নেত্রকোনার হাওরে কমছে দেশীয় মাছ, বিলুপ্তির পথে বহু প্রজাতি

নেত্রকোনার হাওরে কমছে দেশীয় মাছ, বিলুপ্তির পথে বহু প্রজাতি

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, মদন ও খালিয়াজুড়ি উপজেলার হাওর ও খাল-বিলে দিন কমছে মিঠা পানির দেশীয় প্রজাতির মাছ। অনেক জাত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরও বেশ কিছু দেশীয় মাছ বিলুপ্তির পথে। হঠাৎ হঠাৎ বিভিন্ন নদী ও বিলে দেখা মিললেও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে এসব মাছের প্রজনন।

বিজ্ঞাপন

বিলুপ্তির পথে থাকা বড় মাছের মধ্যে রয়েছে চিতল মাছ, বাঘাইড় মাছ, বানেহর মাছ, বেউশ মাছ, শিলং মাছ, রিটা মাছ। ছোট মাছের মধ্যে রয়েছে রাণী মাছ, কাজলী মাছ, গিলাছাকি, বাচা, চিংড়ি মাছসহ বেশ কিছু সুস্বাদু ও জনপ্রিয় মাছ।

এসব মাছ গত ৮ থেকে ১০ বছর আগেও নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুড়ি ও পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর, দিরাই, তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন নদী ও বিলে ধরা পড়তো। এসব মাছ বিক্রি হতো মোহনগঞ্জ মাছের মৎস্য আড়তে। পরে তা ঢাকার সুয়ারিঘাট, কাওরান বাজার, রামপুরাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা মাছ কিনে নিয়ে যেত।

গত এক যুগ ধরে ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করে বর্তমানে এসব মাছ আর হাওরে পাওয়া যায় না। যার ফলে মানুষ চাষের মাছের উপর নির্ভর করছে।

হারিয়ে যাওয়া মাছের জাত গত কয়েক বছরের মধ্যে আড়তে দেখা মেলেনি। তবে দু-একটা পেলেও তা সৌখিন মানুষ চড়া দামে কিনে নিয়ে যায়।

সুস্বাদু ও দামি দেশীয় মাছ হওয়া সত্ত্বেও এ জাতের মাছ রক্ষায় কোনো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেই সরকারের তথা মৎস্য বিভাগের। অন্যান্য যে মাছগুলো প্রায় বিলুপ্ত সেসব মাছ রক্ষায় এখনই সঠিক উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন মৎস্য গবেষকগণ।

জেলেদের ভাষ্য

খুরশিমূল গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বয়সী জেলে নিখিল বলেন, হাওর ও নদীর গভীরতা দিন দিন কমছে। খাল-বিল দিন দিন উঁচু জমিতে পরিণত হচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে বৃষ্টির পানির সাথে বালু এসে সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন নদী-বিল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। প্রায় অর্ধশত জাতের দেশীয় মাছ গভীর পানিতে থাকে। পানি কম হওয়ায় হাওরের অতি জনপ্রিয় মাছগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

আড়তদার ও ব্যবস্থাপকের বক্তব্য

মোহনগঞ্জ মৎস্য আড়তদার মালিক সমিতির নেতা মাছুম আহমেদ জানান, বর্তমানে বিভিন্ন কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এসব মাছ। এর মধ্যে চায়না দুয়ারী জাল দিয়ে মাছের পোনা নষ্ট করা, গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করে খাল-বিলের মাছ ধরা, নদীর গভীরতা কমে যাওয়া অন্যতম।

মোহনগঞ্জ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. রিয়াদ মিয়া জানান, হারিয়ে যাওয়া মাছ রক্ষায় মাছের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরকারের গবেষণা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ, প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। হাওরের সবচেয়ে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় মাছগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য জনগণের মধ্যে সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং মাছ রক্ষার আইন আরও বেশি সুদৃঢ় করা দরকার। এসব মাছ দেশের সম্পদ। হাওরে প্রতি বছর বর্ষায় প্রাকৃতিকভাবে শত কোটি টাকার মাছ ধরা পড়ে যা দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধিতে অবদান রাখে।

বিলুপ্তির কারণ ও করণীয়

নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, জমিতে অপরিকল্পিত বিষ-কীটনাশক প্রয়োগ, গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করে মাছ ধরা, চায়না দুয়ারী ও কারেন্ট জাল ব্যবহার করে মাছ ধরা, মাছের প্রজননের জন্য আশ্রয়স্থল অনিরাপদসহ বিভিন্ন কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই হাওরের মিঠা পানির দেশীয় মাছ রক্ষায় সরকার ও হাওরবাসীর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অনিক রহমান জানান, কৃষিকাজে অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহার, চায়না দুয়ারী জাল ব্যবহার, নদী শুকিয়ে মাছ ধরা, বিলের পানিতে গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষেধ। কিছু অসাধু ব্যক্তি এর ব্যবহার করায় হাওরে মাছ কমে গেছে। এ বছর উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একাধিক অভিযান করে অর্ধকোটি টাকা মূল্যের চায়না দুয়ারী ও কারেন্ট জাল জব্দ করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অভিযান অব্যাহত থাকলে এবং হাওরে নদী-খাল খন করে মাছের প্রজনন স্থান নিশ্চিত করতে পারলে হারিয়ে যাওয়া মাছের আবার দেখা মিলবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন