ভারত থেকে ভূমধ্যসাগর

ইরানকে ঠেকাতে নতুন জোটের উদ্যোগ ইসরাইলের

ইরানকে ঠেকাতে নতুন জোটের উদ্যোগ ইসরাইলের

ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্রিস, সাইপ্রাস ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক জোট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া উচিত ইসরাইলের। বুধবার রাইখম্যান ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হার্জলিয়া সম্মেলনে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আমির বারাম এমন একটি কৌশলের কথা তুলে ধরেছেন।

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে ইসরাইলের বছরের পর বছর ধরে চলা একটি আলোচনাই আবারও সামনে এসেছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হার্জলিয়া সম্মেলনে বারাম ‘প্রয়োজন অনুযায়ী সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভারত থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে গ্রিস ও সাইপ্রাস পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বৃহত্তর জোট এবং কঠোর স্বার্থ ও অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের নতুন নিরাপত্তা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতাভুক্ত দেশগুলোর মাধ্যমে ইসরাইলের পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার ধারণাটি ইসরাইল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গত এক দশকে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের উষ্ণতা বৃদ্ধি দেশটির পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে মহড়া ও বৈঠক এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানিও এর অংশ।

সম্প্রতি গ্রিসের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এথেন্স একটি শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। এর নকশা অনেকাংশেই ইসরাইলের সমন্বিত ও বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আদলে তৈরি, যা সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষার আদলে নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

গ্রিসের সংবাদমাধ্যম একাথিমেরিনি সোমবার জানিয়েছে, ‘গ্রিস ইসরাইলের সঙ্গে একটি বড় ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষা চুক্তির অনুমোদন নিশ্চিত করার পথে এগোচ্ছে। সরকার পরিকল্পিত ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ প্রতিরক্ষা ছাতার আওতায় ইসরাইলি প্রযুক্তিতে তৈরি ব্যবস্থা কিনতে ৩ বিলিয়ন ইউরোর চুক্তির অনুমোদন চাইছে।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘এই কর্মসূচির আওতায় রাফায়েলের স্পাইডার অল-ইন-ওয়ান ও ডেভিডস স্লিং ব্যবস্থা এবং ইসরাইল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের (আইএআই) তৈরি বারাক এমএক্স ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে গ্রিসের প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।’ এর আগে রোমানিয়ার কাছেও রাফায়েল তাদের স্পাইডার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিক্রি করেছে।

গ্রিস, ভারত ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার শিকড় কয়েক দশক আগের। পানি গরম করার মতোই এটি ছিল ধীরগতির একটি প্রক্রিয়া। তবে দীর্ঘদিনের সেই ধীর প্রক্রিয়া এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে। গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন বাড়ছে, তেমনি ইসরাইল-ভারত সম্পর্কও আরো দৃঢ় হচ্ছে।

তবে বড় প্রশ্নটি হতে পারে ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সম্পর্ক কোন দিকে যাচ্ছে তা নিয়ে। এসব দেশ আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ। কিন্তু ৭ অক্টোবরের হামলার পর শুরু হওয়া ইসরাইল-হামাস যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

কিছু বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও উপসাগরীয় দেশগুলো সাধারণত ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে আমিরাত কোনো ঝুঁকি নেয় না। ইয়েমেন, লিবিয়া, সুদান, হর্ন অব আফ্রিকা এবং অন্যান্য অঞ্চলে বিভিন্ন পররাষ্ট্রনীতি উদ্যোগে তারা জড়িয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের কিছু বিষয়ে আমিরাত হতাশও হয়েছে।

আমির বারাম বলেন, সাম্প্রতিক ‘যুদ্ধ এই অঞ্চলের প্রতিটি পক্ষের কাছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মূল্য আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। এর ফলে ভারত থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে গ্রিস ও সাইপ্রাস পর্যন্ত একটি বৃহত্তর জোট গড়ে তোলার অভিন্ন স্বার্থ তৈরি হয়েছে।’

বারামের মতে, ইরান তার সামরিক সক্ষমতা আরও দ্রুত বাড়াতে পারে। তাই তিনি ইসরাইলকে ‘একটি নতুন আঞ্চলিক কাঠামোর’ মাধ্যমে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ‘আমাদের কৌশলগত মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশ।’

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে এমন উদ্যোগের পক্ষে কথা বলে আসছেন। তিনি নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ধারণা তুলে ধরেছেন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মাধ্যমে ইসরাইল ও ভারতকে সংযুক্ত করার একটি কাঠামোর কথাও বলেছেন। তবে ইসরাইলের নেতৃত্বের জন্য সমস্যা হলো, ৭ অক্টোবরের আগের সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই বদলে গেছে।

রিয়াদ চায়, ইসরাইল আরো মধ্যপন্থী রাজনীতি অনুসরণ করুক এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আরো বেশি সম্পৃক্ত হোক। পশ্চিম তীরে সহিংসতা, সিরিয়ায় হামলার বিষয়ে ইসরাইলের কর্মকর্তাদের হুমকি কিংবা ভবিষ্যতে মিসরের মতো ‘সুন্নি’ শক্তির সঙ্গে ইসরাইলের সংঘাতে জড়ানোর আলোচনা—কোনোটিই রিয়াদ ভালোভাবে দেখছে না। গাজায় ‘বসতি’ স্থাপনের আলোচনা নিয়েও রিয়াদ সম্ভবত বিরক্ত।

তাই সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চল হয়ে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, যদি ইসরাইলি নেতারা বাণিজ্যের চেয়ে সংঘাতকেই বেশি গুরুত্ব দেন। সেক্ষেত্রে রিয়াদ জর্ডান, সিরিয়া ও তুরস্ক হয়ে কিংবা অন্য কোনো পথে বাণিজ্য করিডর পরিচালনার পথ বেছে নেবে।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ভিত্তি সামরিক জোট নয়, স্থিতিশীলতা ও শান্তি

ইসরাইলের আঞ্চলিক কৌশলের ক্ষেত্রে এটিই সবসময় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর নেগেভ ফোরাম, আই২ইউ২ (ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্র) এবং এন৭ উদ্যোগের মতো আঞ্চলিক ধারণাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়—এসবের ভিত্তি হলো স্থিতিশীলতা, একীভূতকরণ ও শান্তি। এগুলো কোনো সামরিক জোট নয়।

এখানেই গ্রিস-সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক এবং উপসাগরীয় দেশ ও ভারতের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ভারত ও উপসাগরীয় দেশগুলো কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না। অন্যদিকে, তুরস্ক নিয়ে উদ্বেগ থাকায় গ্রিস ও সাইপ্রাস প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও তাদের ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিকে বিবেচনায় রাখতে হবে।

বারাম প্রতিটি দেশ এই সম্পর্ক থেকে কী প্রত্যাশা করে, তা গভীরভাবে বোঝার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রাদেশিক দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান মার্কিন নীতিকে বিচার করার সামর্থ্য রাখি না। ইসরাইলের কেউ কেউ যেটিকে দুর্বলতা বা ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন—মাঠপর্যায়ের প্রতিটি সতর্ক সংকেত উপেক্ষা করা—ওয়াশিংটনে সেটিকে পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক মনোযোগের যুগে ঠান্ডা মাথায়, হিসাব করে ও বাস্তবসম্মত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের মধ্যে পার্থক্য হুমকি বোঝার ক্ষেত্রে নয়, অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে। আমাদের কাছে ইরান অস্তিত্বের জন্য হুমকি; আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ। তাদের মূল উদ্বেগ চীন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল। আমরা তেহরানকে ভাবি, তারা তাইওয়ানকে ভাবে।’

বারামের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতি ইরানের হুমকি ভারত থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে গ্রিস ও সাইপ্রাস পর্যন্ত একটি বৃহত্তর জোট গঠনের অভিন্ন স্বার্থ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ‘ইসরাইলের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রমাণিত সামরিক অভিজ্ঞতা ও প্রতিরক্ষা খাতে উদ্ভাবনের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক শক্তি যুক্ত হলে নতুন একটি নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক ফ্রন্ট তৈরি করা সম্ভব।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের কৌশলগত অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের অংশীদারিত্বের বিকল্প নয়। তবে এটি ইসরাইলকে কৌশলগতভাবে আরো বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ দেবে। পাশাপাশি আমাদের কৌশলগত ভিত্তিও বহুমুখী হবে।’

বারামের কৌশলগত আলোচনা এমন একটি বিষয় সামনে এনেছে, যার ঘাটতি কখনো কখনো প্রকটভাবে দেখা গেছে—বড় চিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অন্যান্য দেশ কী চায় এবং তারা পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

জেরুজালেমের কিছু রাজনীতিকের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইসরাইলকে ভবিষ্যতে একাধিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে—এমন একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। ‘সুন্নি’ দেশগুলো, সিরিয়া, মিসর ও তুরস্কের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর কথাও বলা হচ্ছে। এসব বক্তব্য ইসরাইলের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূমিকার জন্য কোনোভাবেই সহায়ক নয়।

বেশির ভাগ দেশই অনন্তকাল ধরে চলা যুদ্ধে জড়াতে চায় না। একইভাবে, তারা ইসরাইলের ‘সুপার-স্পার্টা’র সঙ্গে অংশীদারিত্বও চায় না।

তারা হয়তো এথেন্সের মতো একটি অংশীদারকে পছন্দ করবে—তবে সেই এথেন্স, যুদ্ধের আগে; সেই সময়ের এথেন্স, যখন তার স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন নেতারা দেশটিকে ধ্বংসাত্মক পেলোপনেশীয় যুদ্ধে জড়িয়ে দেননি।

যুদ্ধের আগে এথেন্সের কৌশল মোটামুটি সঠিক ছিল। যুদ্ধের পর এথেন্সের পতন ঘটে। আর সময়ের সঙ্গে স্পার্টাও কার্যত হারিয়ে যায়। বৃহত্তর কৌশল নিয়ে যারা চিন্তা করেন, তারা নিশ্চয়ই ইসরাইলের ভবিষ্যৎকে এমন দেখতে চাইবেন না।

ইসরাইলের জন্য বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল হলো পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত সম্পর্ক গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্রও এসব বিষয়ে কাজ করছে—লিবিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগসহ অন্যান্য বৈশ্বিক ইস্যুতেও। তাই ইসরাইলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করা লাভজনক; আঞ্চলিক সংঘাত আরও বাড়ানো নয়।

জেরুজালেম পোস্টের বিশ্লেষণ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন