আওয়ামী জুতো পরে হাঁটছে বামরা

আওয়ামী জুতো পরে হাঁটছে বামরা

গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরের মধ্যে আওয়ামী প্রচারবিদরা রক্তাক্ত এই জুলাইয়ে আবার ফিরে এসেছে। তাদের সঙ্গে সুর মিলাচ্ছে আওয়ামী লীগের পুরোনো বাম রাজনৈতিক মিত্ররা। তারা প্রশ্ন তুলছে—‘হাসিনাকে তাড়িয়ে কী পেল বাংলাদেশ?’ যার অন্তর্নিহিত বক্তব্য হলো, আগে ভালো ছিলাম। তারা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সরব নয়, মূলধারার গণমাধ্যমেও প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন। তাদের মূল লক্ষ্য দেড় সহস্রাধিক মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করে এটিকে একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা। তাদের প্রকৃত লক্ষ্য হলো ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনার আড়ালে হাসিনার গুম, খুন ও নিপীড়নের শাসনকে আড়াল করা।

হাজারো মানুষের আত্মদানের বিনিময়ে বাংলাদেশের মানুষ সত্যিই কী পেয়েছে, তা আজ নতুন করে উপলব্ধি করার সময় এসেছে। এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিদেশি মদতে জনগণের কাঁধে চেপে বসা দেড় দশকের এক নিপীড়ক শাসকের পতন ঘটেছে। তার পতনের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষের প্রথম অর্জন ছিল কথা বলার স্বাধীনতা ফিরে পাওয়া। ছাত্র-জনতা জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা অর্জন করে। যার প্রতিফলন আমরা দেখেছি রাজধানীসহ সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে। সেখানে লেখা ছিল দেড় দশকের অব্যক্ত বেদনার কথাগুলো।

বিজ্ঞাপন

বছরের পর বছর বন্দিশালায় থাকা রাজনীতিকরা মুক্ত হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘স্কুল-কলেজের মাসুম বাচ্চারা জীবন দিয়ে আমাদের মুক্ত করেছে।’ হ্যাঁ, এটি কোনো কথার কথা নয়। মাসুম বাচ্চারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে জেলখানা ও আয়নাঘরে আটক বন্দিদের মুক্ত করেছে। আমরা ভুলে গেছি, এই অভ্যুত্থানে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের তথ্যমতে, ৯৮৬টি রেকর্ডকৃত মৃত্যুর মধ্যে ১১৮ জন ছিল শিশু। অভ্যুত্থানে অন্তত ১৩ জন নারী শহীদ হয়েছেন।

এদেশের কিশোর-তরুণদের আত্মদানের ঘটনাগুলো যেন আমরা ভুলে যেতে বসেছি। আমরা যেন ভুলে গেছি শহীদ নাফিসার কথা। ৫ আগস্ট সাভারে নাফিসাকে গুলি করা হয়েছিল। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সে বাবাকে ফোন করে বলেছিল, ‘বাবা, আমি গুলি খেয়েছি। আমি মনে হয় আর বাঁচব না। আমি মারা যাচ্ছি। আমি ল্যাবজোন হাসপাতালে আছি। আমার লাশটা নিয়ে যেয়ো।’ নাফিসা বলেছিল, ‘বাবা, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমি বাড়ি ফিরব না। আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’

নাফিসারা যে দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীন করেছিল, সেই দেশে এখন চারপাশে পতিত স্বৈরশাসকের সহযোগীদের কণ্ঠই বেশি শোনা যাচ্ছে।

আমরা ভুলে গেছি শিশু শহীদ আনাসের সেই চিঠির কথা। যে চিঠিতে আনাস লিখেছিল, ‘মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। আমি নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলাম না। সরি, আব্বুজান। তোমার কথা অমান্য করে বের হলাম। স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। আমাদের ভাইরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে রাজপথে নেমে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অকাতরে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিচ্ছে। একটি প্রতিবন্ধী কিশোর, সাত বছরের একটি শিশু কিংবা একজন ল্যাংড়া মানুষ যদি সংগ্রামে নামতে পারে, তাহলে আমি কেন ঘরে বসে থাকব? একদিন তো মরতে হবেই।’

নাফিসা-আনাসদের রক্তের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশের অর্জনগুলো আজ ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনের পর নির্বাচিত সরকারের আরও পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো মানুষ গুম হয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলতে গেলে বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে। সরকারের মন্ত্রীদের সমালোচনা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্ত্রী, এমপি ও রাজনৈতিক নেতাদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হচ্ছে। কিন্তু এজন্য কাউকে জেলে যেতে হয়নি। অথচ হাসিনা ও তার বাবার সমালোচনা করার কারণে বহু মানুষকে কারাগারে যেতে হয়েছে। ২৩ বছর বয়সী এক যুবকের ৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ১,৩০০টি মামলা হয়েছিল, যার অনেকগুলোই ছিল শেখ হাসিনার সমালোচনা করার কারণে।

হাজারো তরুণ ও শিশুদের রক্তের বিনিময়ে আমরা এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ পেয়েছি। দেড় দশক পর এদেশের মানুষ ভোট দেওয়ার অধিকার পেয়েছে। সেই ভোটের মাধ্যমে একটি সংসদ গঠিত হয়েছে। সেই সংসদে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের নানা ধরনের দুর্বলতা থাকলেও বিতর্ক সমালোচনা ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আইনপ্রণয়ন করা হচ্ছে। দেশের মানুষের সমস্যা নিয়ে কমবেশি আলোচনা হচ্ছে। এই প্রথম আমরা সংসদে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক দেখছি। পাঁচ মাসে বিরোধী দল এখন পর্যন্ত হরতাল-অবরোধ কিংবা জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো কর্মসূচি দেয়নি। কিন্তু বিরোধী দল তাদের বিভিন্ন দাবির পক্ষে সভা-সমাবেশ ও জনমত গঠনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। সভা-সমাবেশে সরকারের কঠোর সমালোচনা করা হচ্ছে। কিন্তু বিরোধী দলের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে দূরে থাকার এই নীতি পতিত ও নির্বাচনে প্রত্যাখ্যাত আওয়ামী পুরোনো মিত্র বামদের ভালো লাগছে না। তারা বিরোধী দলকে এখন জাতীয় পার্টির সঙ্গে তুলনা করছে। অর্থাৎ হাসিনা আমলের সঙ্গে তুলনা করে রক্তের মাধ্যমে অর্জিত অর্জনকে খাটো করে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ ছিল ভারতের আধিপত্যবাদের নিগড়ে বাঁধা এক দেশ। যে দেশের ছিল না কোনো স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার আত্মমর্যাদা ফিরে পায়। ভারতের প্রভাব-বলয়ের বাইরে এসে বহু বছর পর বাংলাদেশ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের সুযোগ পাচ্ছে। একটি জাতির আত্মমর্যাদার চেয়ে আর বড় কিছু পাওয়ার নেই।

গণঅভ্যুত্থানের অর্জন নিয়ে হাসিনার চিহ্নিত প্রচারবিদদের সঙ্গে এখন একই সুরে কথা বলছে এদেশের তথাকথিত বাম প্রগতিশীলরা। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছেন, যারা জুলাইয়ের আন্দোলনের শেষদিকে অংশ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের বামপন্থি সংগঠনগুলো বছরের পর বছর ধরে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একদলীয় বাকশাল শাসনের অবসান হয়েছিল। ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের উত্থান ঘটেছিল। এরপর দেশে ফিরে এসেছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র। মুজিবের দুঃশাসন আওয়ামী রাজনীতির দুঃসময় ডেকে এনেছিল। মস্কোপন্থি বামরা শেখ মুজিবের একদলীয় শাসনের শুধু সহযোগীই ছিল না, আওয়ামী রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে তারা প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।

আজ আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে মানুষ যখন রক্তের বিনিময়ে পরাজিত করেছে, তখন তথাকথিত এই বামপন্থিরা আবার পরোক্ষভাবে মাঠে নেমেছে। যার মূল লক্ষ্য হলো জুলাইয়ের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। এরাই বছরের পর বছর ধরে আওয়ামী লীগকে একটি মধ্য-বামপন্থি উদার গণতান্ত্রিক দল হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে এসেছে। এই বামপন্থিদের রাজনীতি উৎসারিত হয়েছে ইসলামোফোবিয়া থেকে। দেশের ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোকে মোকাবিলার নামে তারা মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে একনিষ্ঠভাবে বয়ান তৈরি করে গেছে। এমনকি বিএনপিকেও তারা ইসলামপন্থি রাজনীতির প্রধান সমর্থক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে গেছে। সেই মনোভাব থেকেই তারা এখন সংসদে বিএনপিকে দেখছে আওয়ামী লীগের ভূমিকায় এবং জামায়াতকে জাতীয় পার্টির ভূমিকায়।

বাস্তবতা হলো, এই বামপন্থিদের হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে কুসুম-কুসুম বিরোধিতার সুযোগ দিয়ে রাস্তায় একধরনের সরকারবিরোধী ‘গণতান্ত্রিক’ রাজনীতি সচল দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী দলের নেতাদের যখন হাসিনা গুম, খুন, কারাবন্দি কিংবা ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে, তখন বামরা তোপখানা রোড ও প্রেস ক্লাবের সামনে জনমানবহীন সমাবেশে মাইক টাঙিয়ে গরম বক্তৃতা দিয়েছে। একই সঙ্গে সংসদে ছিল জাতীয় পার্টির মতো গৃহপালিত বিরোধী দল। বামপন্থিরা এখন নিজেদের সেই চরিত্র অন্যদের মধ্যে দেখছে। বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট হিসেবে বামপন্থিদের এই চরিত্র বহু আগেই ধরে ফেলেছে।

অতীতের নির্বাচনের মতো বামপন্থিরা এবার যেসব স্থানে নির্বাচন করেছে, প্রতিটি আসনেই তারা জামানত হারিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নতুন দল এনসিপিসহ খেলাফত মজলিসের মতো ছোট ইসলামপন্থি দলগুলো যখন সংসদে অন্তত একটি করে হলেও আসন পেয়েছে, তখন বামপন্থিদের জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ, এদেশের মানুষ জানে, বামদের শেষ গন্তব্য হলো আওয়ামী লীগ। ‘অভ্যুত্থান থেকে কী পেলাম’—এমন প্রশ্ন তুলে বামরা আবার আওয়ামী বয়ান ফেরি করার চেষ্টা করছে। যার মূল লক্ষ্য হলো গণতন্ত্র হত্যা করে একনায়কতান্ত্রিক শাসন কায়েমের পথ তৈরি করা। কিন্তু তথাকথিত এই বামপন্থিরা ভুলে গেছে, এবারের গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করেনি, তাদের টিকিয়ে রাখার ন্যারেটিভ বা বয়ানকেও পরাজিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, তথাকথিত প্রগতিশীলতা আর ধর্মনিরপেক্ষতার নামে হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের রূপ এদেশের মানুষ দেখে ফেলেছে। বামরা নিজেদের সংশোধন না করে আবার আওয়ামী লীগের পুরোনো জুতা পরার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের জন্য এই জুতা পায়ে দিয়ে বেশি দূর হাঁটা যাবে না।

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ

alfaz@dailyamardesh.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন