সন্ধ্যার পরও বাড়ি ফেরেনি অটোরিকশাচালক ১৬ বছর বয়সি সাকিবুল। পরিবারের কাছে বিষয়টি প্রথমে অস্বাভাবিক মনে হলেও হয়তো কোনো যাত্রী নিয়ে দূরে গেছে—এমন আশাই ছিল। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আশা ফিকে হতে থাকে। পরদিন খবর আসে, রাস্তার পাশে পড়ে আছে তার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।
আশপাশে খুঁজতে গিয়ে পাটক্ষেতের ভেতরে মিলল মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কিশোর সাকিবুল ইসলামের নিথর দেহ। পাশে পড়ে থাকা রিকশা, ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, গায়ে আঘাতের চিহ্ন—সব মিলিয়ে শুরু হয় এক অন্ধকার হত্যারহস্য। কেন খুন হলো কিশোরটি? অটোরিকশা কি ছিনতাইয়ের জন্য নেওয়া হয়েছিল? নাকি খুনি ছিল তারই কোনো যাত্রী?
প্রথম কয়েক দিনে এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না। বরং অটোরিকশা ও মোবাইল ফোন ঘটনাস্থলে পড়ে থাকায় ছিনতাইয়ের তত্ত্বও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। হত্যাকারীকে চিহ্নিত করার মতো প্রত্যক্ষদর্শীও ছিল না। এমন অবস্থায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মানিকগঞ্জ ছায়া তদন্ত শুরু করে।
অবশেষে আট দিনের মাথায় সেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য জট খুলে যায়। সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গ্রেপ্তার হয় আসাদুজ্জামান আসাদ (৩৪) নামের এক ব্যক্তি। পিবিআইয়ের ভাষ্য, এই আসাদই ছিলেন সাকিবুলের অটোরিকশার শেষ যাত্রী। আর তার জিজ্ঞাসাবাদেই বেরিয়ে আসে, কোনো বড় অপরাধের পরিকল্পনা নয়, ভাঙা সড়কের ঝাঁকুনি নিয়ে সামান্য বাগবিতণ্ডা থেকেই কীভাবে এক কিশোরের জীবন থেমে গেল।
মানিকগঞ্জ সদরের মিতরা এলাকার রহমত আলীর ছেলে সাকিবুল ইসলাম অসুস্থ বাবার অটোরিকশাটি চালিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করত। প্রতিদিনের মতোই গত ৩০ জুন গোবিন্দপুর গ্রাম থেকে রিকশাটি নিয়ে বের হয়েছিল তিনি। সন্ধ্যা নামায় লক্ষ্য ছিল রাতে বাড়ি ফেরার পথে কিছু বাড়তি টাকা আয়ের। কিন্তু রাত গভীর হতে থাকলেও সাকিবুলের দেখা মিলছিল না।
বারবার ফোন করেও পাওয়া যাচ্ছিল না।
পরদিন ভোরে মানিকগঞ্জের নবগ্রাম কাশতা এলাকার একটি নির্জন পাটক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে কৃষকরা চমকে ওঠেন। ঘন সবুজ পাটগাছের আড়ালে কাদা-মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে এক কিশোরের নিথর দেহ। খবর পেয়ে পুলিশ এসে লাশটি উদ্ধার করে। নিহত কিশোর আর কেউ নয়, নিখোঁজ সাকিবুল।
চমকপ্রদ বিষয় হলো, সাধারণ অটোরিকশা কিংবা চালকের ফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে যেসব নির্মমতা ঘটে, এখানে তার কোনো চিহ্নই ছিল না। সাকিবুলের হাতছোঁয়া দূরত্বেই অক্ষত অবস্থায় পড়েছিল তার রিকশাটি। পকেটে মিলল নিহতের নিজের মোবাইলও। যদি ছিনতাই উদ্দেশ্য না হয়, তবে কার কী শত্রুতা থাকতে পারে এই কিশোরের সঙ্গে? উত্তর খোঁজা শুরু হতেই মামলাটি রূপ নেয় এক গভীর গোলকধাঁধায়।
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে হাজির হয় পিবিআই মানিকগঞ্জ ইউনিটের একটি চৌকস দল। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই, নেই কোনো ফেলে যাওয়া প্রাণঘাতী অস্ত্র। তদন্তকারীদের চোখ আটকে যায় পাটক্ষেতের নরম মাটিতে চেপে বসে থাকা একজোড়া পুরুষের স্যান্ডেলের দিকে। একটি স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়ে পড়েছিল কাদার ভেতর। অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেল, এই স্যান্ডেল নিহত সাকিবুলের নয়।
হত্যার ক্লু মিলল যেভাবে
পিবিআই ধরে নেয়, ঘাতক ধস্তাধস্তির সময় কিংবা তড়িঘড়ি করে পালানোর মুহূর্তে নিজ পায়ে থাকা স্যান্ডেলটি ফেলে গেছে। কিন্তু শুধু একজোড়া স্যান্ডেল দিয়ে হাজার মানুষের ভিড়ে খুনিকে চিহ্নিত করা অসম্ভব। তদন্ত দল যখন প্রায় হতাশ, তখন পিবিআইয়ের এক তরুণ কর্মকর্তা প্রস্তাব করলেন—এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হোক।
আশপাশের সবগুলোর রেকর্ড সংগ্রহ করে বসে পড়লেন বিশ্লেষকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটেজ দেখে ক্লান্ত, হতাশ—কিন্তু শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ায় ভাগ্য। পাটক্ষেত থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি মুদি দোকানের সিসিটিভির ফুটেজে ধরা পড়ে এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। সেদিন বিকালে সাকিবুলের অটোরিকশায় উঠছেন একজন মাঝবয়সি পুরুষ। তার পোশাক-আশাকে কিছুটা শহুরে চেহারা।
ক্যামেরার কোণ তেমন স্পষ্ট নয়, কিন্তু ফুটেজটি যে মূল চাবিকাঠি হতে পারে—তা বুঝতে পারেন পিবিআই টিম। তৎক্ষণাৎ ফুটেজটি স্ক্রিনশট করে বাড়িয়ে দেওয়া হয় ফরেনসিক টিমের কাছে। তারা সেখান থেকে যাত্রীর মুখমণ্ডলের একটি কাটআউট তৈরি করেন। সঙ্গে সঙ্গে সেটি ছড়িয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে। শুরু হয় ছায়াতদন্ত।
প্রযুক্তির সহায়তায় ডিজিটাল অনুসন্ধানের দ্বিতীয় ধাপে সাকিবুল শেষ কোন দিক থেকে কোন দিকে রিকশা চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তা বের করতে সড়কটির প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকার বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও বাজারের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়।
সাইবার ট্র্যাকিং ও স্থানীয় সোর্সের মাধ্যমে একপর্যায়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, সিসিটিভি ফুটেজে দেখতে পাওয়া ওই ব্যক্তি হেমায়েতপুরের একটি হোটেলের সহকারী ব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান আসাদ। অবশেষে গত ৮ জুলাই সন্ধ্যায় সাভারের হেমায়েতপুরের যাদুরচর মাদরাসা গেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ৯ জুলাই মানিকগঞ্জে পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়।
তুচ্ছ বচসা থেকে খুন
জিজ্ঞাসাবাদে আসাদ যে স্বীকারোক্তি দেয়, তা শুনে অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তারাও স্তব্ধ হয়ে যান। সাধারণ এক তুচ্ছ বচসা কীভাবে এমন নৃশংসতায় রূপ নিতে পারে, তা যেন এক অবিশ্বাস্য ভৌতিক গল্প! মানিকগঞ্জ সদরের গড়াই নতুনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান সাভারের হেমায়েতপুরে একটি আবাসিক হোটেলের সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন।
ঘটনার দিন বিকালে হেমায়েতপুর থেকে গ্রামের বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে সাকিবুলের রিকশায় উঠেছিল সে। রিকশাটি যখন গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তখন সড়কের খানাখন্দে পড়ে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি হতে থাকে। এতে চরম বিরক্ত হয়ে পেছনে থাকা আসাদ চালক সাকিবুলকে উদ্দেশ্যে করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে।
কিশোর সাকিবুল রিকশা থামিয়ে গালি দেওয়ার প্রতিবাদ জানায়। আর তাতেই অহমে আঘাত লাগে আসাদের।
এই প্রতিবাদ সহ্য করতে না পেরে আসাদ হায়নার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে কিশোরটির ওপর। সাকিবুলকে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তার পাশের পাটক্ষেতের ভেতরে নিয়ে যায়। সেখানে কাদামাটির মধ্যে সাকিবুলকে আঁছড়ে ফেলে বুক ও পিঠে চেপে বসে। সাকিবুল যখন বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিল, ঠিক তখন আসাদ দুই হাতে তার মুখ ও নাক কাদা-মাটিতে চেপে ধরে ঘাড় মটকে দেয়।
তীব্র শ্বাসরোধে মুহূর্তের মধ্যেই নিভে যায় কিশোর সাকিবুলের জীবনপ্রদীপ। হত্যার পর আসাদ সেখান থেকে পালিয়ে যায়। কিন্তু পালানোর তাড়াহুড়োয় একটি স্যান্ডেল ফেলে যান বলে পিবিআই জানায়। সেই ছোট্ট আলামত, একটি সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান মিলেই শেষ পর্যন্ত তদন্তকারীদের পৌঁছে দেয় সন্দেহভাজনের কাছে।
আসাদুজ্জামান গত ৯ জুলাই গ্রেপ্তার হলে পুরো এলাকায় স্বস্তি ও একই সঙ্গে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। গ্রামবাসী জানায়, সাকিবুল অত্যন্ত ভদ্র ও পরিশ্রমী একটি ছেলে ছিল। এমন একটি নিরীহ কিশোরকে শুধু রাস্তার ঝাঁকুনিকে কেন্দ্র করে হত্যা করা—এই ঘটনা এলাকাবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
ঘটনার পর থেকে সাকিবুলের পরিবার ও এলাকাবাসী আসাদুজ্জামান আসাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন।
সাকিবুলের মা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, আমার সোনার ছেলেটাকে মেরে ফেলল। আমি কীভাবে বাঁচব?
বাবা অভিযোগ করেন, একটা ভাঙা রাস্তার জন্য আমার ছেলেকে খুন করা হলো। প্রশাসন চাইলেই এই রাস্তাগুলো মেরামত করতে পারত, কিন্তু তারা করেনি।
এ বিষয়ে পিবিআইয়ের মানিকগঞ্জ ইউনিটের প্রধান পুলিশ সুপার জয়িতা শিল্পী বলেন, এটি একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। সিসিটিভি ফুটেজ ও একটি স্যান্ডেলের সূত্র ধরে আমরা আসামির কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি। তদন্তে আরো কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে, যা আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


