ষাটের দশকের শেষ প্রান্ত, আর শেষ প্রান্ত বাদ দিয়ে সত্তরের দশক—এই সময়টা ছিল কৈশোর-তারুণ্যে আমাদের প্রজন্মের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতার সূচনা ও প্রশিক্ষণের সকাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে, বাঁশের বেড়ার অতিক্ষুদ্র কক্ষ, ‘শরীফ মিঞার ক্যান্টিন’ বলে আমাদের ওই পথের তরুণদের এক নামে চেনা অতি প্রিয় ‘আড্ডা’, তথা মিলনক্ষেত্র। আমি তবে আড্ডা দিতে যেতাম না—সে সময় আমার ছিল না। যেতাম অল্প দামেই পাঠাগারের সন্নিকটে চা আর অল্প একটু খাবারের জায়গা হিসেবে।
দু’আনার চা, দু’পয়সার নাম কা ওয়াস্তে একটুখানি মাখন মাখানো, অদৃশ্যপ্রায় পরিমাণ চিনি ছিটিয়ে দিয়ে মিষ্টিমুখ করা কটকটে শক্ত টোস্ট বিস্কিট, আর আট আনার ছোট্ট পিরিচের মতো প্লেটে চশমা লাগিয়ে দেখতে হওয়ার মতো অতিক্ষুদ্র চার-পাঁচ টুকরো গোশত দেওয়া ‘বিরিয়ানি’ বিক্রি করতেন মজার মজার ঢাকাইয়া কথা বলা শরীফ ভাই—পরিবেশন করতেন তার সহকারী, ঢাকাইয়া রমজান।
তিনি খুব গর্ব করে বলতেন, দেশে কোনো সিএসপি (সেকালে, আজকের বিসিএস-তুল্য—তখন অসাধারণ মেধাবী সরকারি আমলা) বা সুপরিচিত কবি-সাহিত্যিক নেই, যিনি তার ক্যান্টিনে খাননি। কথাটা অনেকটা অক্ষরে অক্ষরে ঠিক ছিল। তবে হবু আমলার চেয়ে কবি-সাহিত্যিকদেরই বৈঠক ছিল শরীফ মিঞার ক্যান্টিনে এতখানি বেশি যে তা তরুণ কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীদের বলেই পরিচিত ছিল।
যেমনটি ছিল ঢাকার নবাব, খাজা সলীমুল্লাহর বাগানবাড়ি ‘শাহবাগ’, অর্থাৎ ‘রাজকীয় বাগান’-এর ঐতিহাসিক বৈঠকঘরে খুলে বসা মধুর ক্যান্টিন, পরিচিত হয়ে পড়েছিল তরুণ রাজনীতিকদের আড্ডার জায়গা হিসেবে। ‘শরীফ মিঞা’-য় আগন্তুকদের ভেতর সেকালের সকল তরুণ কবি-সাহিত্যিকই ছিলেন—কবি আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, নূরুল হুদা, রফিক আজাদ, আহমদ ছফা, আরো অনেকে—আমি আর ঘনিষ্ঠ তরুণ কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক তো ছিলামই নিয়মিত।
কবি হলে রাষ্ট্রপতি
সেই শরীফ মিঞার ক্যান্টিনেরই নিয়মিত আগন্তুক আমাদেরই সমসাময়িক বা অগ্রজসম কোনো এক কবি কোনো এক কবিতায় কিছু বলেছিলেন, দেশে সুদিন আসবে যখন শাসক হবেন একজন কবি। কালে একজন ‘রাষ্ট্রপতি’ এলেন, যিনি কবি বলে পরিচিত হন। যদিও মন্দ লোকে বলে, তিনি নাকি অন্যদের দিয়ে কবিতা লিখিয়ে নিজের করে নিতেন। কাছে টেনে নিয়ে নিজের করে নেওয়ার বিষয়ে তার পরিচিতি ছিল, এমনিতেই বেশ! সে শাসনামলে সারা দেশে সুদিন এসেছিল কি না, খুব বেশি জানি না—তার বেশি সময় আমি দেশের বাইরেই ছিলাম। তবে কারো কারো কাছে কিছুটা সুদিনের কথাও ছিল। প্রয়াত সেই রাজতুল্য শাসক কবির গুনাহ-খাতা মাফ হোক।
রাজতুল্য শাসক, আর কবি—দুটোই একসঙ্গে, তাহলে তিনি কি কবি রাজ, তথা কবিরাজ ছিলেন? ব্যাকরণের নিয়মে তো তা-ই হওয়ার কথা! কিন্তু ঐতিহাসিক বিবর্তনের ভেতর দিয়ে আজ তার অর্থ পরিবর্তিত হয়ে গিয়ে দেশীয় চিকিৎসাশাস্ত্রমত চিকিৎসক। আর সেখান থেকে কিছুটা বিকৃত হয়ে, এমন ‘ভণ্ড চিকিৎসক’ বা ‘হাতুড়ে ডাক্তার (quack 'doctor')’-এর অর্থে ব্যবহৃত যারা লোকবিশ্বাসে জিনের আমল, জাদুটোনা দিয়ে জগতের তাবৎ সমস্যার ‘সমাধান’, বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে দেয়। সাধারণত মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে। কেউ কেউ আবার ধর্মগুরু সেজে।
সেই কবিতা লেখা রাষ্ট্রপ্রধান দেশের সমস্যা সমাধানে জিনের আমল, জাদুটোনা প্রভৃতিতে ব্যাপৃত হয়েছিলেন কি না জানা নেই; কিন্তু তার জাদুতে শুনেছি অনেকেই তার প্রতি পতঙ্গবৎ আকর্ষিত হয়ে অঙ্গার হন, আর তার আমলে অনেক মহলে বহু জিন-ভূতের আবির্ভাব হয় বলেও প্রতীয়মান। তার কাল বিগত হয়েছে, কিন্তু অন্য পর্যায়ে আজ দেশ ভণ্ড ও নির্ভণ্ড হাজার হাজার কবিরাজে ছেয়ে গিয়ে সরলমতি কুসংস্কারাচ্ছন্ন জনগণের অর্থ ও জীবন নাশ করছে বলে শুনছি। এর কী বিহিত হতে পারে?
এখানে বিহিতের জন্য প্রথমেই বোঝা দরকার ‘কবি’ আর ‘রাজ’, ‘কবিরাজ’ শব্দটির এই দুই মূলকে বুঝে, ‘কবিরাজ’ শব্দের মূলার্থ, আর তার বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তার আজকের অর্থ ও অবস্থায় পর্যবসিত হওয়ার কাহিনিটিকে।
কবি
মূলত কবির অর্থ ছিল—ঈশোপনিষদের ৮ম মন্ত্রে যা বিধৃত, তাই—‘আত্মপ্রতিষ্ঠ সর্বোচ্চজ্ঞানী’। উপনিষদে তো তা মূলত স্রষ্টাকেই, বা স্রষ্টার অবতার—তথা তার গুণপ্রকাশক—ব্রহ্মকেই নির্দেশ করতে বলা হয়। সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই যারা স্রষ্টার সর্বোচ্চজ্ঞান ও আত্মসম্মানমূলক স্বনির্ভরতার গুণের প্রতিফলক প্রাজ্ঞ দৃষ্টিসম্পন্ন, তথা ‘ঋষি’-বৎ, তাদেরই ‘কবি’ বলে জানা ও ভক্তি করা হতো।
খোদ ‘কবি’ শব্দটিই সম্ভবত ঐতিহাসিক ব্রহ্মের বাবিলনীয় আদিনিবাসে প্রচলিত প্রাচীন সেমিটিক ভাষা, যা থেকে ‘ব্রহ্মী’র উদ্ভব, তার শব্দ ‘ক্বওয়ী’ বা ‘ক্ববি’—অর্থাৎ ‘শক্তিমান’ থেকে এসেছে। অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতামূলক জ্ঞানে সর্বোচ্চ আত্মপ্রতিষ্ঠায় যে শক্তি, সেই শক্তিতে শক্তিমান যিনি, তিনিই কবি। আদতে খোদ, স্বয়ং স্রষ্টা নিজে, আর তার সৃষ্টিতে তার এসব গুণের প্রতিফলনে শক্তিমান যিনি, তাকেই ‘কবি’ বলে ভক্তি ও ভালোবাসায় পূজনীয় করে রাখা হতো সমাজে। বিপদে-আপদে তাদের থেকে বিপদ উত্তরণের পথনির্দেশনা চাওয়া হতো, সাহায্যরূপে।
মূলার্থের সেই কবির ওইসব গুণের কারণে, কালে ‘কবি’ শব্দটির অর্থ হয়ে দাঁড়ায়—জ্ঞানী, পণ্ডিত, দার্শনিক এমন ঋষিবৎ ব্যক্তি, যার কাছ থেকে সমাজের বিপদগ্রস্তরা পথনির্দেশনা ও সাহায্য চাইত।
সেরকম কবি আজ কোথায়! আত্মপ্রতিষ্ঠার পরিবর্তে পরনির্ভর, সরকারের বা বিদেশি ‘সাহায্য’ সংস্থার উচ্ছিষ্টের ওপর নির্ভর করা আজকের গৃহপালিত কবিদের সর্বোচ্চ আর জ্ঞানী হওয়ার সুযোগটাই তো নেই, দাসানুদাসের সে ভাগ্য হয় না। সমাজকে বিপদে-আপদে পথনির্দেশনা দেওয়ার মতো পরনির্ভরতামুক্ত স্বাধীনচেতা জনগণমননন্দিত কবি আজকের যুগে খুবই বিরল। কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেরকম কবিরই এক উদাহরণ।
কিন্তু অতীতের সেরকমের কবিদের কাছে লোকে পথনির্দেশনা ও সাহায্য চাইত। একসময় তা চাইতে লাগল সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিপদাপদ থেকে, তথা অসুখ-বিসুখ থেকে উদ্ধারের জন্য। ফলে ক্রমেই কবিদের ভেতর বেশি চাহিত ও সম্মানিত হয়ে ওঠেন চিকিৎসাশাস্ত্র, তথা ‘আয়ুর্বেদ’-এর পণ্ডিত-প্রাজ্ঞ জ্ঞানীরা।
এ ধরনের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের পাণ্ডিত্যের জ্ঞানী, তথা ‘কবি’দের ভেতর ‘সর্বোচ্চ’—তথা ‘শিরোধার্য’, তথা ‘রাজ’—মনে করে, ‘কবিদের রাজ’, বা ‘কবি-রাজ’ বলতে শুরু করে মধ্যযুগে।
কবিরাজ
‘রাজ’ শব্দটি মূলে, সম্ভবত মনুষ্যকুলের বাবিলনীয় আদিনিবাসে প্রচলিত প্রাচীন সেমিটিক ভাষার শব্দ ‘রা’স’ বা ‘রা’সন’—অর্থাৎ ‘মাথা’ বা শির থেকে এসে—শিরোধার্যরূপে ব্যবহৃত হয়।
‘রাজ’ নিয়ে ভগবৎগীতার কথা—‘পরম্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ’, অর্থাৎ ‘রাজ’ হলেন সেই ঋষি যিনি গুরু-শিষ্য-পরম্পরায় এই জ্ঞান অর্জন করে ধারণ করেন। অর্থাৎ, লোকে সর্বশ্রেষ্ঠ ‘কবি’ হিসেবে ‘কবিরাজ’ বলতে শুরু করে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসায় পরঙ্গম জ্ঞানী পণ্ডিতদের।
আয়ুর্বেদীয় পাণ্ডিত্যে অসুখ আর তার চিকিৎসাপূর্বক সুখ দান দেখা হয় তিন পর্যায়ে। এক. ‘আধ্যাত্মিক’—অর্থাৎ, ‘আত্ম’, বা ‘নিজ’ শরীরের বিভিন্ন উপাদানের সাম্যাবস্থা নষ্ট হয়ে সৃষ্ট অসুখ নিরাময়ে সুখ। দুই. ‘আধিভৌতিক’—রোগজীবাণুর আক্রমণ, হিংস্র পশুর আক্রমণ, অস্ত্র দ্বারা আঘাত, দুর্ঘটনা থেকে সৃষ্ট অসুখ নিরাময়ে সুখ। তিন. আধিদৈবিক—বিভিন্ন রকমের ভূত-প্রেতের আক্রমণে সৃষ্ট অসুখ নিরাময়ে সুখ।
একসময় প্রথম ধরনের রোগ সারানো চিকিৎসাশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ দার্শনিকদের সাধারণভাবে ‘কবি’—আর দ্বিতীয় প্রকারের রোগ সারানোদের বৈদ্য বলা হলেও—তৃতীয় প্রকারের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মনে করা হয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের ‘কবি’, তথা জ্ঞানী, আর তাই তাদের বলা হয় ‘কবিরাজ’।
আজও বাংলাদেশে এরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে—প্রকৃতই নির্ভরযোগ্য গুরু-শিষ্য জ্ঞান-পরম্পরায় শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই স্রেফ অভিনয়সর্বস্ব ঝাড়-ফুঁক ইত্যাদি দিয়ে এরা জিন-ভূত ইত্যাদি দ্বারা সৃষ্ট বলে মনে করা বা বলা ব্যক্তি বা তার পরিবেশ-পরিস্থিতিগত অসুবিধার চিকিৎসার ভান করে। প্রতারণার মাধ্যমে সরলমতি জনগণের টাকাকড়ি হাতিয়ে নেয়। এর ফলে এসবের প্রকৃতই চিকিৎসক যারা, তাদের সম্পর্কে সমাজে ভ্রান্তিমূলক ধারণা সৃষ্টি হয়ে তাদের বিশেষজ্ঞতাকে নিছক কুসংস্কার বলে বাতিল করে দেওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি করে অনেকের ভেতর।
তাতে ঐতিহ্যবাহী দেশীয় চিকিৎসাপদ্ধতির এত দিনে ‘হেকিমি’-সহ নানা নবতর সংস্করণে উত্তীর্ণ এমন কিছু দিকের বিশেষজ্ঞতা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, যার কোনো বিকল্প আমদানি করা বিদেশি, তথাকথিত ‘পাশ্চাত্য’ চিকিৎসাপদ্ধতিতে নেই।
প্রকৃতই ঋষিরূপ পথনির্দেশক দার্শনিক ‘কবি’ আর প্রকৃতই রাজর্ষিরূপ জনহিতৈষী চিকিৎসক, ‘কবিরাজ’—উভয়ই দরকার। বাঙ্গলার জাতীয় ঐতিহ্যে সগর্ব নবজাগরণে।
লেখক: প্রফেসর ড. আহমদ আনিসুর রহমান, শিক্ষাবিদ, লেখক, সাংবাদিক, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ভাষাবিদ হিসেবেই বেশি পরিচিত হলেও চিত্র ও নাট্যশিল্পী ছাড়াও ঘটনার চক্রে তিনি দেশে-বিদেশে প্রকাশিত কবি এবং দেশজ পদ্ধতির চিকিৎসাশাস্ত্রে আনুষ্ঠানিক পড়াশোনার মাধ্যমে তার বিশেষজ্ঞতাও অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও গবেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

