ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে আয়োজিত ‘ফেলানীকে উদ্দেশ্য করে খোলা চিঠি লিখন প্রতিযোগিতা-২০২৬’-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে নগদ অর্থ, সনদপত্র ও সম্মাননা ক্রেস্ট বিতরণ করা হয়।
শনিবার ডাকসুর সভাকক্ষে এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ডাকসুর সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মুহা. মহিউদ্দিন খান।
প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারীকে ৫ হাজার টাকা, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারীকে ৩ হাজার টাকা এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারীকে ২ হাজার টাকা নগদ পুরস্কার দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরও ১৩ জন বিজয়ীকে সনদপত্র ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ডাকসুর ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ বিভিন্ন ব্যক্তি আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সহযোগিতা না করলে এ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান এবং প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থ আলোর মুখ দেখত না।
ফেলানীকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘শহীদ ফেলানী আমাদের হৃদয়ের কাঁটাতারে ঝুলে থাকা এক রক্তজবার নাম।’ তাঁর ভাষ্য, ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি একটি শিশুকে হত্যার পর কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখার ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড ছিল না, বরং তা বাংলাদেশের মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বাস্তবতা ও আধিপত্যবাদের নির্মম প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
সীমান্ত হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে মুসাদ্দিক আলী বলেন, ফেলানীসহ প্রতিটি সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের বিচার আদায়ে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সরকার এ ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি এবং বর্তমান সরকারের কাছেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন তিনি।
গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে সীমান্ত হত্যা, কূটনৈতিক সম্পর্ক, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য বণ্টনের মতো বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেওয়ার প্রত্যাশা ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক দপ্তরের বাজেট প্রসঙ্গে মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রস্তাবিত বরাদ্দকে তিনি প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম মনে করায় তা গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় স্মারকগ্রন্থ প্রকাশসহ প্রায় ২০টি প্রকাশনার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, সীমিত সম্পদ ও বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করছে বর্তমান ডাকসু। ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত আয়োজন নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীদেরও সোচ্চার থাকার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাকসুর এজিএস মুহা. মহিউদ্দিন খান বলেন, ফেলানী দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ন্যায্য অধিকার রক্ষার সংগ্রামের একটি প্রতীক। তাঁর আত্মত্যাগকে স্মরণে রেখে সীমান্ত হত্যা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে।
তিনি বলেন, ফেলানীর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো জাতি আলোড়িত হলেও সে সময়ের সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও ফেলানীর ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি পুরোপুরি সমাধান হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সীমান্ত হত্যা নিয়ে সংজ্ঞাগত বিতর্কের পরিবর্তে ন্যায়বিচার ও দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মহিউদ্দিন খান বলেন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘যারা জীবন দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা দিয়ে গেছেন, তাঁদের স্মরণে রাখাই আমাদের দায়িত্ব।’ ফেলানীর স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধরে রাখা এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই ডাকসু এ ধরনের আয়োজন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সুফিয়া কামাল হল সংসদের সাহিত্য সম্পাদক সানজিদা আক্তার শ্রেয়সী বলেন, ফেলানী এ যুগের একজন হয়েও আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের এমন এক প্রতীক, যার আত্মত্যাগ দেশের সার্বভৌমত্বের মর্যাদা রক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা দেয়।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক হানাহানি ও সংঘাতের কারণে প্রায়ই সাধারণ মানুষকে জীবন দিতে হয়। তাই রক্তপাত ও মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে সবাইকে সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের ভিপি আহসান হাবীব ইমরোজ বলেন, ফেলানীর আত্মত্যাগ দেশের সার্বভৌমত্ব ও ন্যায্য অধিকার রক্ষার সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক। তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে সীমান্ত হত্যা ও যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণদের সোচ্চার হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আসফাকউল্লাহ আসিফের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য আনাস ইবনে মুনির ও আফসানা আক্তার, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের ভিপি আহসান হাবীব ইমরোজ, সুহাইল মাহদীনসহ ডাকসু ও বিভিন্ন হল সংসদের নেতৃবৃন্দ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

