গণভোট ইস্যুতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের প্রকাশ্যে ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান এবং একাধিক রাজনৈতিক দল, জুলাইযোদ্ধা ও গণমাধ্যমকর্মীর বিরুদ্ধে করা মন্তব্য রংপুরে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে। তার বক্তব্যকে ঘিরে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন পক্ষ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ।
সম্প্রতি জিএম কাদের রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ এবং গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে গণভোটকে সংবিধানবিরোধী আখ্যা দিয়ে জনগণকে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগকে ভোটে অংশ নিতে না দেওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেন। এসব বক্তব্যে তিনি বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও কটূক্তি করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আমার দেশ ও সাংবাদিকদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন জিএম কাদের। এসব মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা আরো বেড়েছে।
জিএম কাদেরের এসব বক্তব্যের প্রতিবাদে বিএনপি নেতাকর্মীরা তাকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। জামায়াত নেতারা বলছেন, নির্বাচনের নামে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে এনসিপি নেতাদের অভিযোগ, ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভোটের নামে নাটক করছেন জিএম কাদের। তাই তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জুলাইযোদ্ধাদের।
জিএম কাদেরের এসব বক্তব্যে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও উদ্বেগ স্পষ্ট। রিকশাচালক মন্টু মিয়া ও খাদেমুল হক জানান, জুলাই আন্দোলনের সময় রংপুরে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ নগরীর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদরাসা এবং মোড়ে মোড়ে ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে মাঠে নেমে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। বিশেষ করে বর্তমান এনসিপির অনেক নেতা ওই সময় জীবন বাজি রেখে আন্দোলনের সম্মুখসারিতে ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির একাত্মতা প্রকাশ করে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। সেখানে আমরা কখনো জাতীয় পার্টি বা তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রসমাজকে দেখতে পাইনি। তাদের মতে, জিএম কাদের সব সময়ই আন্দোলনবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন এবং এখনো জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন, যা সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
রংপুর ভিডিও জার্নালিস্টের সদস্য ও আরটিভির ক্যামেরাপারসন আবুল কাশেম বলেন, গত বৃহস্পতিবার আমার দেশ-এ ‘জিএম কাদেরকে গ্রেপ্তার ও জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের জোর দাবি’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আমার দেশ ও বট বাহিনীর সদস্যরা আমার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করে আমাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে। তবে এগুলোকে আমি ভয় পাই না। আমি গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে জনগণকে ভোট দিতে বলব।
ভিডিও জার্নালিস্টের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ডেমি বলেন, গত শনিবার জিএম কাদের প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের সামনে বলেছেন- যারা নাৎসি বাহিনীর সদস্য তারাই গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে রায় দিতে বলবে। গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে ভোট দিতে হবে। ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেওয়া যাবে না।
এনসিপির জেলা কমিটির সদস্য আল মামুন বলেন, জিএম কাদের অহেতুক বক্তব্য দিয়ে শান্ত পরিবেশ অশান্ত করার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে তারা শিগগির সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অবস্থান স্পষ্ট করবেন।
ছাত্রশক্তির জেলা কমিটির নেতা ও জুলাইযোদ্ধাদের মহানগরের সমন্বয়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি জানান, সাংবাদিকদের সামনে জিএম কাদের জুলাইযোদ্ধা এবং এনসিপি নেতাদের ব্যাপারে বলেছেন, এনসিপির কোন নেতার জুলাইয়ে কী অবদান ছিল, তারা কোথায় কী করেছে, আমাকে প্রমাণ দিয়ে দেখাক, আমি দেখতে চাই। আমি জানি জুলাইযোদ্ধাদের সঙ্গে এনসিপি নেতাদের কোনো অবদান ছিল না।
মহানগর ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল হুদা বলেন, জিএম কাদের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হয়ে সব সময় আওয়ামী লীগের দোসরীপনা করার পাশাপাশি ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত রয়েছেন। তিনি এখন প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন এবং এতে রংপুরের শান্ত পরিবেশ যেকোনো সময় অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
বিএনপি নেতা কাইয়ুম হোসেন বলেন, জিএম কাদেরের প্রকাশ্য বক্তব্য ও আচরণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি। তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। কারণ প্রকাশ্যে গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং মিডিয়ার সামনে জুলাইযোদ্ধা ও বিভিন্ন নেতাকর্মীর নামে বিরূপ মন্তব্যের বিষয়টি সাধারণ মানুষ ভালো চোখে দেখছে না। তার কারণে এ এলাকায় যেকোনো সময় সংঘাত লেগে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও রংপুর জেলা সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাক আমার দেশকে বলেন, জিএম কাদের যা বলছেন তা ভেবেচিন্তেই বলছেন। তার বলার পেছনে অনেক যুক্তি রয়েছে। আমরা জিএম কাদেরের কথার বাইরে যেতে পারি না। সংঘাতের আশঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা। তবে কোনো সংঘাত হবে বলে আমরা মনে করি না।
এ বিষয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আব্দুল মজিদ আমার দেশকে বলেন, গোয়েন্দা তথ্যে আমরা কী পেয়েছি, তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে গণভোটকে ঘিরে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা রোধে পুলিশ সর্বদা প্রস্তুত। মাঠে কোনো সংঘাত হতে দেওয়া হবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

