১১ দলীয় ঐক্যের আলোচনা সভায় বক্তারা

শহীদদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে

শহীদদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ১১ দলীয় ঐক্যের নারীদের অংশগ্রহণে আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, চব্বিশের জুলাইয়ে আবু সাঈদসহ তরুণদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়ার উদ্দেশ্য ছিল-স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতামূলক ও বৈষম্যমুক্ত একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা। তারা চেয়েছিলেন- রাষ্ট্র সংস্কার ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হোক। শহীদদের সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণে অবিলম্বে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। এই দাবি বাস্তবায়নে ১১ দলের ঐক্য বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তারা।

বিজ্ঞাপন

সোমবার বিকেলে রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে এই আলোচনা অনুষ্টিত হয়। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি মারজিয়া বেগমের সভানেত্রীত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভার উদ্বোধন করেন শহীদ জাবির ইব্রাহীমের মা রোকেয়া বেগম এমপি।

এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান এমপি বলেন, জনগণ গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। অথচ সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে বিএনপি প্রথম বে-ঈমানি করেছে।

তিনি বলেন, চব্বিশের জুলাইয়ে যদি আমরা সবাই মিলে আন্দোলন করতে পারি, তাহলে জুলাইন সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য আরেকটি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবো।

তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, জুলাই সনদ অবৈধ হলে এ সরকার ও সরকারের মন্ত্রিসভাও অবৈধ। অবিলম্বে সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে সংস্কার পরিষদ গঠন করুন। জুলাই সনদ আমরা বাস্তবায়ন করেই ছাড়বো। সংসদে না হলে রাজপথে সমাধান হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি সাইদা রুম্মান বলেন, চব্বিশের গণআন্দোলন একটা বিপ্লব, দ্রোহ। যার ফলে আমরা এখানে দাঁড়িয়ে আছি, এই সরকার গঠিত হয়েছে। অথচ এই সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তালবাহানা করছে। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমরা আমাদের সব দাবি বাস্তবায়ন করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য মনিরা শারমিন এমপি বলেন, জুলাইয়ের ঘটনা সাধারণ মানুষ ভুলে গেলে শহীদ পরিবার কখনো ভুলতে পারবে না। জুলাইয়ের এই শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। শাপলা ও চব্বিশের এত ত্যাগের মুল্যায়ন করতে হবে। আমাদের এই ঐক্য বজার রেখে এক সুরে কথা বলতে হবে। সরকার চাতুরি করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা জুলাই ও জুলাই শহীদদের পক্ষে আছে।

জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি আয়েশা সিদ্দিকা পারভীন তার বক্তব্যে সুপ্রীম কোর্টের অ্যাডভোকেট তাসমিন রানা বলেন, চব্বিশের জুলাই আমাদের অর্জনের ভিত্তি। আমাদেরকে অবশ্যই জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করতে হবে। সংবিধান সংস্কারের জন্য জনগণ গণভোটে রায় দিয়েছে। সেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এই দেশকে রক্ষা করতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স সেক্রেটারি ড. হাবিবা চৌধুরী সুইট বলেন, একাত্তর আমি দেখিনি, কিছু গল্প শুনেছি। কিন্তু চব্বিশ আমি নিজ চোখে দেখেছি। জুলাইয়ের আন্দোলনকে কোন দল একক দাবি করতে পারবে না। সব দলমত, ধনী-গরিব নির্বিশেষে ওই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। সবার উদ্দেশ্য ছিল-ফ্যাসিবাদকে বিদায় করা। তিনি বলেন, জুলাই সনদ যারা চাচ্ছে তাদের মধ্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা চলছে। কোন ষড়যন্ত্রে পা দেয়া যাবে না। ১১ দলের ঐক্যে ফাটল ধরানো যাবে না।

তিনি সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সংবিধানের দোহাই দেয়া যাবে না। তালবাহানা করা যাবে না। সম্মিলিতভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি আদায় করতে হবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু বলেন, জুলাইয়ের সেই ভয়াবহ অবস্থা আমরা আসলে ঠিকমত তুলে ধরতে পারি না। বাড্ডায় আমার চোখের সামনে গুলি করতে দেখেছি। এই ট্রমা আসলে ভোলার নয়।

তিনি বলেন, শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। যারা জুলাই চেতনা বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে, তাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হবে। এই রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কার করা খুব জরুরি। তিনি জুলাই গণহত্যা ও শহীদ হাদি হত্যার বিচার দাবি করেন।

বাংলাদেশ লেবার পার্টির যুগ্ম মহাসচিব সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগকে আমরা কখনই ভুলতে পারব না। আমরা শুধু জুলাই নয়, দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। তিনি বলেন, সরকার গত পাঁচ মাসে প্রমাণ করেছে, তারা জুলাই চেতনায় বিশ্বাস করে না। তাই জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নে আমাদের জোরদার আন্দোলন করতে হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবা হাকিম বলেন, জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত সময়ে যে মা বাবা তার সন্তানকে হারিয়েছেন, আমরা তাদের শান্তনা দিতে পারি, কিন্তু তাদের সেই ক্ষতিপূরণ করতে পারব না। তবে আমরা চাই, তাদের সন্তানদের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা হোক। আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হোক। সেই সঙ্গে শাপলার শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানান তিনি।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) নেত্রী অধ্যাপিকা কারিমা খাতুন বলেন, জুলাই আন্দোলনে আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হয়, আমি নিজেও আহত হই। আমরা জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন চাই। নারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মাহবুবা আক্তার রলি বলেন, আমরা বায়ান্ন, একাত্তর দেখিনি, কিন্তু চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে আবু সাঈদরা কিভাবে বুকের তাজা রক্ত দিয়েছে তা দেখেছি। তাদের সেই আন্দোলনে ফ্যাসিবাদ বিতাড়িত হয়েছিল। আমরা পুরানো সেই ফ্যাসিবাদে আর ফিরে যেতে দেব না। অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য নাজমুন্নাহার নীলু এমপি বলেন, চব্বিশের জুলাইয়ে তরুণদের প্রতিবাদ ছিল-স্বচ্ছতা, জবাবদিহীতা, দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়-বিচারের সুন্দর একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন মানেই স্বচ্ছতা-জবাবদিহীতা ফিরে আসা ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা হওয়া। কিন্তু সরকার কি এগুলো চায় না বলেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না? অবিলম্বে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।

সভানেত্রীর বক্তব্যে মারজিয়া বেগম এমপি বলেন, জুলাই চেতনা বাস্তবায়নে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জুলাইয়ের স্মৃতি রক্ষা করতে হবে। ইনসাফ ও আইনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জুলাই বিপ্লব আমাদেরকে এই নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন ডাকসুর সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না, শহীদ শাহরিয়ার শুভর স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা, শহীদ সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম, জুলাই শহীদ নাজমুল কাজীর স্ত্রী মারিয়া সুলতানা প্রমুখ। এতে ১১ দলীয় ঐক্য ছাড়াও বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নারী নেত্রীরা উপস্থিত ছিলেন।

এমই

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন