দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রাজশাহী। সেই ঘাঁটির দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসন রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) ও রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে দলটির পরাজয় বড় ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে। পাশাপাশি রাজশাহী-২ (সদর) ও রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে জয় পেলেও প্রত্যাশিত মাত্রার ভোট আদায় করতে পারেনি দলটি। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংগঠনের দুর্বলতা, দলীয় বিভক্তি এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতিই এই ফলাফলের মূল কারণ।
দীর্ঘদিন বিএনপির শক্ত ভিত্তি হিসেবে পরিচিত রাজশাহী-১ ও রাজশাহী-৪ আসনে দলটির পরাজয় স্থানীয় রাজনীতিতে চমক তৈরি করেছে। এই দুই আসনে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। যথাক্রমে তারা হলেন— মুজিবুর রহমান, ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৭৮৬টি এবং ডা. আব্দুল বারি সরদার, তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ২৪৮ ভোট।
রাজশাহী-১ আসনের বিএনপির তৃণমূল নেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের এলাকায় বিএনপির সমর্থক এখনো আছে। কিন্তু নির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয়ভাবে যে দিকনির্দেশনা দরকার ছিল, তা আমরা পাইনি। কর্মীরা বিভ্রান্ত ছিল। এই সুযোগে প্রতিপক্ষ সংগঠিতভাবে মাঠে নেমেছিল।
রাজশাহী-৪ আসনে ইউনিয়ন পর্যায়ের বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাগমারায় ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির ভোটব্যাংক শক্ত ছিল। কিন্তু এবার আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামতে পারিনি। একাধিক গ্রুপিং ছিল। এতে কর্মীরা ঠিকভাবে কাজ করেনি।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দুই আসনে পরাজয় বিএনপির জন্য বড় ধাক্কা, কারণ এখান থেকেই সাধারণত দলটি বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকে।
রাজশাহী-২ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু পেয়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ ভোট। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর পেয়েছেন ১ লাখ ৩৭০ ভোট। ভোটের ব্যবধান নিয়ে অসন্তুষ্ট বিএনপির স্থানীয় নেতারা বলছেন, সদর আসনে সংগঠনের শক্তি বিবেচনায় ভোটের ব্যবধান প্রায় ১ লাখের বেশি হওয়ার কথা ছিল।
রাজশাহী-৩ আসনে বিএনপির শফিকুল হক মিলন পেয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৮ ভোট। সেখানে জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ পেয়েছেন ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯২৭ ভোট। এখানেও জয় এলেও প্রত্যাশিত ব্যবধান পাওয়া যায়নি বলে মত স্থানীয় নেতাদের। তাদের মতে, পবা-মোহনপুরের মাটি বিএনপির ঘাঁটি। এখানে প্রায় দেড় লাখ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হওয়ার কথা ছিল।
রাজশাহী-২ আসনের এক ওয়ার্ড পর্যায়ের বিএনপি নেতা ফয়াশাল আহম্মেদ বলেন, আমাদের এলাকায় সমর্থক কম নয়। কিন্তু ভোটের দিন অনেক কর্মী মাঠে ছিল না। আমাদের সমন্বয় দুর্বল ছিল। এই কারণেই ভোট কম হয়েছে।
রাজশাহী-৩ আসনের এক থানা পর্যায়ের নেতা মিজানুর রহমান বলেন, জয় পেলেও আমরা সন্তুষ্ট নই। যে ব্যবধানে জেতার কথা ছিল, তা হয়নি। গ্রুপিংয়ের কারণে অনেকে সক্রিয় ছিল না।
রাজশাহী-৫ ও ৬ আসনে বড় ব্যবধানে জয়ের পরও স্বস্তি নেই বিএনপিতে। রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম মণ্ডল পেয়েছেন ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২৫ ভোট। জামায়াত প্রার্থী মাওলানা মনজুর রহমান পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৪৪৫ ভোট।
রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবু সাঈদ চাঁদ পেয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬৭২ ভোট। সেখানে জামায়াত প্রার্থী নাজমুল হক পেয়েছেন ৯২ হাজার ৯৬৫ ভোট।
স্থানীয় নেতারা বলছেন, সাংগঠনিক শক্তি অনুযায়ী ভোট আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল। রাজশাহী-৫ আসনের এক ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি বলেন, মানুষ এখনো আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু ভোটের আগে যে প্রস্তুতি দরকার ছিল, তা আমরা নিতে পারিনি। কর্মীদের মধ্যে আগ্রহ কম ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেন বলেন, রাজশাহী-১ ও ৪ আসনের পরাজয় এবং ২ ও ৩ আসনে কম ভোট প্রমাণ করে, কেবল ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকের ওপর ভর করে রাজনীতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মাঠের রাজনীতি, সংগঠনের সক্রিয়তা ও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক তৌফিক আহম্মেদ বলেন, এটি একটি স্পষ্ট ট্রেন্ড। বিএনপি যদি দ্রুত নিজেদের সংগঠন পুনর্গঠন না করে এবং তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে আরো আসনে এমন ফল দেখা যেতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

