সংস্কার লংমার্চে নয়, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আসতে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সংস্কার লংমার্চে নয়, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আসতে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সংস্কার লংমার্চ করে হবে না, এ জন্য বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, আলোচনা করার জন্য বিরোধী দলকে তো সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আসতে হবে। যেখানে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া হয়েছিল, সেসব যদি শিথিল করতে হয়, তবে সেই আলোচনায় আসতে হবে। সেটা তো লংমার্চে হবে না, এর জন্য আলাপ-আলোচনায় বসতে হবে।

বিজ্ঞাপন

শনিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ সিরিজ সেমিনারের ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ শীর্ষক পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

এ সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রণীত ‘জুলাই সনদ’-এর কোনো সরাসরি আইনি ভিত্তি নেই বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, এর রাজনৈতিক সমঝোতার গুরুত্ব যেকোনো আইনি ভিত্তির চেয়েও অনেক বেশি। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হলো, তার কি কোনো আইনি ভিত্তি আছে? নাই। কিন্তু এই রাজনৈতিক সমঝোতাটা আইনি ভিত্তির চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।

সনদটির আইনি স্বীকৃতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যখন প্রশ্ন উঠেছিল যে জনগণ এটি চায় কি না এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের শেষ দিকে এসে এর আইনি ভিত্তি দেওয়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছিল, তখন বিষয়টিকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, এই রাষ্ট্রে যেন কোনো দিন এ রকম আরেকটি জুলাই জাদুঘর তৈরি না হয়, সেই ব্যবস্থা আমরা করব। সেই গণতান্ত্রিক সংস্কার আমরা চাই, যার কিছুটা গুরুদায়িত্ব আমাদের ওপর আছে। আমরা এমন সাংবিধানিক সংশোধন করব, যাতে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স (ভারসাম্য) থাকে। গণতন্ত্রকে পাহারা দেওয়ার জন্য ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করার মতো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, এর বাইরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা, মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং তারুণ্যের চাহিদাকে আমাদের ধারণ করতে হবে। সেই জায়গায় আমরা সবার সহযোগিতা চাই। আমরা বিরোধী দলের সহযোগিতা বেশি করে চাই। ঐক্যবদ্ধভাবে, ঐকমত্যের ও সমঝোতার ভিত্তিতে যদি আমরা সাংবিধানিক সংশোধনী আনতে পারি, তবে তা এই জাতির জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর হবে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দেশের স্বার্থে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশায় ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো দিন ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র বা কোনো স্বৈরশাসকের উৎপত্তি না হয়, সে পথগুলো আমাদের বন্ধ করতে হবে। এটাই হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সফলতা। সেজন্য ঐক্যই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

সেমিনারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, উচ্চকক্ষ যদি করেন, তবে তা আনুপাতিক ভিত্তিতে করুন। আমার একটি অনুরোধ থাকবে—উচ্চ পরিষদে যারা থাকবেন, তাদের কোনো বেতন দেবেন না, গাড়ি-বাড়ি দেবেন না। তাহলে জেনুইন (প্রকৃত) লোকজন আসবে এবং দেশের জন্য কাজ করবে।

এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে সরকারকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেন ড. নজরুল। এর মধ্যে রয়েছে—সংসদীয় কমিটির প্রধান পদ বিরোধী দলকে দেওয়া এবং যেকোনো নথি বা ব্যক্তি তলবের আইনি ক্ষমতা প্রদান করা; উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের জন্য দ্রুত একটি নিরপেক্ষ আইন প্রণয়ন করা (প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করে) এবং নিম্ন আদালতের অভিজ্ঞ বিচারকদের জন্য ৫০ শতাংশ কোটা রাখা; ‘সানরাইজ ক্লজ’ বা ‘ম্যান্ডেটারি রিভিউ ক্লজ’ কৌশলের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ধাপে ধাপে সুপ্রিম কোর্টের কাছে হস্তান্তর করা। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই অনুরোধগুলো যদি না রাখেন, তবে এই দেশের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া (অপরচুনিটি লস্ট) হওয়ার শামিল হবে।

বাকশাল সম্পর্কে ড. আসিফ নজরুল বলেন, বাকশাল ও চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে মূলত এক দলের নয়, বরং এক ব্যক্তির শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল। এতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছাড়াই মেয়াদ নির্ধারণ, যখন ইচ্ছা সংসদ ভেঙে দেওয়া, সংসদ সদস্যদের জেলে পাঠানো কিংবা যখন ইচ্ছা বিচারকদের চাকরিচ্যুত করার মতো অবিশ্বাস্য ও সর্বময় ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যা ছিল প্রাচীনকালের রাজা-বাদশাহদের ক্ষমতার মতো। চতুর্থ সংশোধনী ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য সংশোধনী, যা মূলত সংবিধানের কবর রচনা করেছিল। উচ্চ আদালতের বড় বড় বিচারক বা সমালোচকরা পঞ্চম বা সপ্তম সংশোধনী নিয়ে কঠোর সমালোচনা করলেও, ১৯৭২ সালের সংবিধানের সর্বপেক্ষা ধ্বংসাত্মক এই চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে কথা বলেননি। বাকশাল ও চতুর্থ সংশোধনী কায়েম না হলে দেশে সামরিক শাসন বা পরবর্তী সাংবিধানিক বিপর্যয়গুলোর পথ তৈরি হতো না।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. আসিফ নজরুল। এ ছাড়া আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন