আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নির্বাচনের সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারও অগ্রাধিকার বিএনপির

বাছির জামাল

নির্বাচনের সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারও অগ্রাধিকার বিএনপির

নির্বাচনের পাশাপাশি রাষ্ট্র সংস্কারকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিএনপি। দলটির মতে, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। এজন্য আপাতত নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কার শেষ করে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিকে মনোসংযোগ করাই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব। বাকি সংস্কার কাজ পরবর্তী নির্বাচিত সংসদের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত।

গত ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর থেকেই দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার তাড়া দিয়ে আসছিলেন মির্জা ফখরুলসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

বিজ্ঞাপন

গত ১৩ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পরদিন সংবাদ সম্মেলনেও চলতি বছরের মাঝামাঝিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল। গত ২১ জানুয়ারি দুপুরে জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের ‘গ্রন্থ আড্ডা’ অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এখনই নির্বাচন করে ফেলতে হবে সেটা বিএনপি বলছে না, তবে ন্যূনতম যে সংস্কার, সেটা করে নিয়ে নির্বাচনটা করলে সমস্যাগুলোর অনেকটা সমাধান হবে।

তিনি বলেন, আমাকে অনেকে ভুল বোঝে যে, আপনি এত নির্বাচন নির্বাচন করেন কেন। বিশেষ করে ছাত্ররা তো বলেই। এখানে কারণ একটাইÑ আমরা বিশ্বাস করি, আমি জানি না এই বিষয় ভুল কি না, যে কোনো নির্বাচিত সরকার কিন্তু অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে ভালো। আমার অ্যাক্সেস থাকে, আমি যেতে পারি, কথা বলতে পারি। এখন আমার সেই জায়গাটা নেই।

ফখরুল আরও বলেন, তাড়াতাড়ি নির্বাচনের কথা এজন্য বলি যে, নির্বাচনটা হলে দেশের সমস্যাগুলো চলে যাবে। একটা নির্বাচিত সরকার পিপলস ম্যান্ডেট নিয়ে বসবে। এরা (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) তো এখন বসতে পারেনি, ওদের মধ্যে সেই কনফিডেন্স তো নেই। পিপলের ভাষাটা তো বুঝতে হবে। সেটা একটা নির্বাচিত সরকার সবচেয়ে ভালো বোঝে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

প্রসঙ্গত, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ২০১৭ সালের ১০ মে ঢাকার একটি হোটেলে রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে, তার একটি রূপরেখা ‘ভিশন ২০৩০’ তুলে ধরেন। তিনি ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে উক্ত রূপকল্পটির একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় বলেন, ৬ বছর আগে বেগম খালেদা জিয়া ভিশন টোয়েন্টি-থার্টির মাধ্যমে সংস্কারের কথা বলেছিলেন: দুইবারের অধিক কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবে না, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য ইত্যাদি। হাসিনা-পরবর্তী যে বাংলাদেশ হবে এটাকে মাথায় রেখে খালেদা জিয়া কথাগুলো বলেছেন। এই সংস্কারগুলো দরকার হবে আগামীর বাংলাদেশে। এখন অনেকে আমাদের সংস্কারের সবক দিচ্ছে।

বিএনপি প্রধানের উপস্থাপিত রূপকল্পকে ভিত্তি ধরে পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর দলটির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্র সংস্কারের ২৭ দফা উপস্থাপন করেন। এর পরের বছর ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে ওই ২৭ দফাকে ৩১ দফায় রূপান্তর করে রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করে বিএনপি।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আমার দেশকে বলেন, বিএনপিই তো প্রথমে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে। আমাদের যে ৩১ দফা ঘোষণা করেছি, তাই হচ্ছে সংস্কার প্রস্তাব। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ গঠন না হলে রাষ্ট্রের যে সংস্কার আমরা করতে চাচ্ছি তা হবে না। কারণ, এসব সংস্কারের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট (সম্মতি) থাকতে হবে। এই ম্যান্ডেটটাই হচ্ছে নির্বাচন।

তিনি বলেন, তবে নির্বাচনের আগে ন্যূনতম সংস্কারের বিষয়ে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। এটা আমরা বার বার বলে আসছি। এটা বুঝতে হবে।

এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে যেসব সংস্কার কমিশন গঠন করেছে সেখানেও বিএনপি তাদের প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, বিএনপি কেবল নির্বাচন চায়Ñ এ কথা ঠিক নয়। বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতে সংস্কারও চায়। রাষ্ট্র সংস্কারের কথা আজকে বলছে না বিএনপি। আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ থেকে ৬ বছর আগে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা ভিশন-২০৩০ উপস্থাপন করেন।

এতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, এ দুটি পদে দুইবারের কেউ বেশি নির্বাচিত হতে পারবেন না, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার কথা বলা আছে। এর আলোকে ২৭ দফা হয়ে ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনের কথা যেমন বলছি, তেমনি সংস্কারের কথাও তুলে ধরছি।

গত ২০ জানুয়ারি বিএনপি স্থায়ী কমিটির সভায় অন্য ইস্যুর সঙ্গে সংস্কার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। সেখানে বলা হয়, ৩১ দফাই হচ্ছে রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বড় দলিল। এমনকি সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের এই উদ্যোগ নেওয়ার পরে তারা নিজেরাও দলীয়ভাবে ছয়টি সংস্কার কমিটি গঠন করেছে।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে কী ধরনের সংস্কার আনা যেতে পারে, সেসব সুপারিশ তারা ইতোমধ্যে কমিশনের কাছে তুলে দিয়েছে। দলটি রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের পক্ষে থাকলেও অভিমত হচ্ছেÑ আপাতত অপ্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব জটিলতা আরও বাড়াবে। এ নিয়ে শিগগিরই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে তা তুলে ধরবে বিএনপি।

বিএনপি জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক মনে করছে। স্থায়ী কমিটির ওই বৈঠকে জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে ডাকা সর্বদলীয় সভায় অংশ নিয়ে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন তা তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমেদ।

তিনি জানান, সেখানে তিনি বলেছেন, যে কোনো অভ্যুত্থান-আন্দোলনের রাজনৈতিক দলিল প্রণয়নে, রাজনৈতিক মতৈক্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে এর আইনি ভিত্তি কী হবে, সে ব্যাপারে আলোচনা-পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের এত সময় পরে কেন এই উদ্যোগ, সেটাও তিনি জানতে চান।

তবে এ নিয়ে বিএনপির অভিমত হচ্ছে, জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র তৈরিতে সময়ের প্রয়োজন। কারণ, এ ঘোষণাপত্রে রাজনৈতিক দলসহ সব পক্ষের বিগত ১৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা স্থান পাওয়া প্রয়োজন। এছাড়াও সংবিধান সংশোধনও এর সঙ্গে জড়িত।

তবে বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের বিজয়ের একটি ‘নেরেটিভ’ (বয়ান) তাদের দলও তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য সমমনা দলগুলোর কাছে তাদের ‘বয়ান’ চাওয়া হয়েছে।

এমবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন