অভ্যুত্থান হলো গণমানুষের ক্ষোভের আকস্মিক বিস্ফোরণ, যা স্বৈরাচারের পতন ঘটায়; আর বিপ্লব শুধু শাসককে চেয়ার থেকে টেনে নামানো নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা। তাহলে জুলাইয়ে যা হয়েছিল, সেটা আসলে কী ছিল? এটা কি আসলেই বিপ্লব, নাকি বাকি সব আন্দোলনের মতো এটাও শুধুই আরেকটি গণঅভ্যুত্থান?
রাজপথে রক্ত ঝরেছে। জনগণের টাকায় কেনা বুলেট চলেছে তাদের ওপরেই। সেই বুলেট ঝাঁঝরা করেছে শত শত তরুণের বুক-মাথা। এই যে তারা জীবন দিল—কেন? শুধু কি একজন স্বৈরাচারের পতন দেখতে? না। তারা চেয়েছিল বৈষম্যহীন সমাজ; চেয়েছিল এমন বাক্স্বাধীনতা, যেন ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করা যায়। তারা চেয়েছিল একটি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা; চেয়েছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের পচন দূর করতে। কিন্তু এরপর কী পেলাম আমরা? উত্তরটা সবার জানা।
কারণটা স্পষ্ট। জুলাইকে অভ্যুত্থান থেকে বিপ্লবে পরিবর্তন করতে যা সবার আগে দরকার ছিল, ঠিক সেটাই হয়নি। সংস্কার। আন্দোলনের ক্রেডিট ভাগাভাগি জাতিকে আর ঐক্যবদ্ধ থাকতে দেয়নি। দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা সব সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দিয়েছে। শহীদ পরিবারদের সাহায্য কিংবা আহতদের চিকিৎসা—এসব কিছুই তখন আলোচ্য বিষয় ছিল না। এক্ষেত্রে বড় ব্যর্থতা রয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের, যারা ক্ষমতায় বসেছিলই জুলাইয়ের রক্তের ওপর দিয়ে। উদাসীনতায় আমরা আন্দোলনে আহত অনেক ভাইকে হারিয়েছি, বিশেষ করে আহতদের মধ্যে যাদের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার দরকার ছিল। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার। সংস্কার করতে করতে তারা কাটিয়ে দিল দেড় বছর। সংস্কারের বুলি শুনিয়ে তখনো জনগণকে ভুলিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কারই তারা করেনি। শুধু সংস্কার পেপার তৈরি করেছে, যা এখন মূল্যহীন হয়ে পড়েছে।
সংস্কারের প্রশ্নে আয়োজিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। কিন্তু সংস্কারের সময় সরকারি দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া সংস্কারগুলো কেন বাতিল করা হলো? জনগণ তো সব সংস্কার চেয়েই ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল। তবে কি স্বার্থের পরিপন্থি হলেই সেটাকে হিমাগারে পাঠানো হবে! প্রহসনের আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল যখন গুমবিরোধীর মতো মৌলিক মানবাধিকারের আইনও বাতিল হয়ে যায়। সেখানে মানুষ কীভাবে ভবিষ্যতে নিজের অধিকার চাইতে যাবে? সেই পুরোনো গোলকধাঁধা, যেখানে অধিকার চাইতে এসে অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে।
চব্বিশের পর চেয়ারে বসা মুখগুলো বদলেছে। কেবল মালিক বদলেছে, দাসত্বের নিয়ম বদলায়নি। চাটুকারের দল এখনো সক্রিয়। পুলিশ এখনো লাঠি চালায়। আমলাতন্ত্রের সেই পুরোনো জট এখনো খোলেনি। এখনো ফাইল আটকে থাকে অনিয়মের বেড়াজালে। রাষ্ট্রের অলিন্দ-নিলয়ে এখনো সিন্ডিকেট আপন গতিতে বহমান।
গণমানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণে শুধু এক স্বৈরাচারের মন্ত্রিসভার পতন হয়েছে। এছাড়া দেশের আর কিছুই তেমন পাল্টায়নি। তাহলে শুধু ক্ষমতার হাতবদলকে আমরা বিপ্লবের আখ্যা কেন দেব? বিপ্লব তো রাজপথে জনতার এক দিনের কোনো বিজয় উৎসব নয়। বিপ্লব একটি আমূল পরিবর্তনের নাম।
শহীদদের রক্তকে পুঁজি করে জুলাইয়ের ওপর ভর করে অনেকের মধু খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে; কিন্তু সাধারণ মানুষ যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। রাষ্ট্রকাঠামো ও ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন না হলে সাধারণ মানুষ চব্বিশের কোনো সুফল পাবে না। সাধারণ মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়—ঘুস, দুর্নীতি, হয়রানি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং জিনিসপত্রের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা। কিন্তু এসবই মহোৎসবের সঙ্গে চলছে আগের মতোই। তাহলে এত ত্যাগের বিনিময়ে তাদের কী লাভ হলো?
কাঙ্ক্ষিত সংস্কার না হওয়ায় জুলাই শেষ পর্যন্ত কেবল স্বৈরশাসকের পতন তথা অভ্যুত্থানের গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে। জুলাইকে বিপ্লবে পরিণত করা না গেলে, জুলাই বিপ্লব হতে না পারলে আবু সাঈদ, মুগ্ধদের রক্ত বৃথা যাবে। মানুষের মুক্তির চির-আকাঙ্ক্ষা কেবল স্বপ্নই রয়ে যাবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


