামী লীগের ডিএনএতেই গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের চর্চা নেই।

যে আইনের অধীনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী আনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণায় আমরা স্বাগত জানিয়েছি।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে শাহবাগের আন্দোলনে না যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আমরা শাহবাগে কেন যাব? আমরা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিষয়ে লিখিতভাবে কয়েক মাস আগে প্রধান উপদেষ্টাকে দিয়েছি, মৌখিকভাবে বলেছি, বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বক্তব্য রেখেছি। আমাদেরকে শাহবাগে গিয়ে এ কথা বলতে হবে কেন?

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সরকারি ঘোষণার পর মগবাজারে পথসভা করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সেখান উৎফুল্ল জনতার উদ্দেশ্যে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে জনগণের দাবির আংশিক পূরণ হয়েছে। আশা করি বর্তমান বিপ্লবী সরকার জনগণের আবেগ-অনুভূতি ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে যৌক্তিক সব দাবি পূরণ করবে।

তিনি বলেন, আমরা জুলাইকে হারিয়ে যেতে দেব না বরং জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেই সামনের দিকে এগিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ। তিনি ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবকে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজে লাগাতে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম রোববার রাতে ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, বিপ্লবী ছাত্র-জনতাকে অভিনন্দন। সরকারকেও সাধুবাদ। দ্রুত সময়ের মধ্যে সব সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন চাই। তবে জুলাই ঘোষণাপত্র ও বিচার প্রশ্নে আমাদের সংগ্রাম জারি রাখতে হবে। সারা দেশের ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নিবন্ধন দ্রুত সময়ের মধ্যে বাতিল করতে হবে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বিবৃতিতে বলেন, আওয়ামী লীগ যে মাত্রায় অপরাধ করেছে তাতে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের প্রথম কার্যদিবসেই আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত ছিল। সরকার তা করেনি। তবে দেরিতে হলেও এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি আমরা চাই অতি দ্রুততার সঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়ায় দলটিকে নিষিদ্ধসহ এর নেতাদের বিচার শেষ করে রায় বাস্তবায়ন করা হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক ও মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্তকে সময়োচিত, বাস্তবধর্মী এবং দেশ ও জাতির স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ উল্লেখ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা বলেন, সরকারের এই সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার অতীতের অবিচার ও নিপীড়নের বিচারিক পথ সুগম করল।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় ও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতা, ওলামায়ে কেরাম ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের প্রথমিক বিজয়। তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন যে কোনো দাবি আদায়ের নিয়ামক শক্তি। দেশে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায়, শান্তি-নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সুদৃঢ় ঐক্য মজবুত রাখতে হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। গতকাল এক ‘অভিনন্দন অভিযাত্রা’ বের করে দলটি। অভিযাত্রায় এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের মাধ্যমে গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগের বিচার ও দলীয় কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় সরকারকে অভিনন্দন জানাই। জাতিসংঘ ঘোষিত গণহত্যাকারী দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নির্বাহী আদেশে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না দিয়ে আমরা চাচ্ছিলাম বিচারিক প্রক্রিয়ায় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। আওয়ামী লীগ যে সীমাহীন অন্যায়, জুলুম ও লুটপাট করেছে, তাতে এ দলটির বিরুদ্ধে জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে ফুঁসে উঠেছে। অতএব, এই পদক্ষেপ যুক্তিযুক্ত এবং এতে নাগরিকের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে বলে আমরা মনে করি।

গতকাল ইসলামী ঐক্যজোট, নেজামে ইসলাম পার্টি ও ইসলামী ছাত্রসমাজের যৌথ শুকরানা সভায় বলা হয়, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের মধ্য দিয়ে আজ জাতি কলঙ্কমুক্ত হলো। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে ফ্যাসিবাদমুক্ত হলো দেশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছে দলগুলো। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে কিন্তু নিবন্ধন অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। তারা যেন কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক বিশ্ব এই নির্লজ্জ, খুনি, গণতন্ত্রবিরোধী ও দুর্নীতিগ্রস্ত দলের পক্ষে কখনো কথা বলবে না বলে মনে করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। উপদেষ্টা পরিষদে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে গতকাল এক পোস্টে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার জন্য বিশ্ব বিলাপ করবে। জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জুলাই আন্দোলনের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বাদী ও সাক্ষীদের সুরক্ষার জন্য এই নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজনীয় ছিল।’

মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজ করার জন্য পশ্চিমা গণতন্ত্রেও অনেক দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রেস সচিব আরো লেখেন, ‘গণতান্ত্রিক বিশ্বে এমন কেউ নেই যে, এমন নির্লজ্জ খুনি, গণতন্ত্রবিরোধী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত দলের পক্ষে কথা বলবে। আওয়ামী লীগের কার্যকলাপের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আমরা কোনো প্রতিকূল আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া আশা করি না।’

এক প্রতিক্রিয়ায় ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় নিয়ে ফেলেছে। নির্বাহী আদেশ ছাড়াও এ সময়ের মধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া বা রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মাধ্যমে সুরাহা করতে পারত, কিন্তু আমরা সেই উদ্যোগ দেখিনি। যার কারণে নতুন করে ছাত্রদের আবার মাঠে নামতে হয়েছে। তবে নির্বাহী আদেশের এই সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত মনে করছি না। আমরা চাই বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে এর চূড়ান্ত পরিণতি যেন হয়। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিচারের প্রক্রিয়া যেন দ্রুত শেষ হয়-সেই প্রত্যাশা করি।

সরকারের এই সিদ্ধান্তটি অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন প্রফেসর মাহাবুব উল্লাহ। আমার দেশকে প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া মানেই কিন্তু সব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। দুটো কারণে আওয়ামী লীগ বিপজ্জনক। একটি হচ্ছে দলটির (আ.লীগ) বয়ানের জন্য। অর্থাৎ, ১৯৭০-৭১ থেকে আজ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক ন্যারেটিভ। এই ‘বয়ান’ দিয়ে এদেশের শিশু-কিশোর, বালক, যুবক-বয়স্ক সবাইকে প্রভাবিত করেছে; মোহগ্রস্ত করেছে। এর থেকে মানুষকে উদ্ধার করতে হবে। আর এজন্য একটি যুক্তিপূর্ণ বিকল্প বয়ান সৃষ্টি করতে হবে।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে দলটির পেছনে ভারতের পৃষ্ঠপোষকতা বলে উল্লেখ করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যখন মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়েছিল; এরপর থেকে মুসলিম লীগ উঠে দাঁড়াতে পারেনি। না পারার কারণ হচ্ছে ওই দলটির পেছনে কোনো শক্তি ছিল না। এখন আওয়ামী লীগ আপাতত পলাতক, অন্ধকারে বসে নানা ধরনের কুচক্রান্ত করছে। তারা এগুলো করার এখনও সাহস পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহভাবে করবে; কারণ তার পেছনে ভারতের সহযোগিতা রয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের এই দলটি একমাত্র তাদের আস্থাশীল দল। দেশের অন্য কোনো দল যদি মনে করে থাকে ভারত তাদের আস্থায় নেবে, তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা ওই দলের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা খুবই কঠিন কাজ। এর একমাত্র উপায় হচ্ছে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে সর্বস্তরে দেশপ্রেমের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া।

নিবন্ধন বাতিলে ইসির ভাষ্য ও আইনি বিধান

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্তের গেজেটটি হলে আমরা আগামীকালই (আজ সোমবার) কমিশন বৈঠক করব। আমি একা তো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। এর জন্য আইন আছে সরকার কোনো দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করলে কী করতে হবে। গেজেটটি হোক, কমিশনের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দলটির নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আজ বৈঠকে বসবে বলেও তিনি জানান।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-১৯৭২ অনুযায়ী, কোনো দল নিজেদের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে চাইলে নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন পেতে হয়। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট দল অন্য দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করতে পারলেও নিজেদের পরিচয়ে ভোটে অংশ নিতে পারে না। নবম সংসদ নির্বাচনের আগে নিবন্ধন প্রথা চালু হয়, আর সংশ্লিষ্ট আইনে নিবন্ধন বাতিলের বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আরপিওর ৯০ জ(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কী কারণে কোনো দলের নিবন্ধন বাতিল করতে পারে ইসি :

(ক) দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কমিটি, সেটি যে নামেই অভিহিত হোক না কেন, সেই কমিটি যদি দলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে বা নিবন্ধন বাতিলের জন্য দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বা তাদের সমপর্যায়ের পদাধিকারী ব্যক্তি কর্তৃক দলীয় সিদ্ধান্তের কার্যবিবরণীসহ কমিশন বরাবর আবেদন করা হয়; বা

(খ) নিবন্ধিত কোনো রাজনৈতিক দল সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়; বা

(গ) এই আদেশ ও বিধিমালার অধীন কমিশনে প্রেরিতব্য কোনো তথ্য [একাধিক্রমে তিন বছর] প্রেরণ করতে যদি কোনো দল ব্যর্থ হয়; বা

(ঘ) কোনো রাজনৈতিক দল কর্তৃক [অনুচ্ছেদ ৯০খ-এর দফা (১)(খ)]-এর কোনো বিধান লঙ্ঘন করা হয়; বা

(ঙ) কোনো রাজনৈতিক দল পরপর দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে; তাহলে সংশ্লিষ্ট দলের নিবন্ধন বাতিল করতে পারে ইসি।

অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্ষেত্রে আরপিওর ৯০জ অনুচ্ছেদের (১)(খ) দফা অনুযায়ী সরকারের নিষেধাজ্ঞার আলোকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে পারে ইসি।

অন্যদিকে এই অনুচ্ছেদের (ঘ) দফা অনুযায়ীও [যা ৯০খ অনুচ্ছেদের (১)(খ) দফাতে বর্ণিত] দলটির নিবন্ধন বাতিল করা যাবে। কেননা, ওই দফায় (১)(ক) দফাও প্রতিপালন করতে বলা হয়েছে। আর ৯০খ অনুচ্ছেদের ১-এর (ক)-এর (ই) দফায় বলা হয়েছে, নিবন্ধনের জন্য সক্রিয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ অন্যান্য কার্যালয় থাকতে হবে।

এ ছাড়াও কমিশন থেকে চাহিদা মোতাবেক কোনো তথ্য পরপর তিন বছর কোনো দল না দিতে পারলে; ২০৩০ সালের মধ্যে দলের সব স্তরের ৩৩ শতাংশ নারী সদস্যপদ পূরণ করতে না পারলে; শিক্ষক, ছাত্র, আর্থিক, বাণিজ্যিক বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বা সংস্থার কর্মচারী বা শ্রমিকদের বা অন্য কোনো পেশার সদস্যদের সমন্বয়ে সহযোগী বা অঙ্গসংগঠন করলে প্রভৃতি কারণে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন বাতিল করতে পারে ইসি।

কমিশন সূত্র বলছে, সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষণার জন্য কোনো শুনানির প্রয়োজন নেই। তবে অন্য কোনো কারণে নিবন্ধন বাতিল করতে হলে সংশ্লিষ্ট দলকে শুনানির সুযোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে আইনে। এ ছাড়া নিবন্ধন বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট নামে অন্য কোনো দল আর পরবর্তী নিবন্ধন পাবে না এবং নিবন্ধন বাতিলের গেজেট প্রকাশ হলে ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা যাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন