আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

অবাধে প্রচারের সুযোগ পেলেও ভোটার এড়িয়ে চলছেন কাদের

বাদশাহ ওসমানী, রংপুর

অবাধে প্রচারের সুযোগ পেলেও ভোটার এড়িয়ে চলছেন কাদের
ফাইল ছবি

রংপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর’ তকমা মাথায় নিয়েই নির্বাচনি মাঠে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ‘না’-এর পক্ষে ভোট চাওয়ার অভিযোগ উঠলেও সেসব অভিযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না তিনি।

২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ থাকায় ভোটের মাঠে তাকে ঘিরে আতঙ্ক ও অনাস্থার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ কারণে তিনি সাধারণ ভোটারের পরিবর্তে পরিচিত ব্যক্তি ও সীমিত পরিসরে গিয়ে ভোট চাইছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা অন্যান্য দলের সঙ্গে সমানতালে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

রংপুর-৩ আসনটি রংপুর সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ চার হাজার ১৩৬ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১৬৯টি। এর আগের বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনে জিএম কাদের ৮১ হাজার ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর, হরিদেবপুর ইউনিয়ন এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লাসহ অন্যান্য প্রতীকের পাশাপাশি লাঙ্গল প্রতীকের ব্যানার–ফেস্টুন বিভিন্ন সড়কের পাশে ঝুলছে। মাইকিংসহ প্রচার কার্যক্রমে কোথাও বাধার ঘটনা চোখে পড়েনি।

সদর উপজেলার চন্দনপাঠ ইউনিয়নের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের রাজ মিয়া, রংপুর নগরীর লালবাগ বাজারের মুদি দোকানদার মোকলেসুর রহমান ও ব্যবসায়ী নেতা গোলাপ হোসেন জানান, রাষ্ট্রপতি এরশাদের জীবদ্দশায় জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে আলাদা করে ভোট চাইতে আসতে হতো না। এখানকার মানুষ জাতীয় পার্টি ছাড়া কখনো কাউকে ভোট দেয়নি। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, জিএম কাদের জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগি করে মন্ত্রী হলেও এলাকার খোঁজ নেননি। উন্নয়ন বরাদ্দ তার দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। এবার তাকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করলেও একই পরিস্থিতি হবে, এলাকার উন্নয়ন হবে না। তাছাড়া তিনি চব্বিশের বিপ্লবে প্রকাশ্যে ছাত্র-জনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে মূলত আওয়ামী লীগের পক্ষেই কথা বলেছেন। এসব কারণেই এবার তারা জাতীয় পার্টিকে ভোট দেবেন না বলে জানান।

জুলাই আন্দোলনের এক যোদ্ধা ইমতিয়াজ ইমতি বলেন, আমরা যারা জুলাইয়ের পক্ষে আন্দোলন করেছি, তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চাইছি। সেখানে ফ্যাসিস্টের দোসর জিএম কাদের প্রকাশ্যে ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। আমরা ইতঃপূর্বে নির্বাচন কমিশনকে বলেছিলাম জাতীয় পার্টিকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার জন্য। তাছাড়াও আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এসব দাবি উপেক্ষা করে জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে সুযোগ দিয়েছে, জুলাইযোদ্ধাদের অবমাননা করেছে। তিনি দাবি করেন, মানুষ আর আওয়ামী লীগের দোসরদের ভোট দেবে না।

অন্যদিকে জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমরা মাঠে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। জিএম কাদেরের কোনো বিকল্প নেই। এবারও লাঙ্গল বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।

জাতীয় পার্টির মহানগর কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক লেবু মিয়া জানান, গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রশ্নে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়তে হলেও জিএম কাদের নিজেই সেগুলোর জবাব দিচ্ছেন। তার দাবি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বা সরকারের কোনো আলোচনায় কখনো জাতীয় পার্টি বা তাদের কোনো নেতাকর্মীকে ডাকা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার অন্যদের সঙ্গে নিয়ে নিজেরাই বিভিন্ন আইন পাস করে বিভিন্ন কালাকানুন প্রয়োগ করে দেশ চালাচ্ছে। আমাদের যেহেতু ডাকা হয়নি, কোনো পরামর্শ নেওয়া হয়নি; এ কারণে আমরা গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছি।

রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও প্রেসিডিয়াম সদস্য আজমল হোসেন লেবু বলেন, আমরা নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছি। সেখানে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান করা হয়েছে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান রংপুরের সাবেক মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাকে। জিএম কাদের নিজেই আমাদের সঙ্গে রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকাসহ সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ ভোটারদের কাছে ভোট চাইতে যাচ্ছেন। আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। এবারও এই আসনে লাঙ্গল প্রতীক জিতবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জিএম কাদের বলেন, আমি একাধিকবার মন্ত্রী ছিলাম। কেউ আমার বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির অভিযোগও তুলতে পারেনি। সংবিধান অনুযায়ী সবার ভোটাধিকার আছে। আওয়ামী লীগও ভোট করার অধিকার রাখে। আমি আতঙ্কিত নই। নির্বাচনি প্রচারে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আশা করি বিপুল ভোটে জয়ী হব।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বেনজু বলেন, আইনগত বাধা না থাকলে কে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলবেÑসেটা তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। জিএম কাদের যা করছেন, সেটা তার একান্ত দলীয় বিষয়। তবে যারা পরিবর্তন চাযন, তাদের ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষেই থাকা উচিত।

রংপুরের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক এনামুল আহসান আমার দেশকে বলেন, রংপুরের ছয়টি আসনে এখন পর্যন্ত আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোনো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ব্যানার–ফেস্টুন-সংক্রান্ত ত্রুটি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সরিয়ে দিচ্ছেন। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...