বিশ্বজুড়ে যখন সুইস ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ কমছে, তখন বাংলাদেশিদের জমার পরিমাণ ৪১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকায়। শুধু গত এক বছরেই নতুন করে জমা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ ঠিক এ সময়টাতেই অন্তর্বর্তী সরকার অর্থ পাচার ঠেকাতে এবং পাচার হওয়া টাকা ফেরাতে সবচেয়ে বেশি তৎপর ছিল। টাস্কফোর্স গঠন হয়েছে, আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা নিয়োগ করা হয়েছে, লবিস্টও রাখা হয়েছে। তবু এত বিশাল অঙ্কের টাকা কীভাবে দেশের বাইরে চলে গেল, সেই প্রশ্ন তোলাটা খুবই স্বাভাবিক।
সুইস ব্যাংকের প্রতি এই আকর্ষণ শুধু লোভ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ কাজ করে, গোপনীয়তা, মনস্তাত্ত্বিক ভয় এবং মুদ্রার স্থিতিশীলতা। সপ্তদশ শতক থেকে চলে আসা এই গোপন ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুনাম এখনো অক্ষুণ্ণ আছে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ছাড়া সুইজারল্যান্ড কাউকে তথ্য দেয় না। ভারতের সঙ্গে এমন চুক্তি আছে, বাংলাদেশের সঙ্গে নেই। ফলে কারো অ্যাকাউন্টের খবর পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এছাড়া দেশের ভেতরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে সম্পদ বাজেয়াপ্ত হওয়ার যে ভয় থাকে, সুইস ব্যাংক তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব দেয়, আর সুইস ফ্র্যাংক পৃথিবীর অন্যতম স্থিতিশীল মুদ্রা হওয়ায় সেখানে টাকা রাখলে সুদের পাশাপাশি মুদ্রার মান বৃদ্ধির কারণেও বড় মুনাফা মেলে। এই তিনটি দেয়াল ভাঙতে না পারলে শুধু ফাঁকা হুমকি দিয়ে পাচার বন্ধ করা যাবে না। এজন্য সবার আগে দরকার ছিল সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে তথ্যবিনিময় চুক্তি, যা বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদকের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বছরের পর বছর ঝুলে আছে।
দুই হাজার চব্বিশের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ঘোষণা করেছিল। শ্বেতপত্রের মাধ্যমে গত দেড় দশকের পাচারের চিত্রও সামনে এসেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন মেনে টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়া বাস্তবে অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের একমাত্র সফল মামলা, ফেয়ারহিল মামলায় মাত্র এক মিলিয়ন ডলার ফেরত আনতেই সময় লেগেছিল তিন বছর।
তবে এই ব্যর্থতার পেছনে অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও কম দায়ী নয়। পাচার প্রতিরোধ ও অর্থ উদ্ধারের প্রাথমিক দায়িত্ব বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, সংক্ষেপে বিএফআইইউর। তাদের কাজ পাচারের গতিপথ চিহ্নিত করা, আর সেই তথ্যের ভিত্তিতে দুদক, এনবিআর বা সিআইডি তদন্ত করে মামলা করবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, অনেক অর্থ পাচার মামলায় এনবিআর, কাস্টমস বা বিএফআইইউর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে সাক্ষীই করা হয় না, অথচ যাদের অনুমোদন ছাড়া দেশের আমদানি-রপ্তানি সচল রাখাই অসম্ভব। কোনো তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক যদি পণ্যের প্রকৃত দাম কম দেখিয়ে চালান পাঠান, তবে বাকি অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই দেশের বাইরে থেকে যায়। এই ওভার বা আন্ডার ইনভয়েসিং বন্ধ করতে কাস্টমস ও ব্যাংক খাতের মধ্যে যে সমন্বয় দরকার, তা আজও গড়ে ওঠেনি। শুল্ক গোয়েন্দাদের সক্ষমতা বাড়েনি, হুন্ডি চক্র আগের মতোই সক্রিয়। বিএফআইইউকে শক্তিশালী করার বুলি প্রতিটি সরকারের আমলেই শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবে এই সংস্থারই কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে অর্থ পাচার হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানকে খোলনলচে বদলে না ফেললে যেকোনো সংস্কার উদ্যোগ মাঝপথেই আটকে যেতে বাধ্য।
এই জায়গাতেই অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি ও ভূমিকার সমালোচনা করার অবকাশ থেকে যায়। ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও আসল চ্যালেঞ্জটি শুরু হয়েছে তারপর থেকেই। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এগারোটি মামলার আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে সায় দিয়েছে, বাকি সাতটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কাগজে-কলমে একে অগ্রগতি বলা গেলেও, সুইস ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে অর্থ পাচারের মূল উৎসগুলো এখনো পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে তিনটি রূঢ় বাস্তবতা সামনে আসে। প্রথমত, ধারাবাহিকতার সংকট, আন্তর্জাতিক মামলাগুলো বছরের পর বছর চলে বলে ভবিষ্যতে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে এই লড়াইয়ের হাল কে ধরবে, তা অনিশ্চিত। দ্বিতীয়ত, নতুন সুবিধাভোগী শ্রেণির উত্থান, কেননা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী তৈরি হয় আর সুইস ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য সেই আশঙ্কাকেই সত্যি প্রমাণ করছে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, কারণ অর্থ উদ্ধারে যেসব দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন, তারা অনুরোধকারী দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকেই বিশেষভাবে বিবেচনা করে।
তাই নতুন পাচার রোধ এবং পুরোনো টাকা উদ্ধার, এই দুটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশলে দেখতে হবে। নতুন পাচার রুখতে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে দ্রুত তথ্যবিনিময় চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে, আমদানি-রপ্তানির চালান যাচাই কঠোর করতে হবে এবং কাস্টমসে বিশেষায়িত অ্যান্টি মানি লন্ডারিং ইউনিট গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে হুন্ডি বন্ধে ব্যাংকিং নজরদারি বাড়িয়ে বিএফআইইউকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।
অন্যদিকে পুরোনো টাকা ফেরাতে সবার আগে দেশের আদালতগুলোয় মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত করতে হবে, কারণ একটি মামলা শেষ হতে যেখানে ষোলো-সতেরো বছর লাগে, সেই ধীরগতি নিয়ে বিদেশ থেকে অর্থ ফেরানোর স্বপ্ন দেখা অবান্তর। এজন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং শীর্ষ দশটি দেশের সঙ্গে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি সই করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আইনি ফার্ম নিয়োগের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি, কারণ অনেক সময় যেসব ফার্ম অর্থ পাচারে সহায়তা করে, তারাই আবার অর্থ উদ্ধারের কাজ পাওয়ার চেষ্টা করে।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি আইনি নয়, বরং কূটনৈতিক দরকষাকষির। মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ বিনিয়োগ করা হলেও তা মালয়েশিয়ার নিজস্ব আইনে সম্পূর্ণ বৈধ। ফলে নিজেদের অর্থনীতিতে আসা বিনিয়োগ তারা কেন সহজে ফেরত দিতে চাইবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আইনি চিঠিতে মিলবে না, লাগবে জোরালো কূটনৈতিক আলোচনা।
অর্থ পাচার উদ্ধার একটি দীর্ঘ, জটিল ও ম্যারাথন প্রক্রিয়া, এটাই বাস্তবতা। তাই তাৎক্ষণিক জাদুর কাঠির প্রত্যাশা না করে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষ তদন্ত কাঠামো ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দিতে হবে এবং সরকার বদল হলেও যেন এই আইনি প্রক্রিয়া থমকে না যায়, সেই নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে। এখন পর্যন্ত অর্থ উদ্ধারে দৃশ্যমান বড় সাফল্য আসেনি, কিন্তু নতুন করে টাকা পাচার বন্ধ করতে না পারলে ভবিষ্যতের সব চেষ্টাই পণ্ড হবে। চলে যাওয়া অর্থ উদ্ধারের লড়াইয়ের পাশাপাশি পাচারের বর্তমান পথগুলো কঠোরভাবে বন্ধ করাই হবে এই লড়াইয়ে টেকসই অগ্রগতির একমাত্র চাবিকাঠি।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


