নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের বহু বাসাবাড়ি, পরিবারের সদস্য ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার খবর পাওয়া গেছে। ভোটের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনা ছাড়াও ভোটের রাতেই অন্তত ২১টি সহিংসতার তথ্য তুলে ধরেছে জামায়াত। নির্বাচনে ব্যাপক জয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় বসতে যাওয়া দল বিএনপি নেতাকর্মীরাই এসব সহিংসতা ঘটাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় সারা দেশে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করা সাধারণ মানুষ ও ভোটাররা হামলার শিকার হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে বেশ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তবে পাল্টা কোনো সংঘাতে না জড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সহিংসতাকারীদের মোকাবিলায় মাঠে শক্ত অবস্থান অব্যাহত রাখার কৌশল নিচ্ছে জামায়াত, এনসিপিসহ অন্য দলগুলো। এর প্রথম ধাপ হিসেবে আগামীকাল সোমবার রাজধানীতে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
জামায়াত আমির বলেন, দেরি না করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশ এবং প্রমাণগুলো সংগ্রহ করুন।
এছাড়া গত শুক্রবার রাতে ১১ দলীয় নেতাদের বৈঠকে নেতাকর্মী ও ভোটারদের ওপর হামলা ও বাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমের বিষয়ে আলোচনা ও নিন্দা এবং এসব বন্ধের দাবি জানানো হয়। তা না হলে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে একমত হন নেতারা। এসব ইস্যুতে ১১ দলের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়েও চিন্তা করা হচ্ছে। পরে প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াত আমির বিএনপিকে উদ্দেশ করে এখনই এসব অপকর্ম থামানোর আহবান জানান।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা সম্পর্কে ফেনী-৩ আসনে জামায়াতের পরাজিত প্রার্থী ডা. ফখরুদ্দিন মানিক বলেন, তার নির্বাচনি এলাকায় প্রবাস ফেরত জামায়াতকর্মী দুলালের ওপর বিএনপি নেতা মামুন, জয় ও হাসানের নেতৃত্বে বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফেরা এক প্রবাসীর ওপর এমন প্রাণঘাতী হামলা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ নয়, নিজের সন্তানের ওপর এমন নৃশংস হামলার খবর সইতে না পেরে শনিবার স্ট্রোক করে ইন্তেকাল করেন দুলালের মা। একদিকে সন্তানের আর্তনাদ, অন্যদিকে মায়ের চিরবিদায়Ñএ শোকের বিচার কি আমরা পাব?
দেশের বিভিন্ন স্থানে শুক্রবার পর্যন্ত সহিংসতার তথ্য তুলে ধরে জামায়াতের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে বলা হয়েছে, নির্বাচন শেষ হতে না হতেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে প্রতিহিংসার রাজনীতি। কুয়েট ভিসি থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী, এমনকি রাজনৈতিক মিত্রদের ওপরও হামলার খবর আসছে।
এতে বলা হয়, দিনাজপুরে ছেলের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে (জামায়াতের পোলিং এজেন্ট) বাবাকে মারধর ও বাড়ি পোড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়। পঞ্চগড়ে বিএনপিকর্মীদের হাতে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে অনেকে আহত হন। এনসিপির পরাজিত প্রার্থী সারজিস আলমের অভিযোগে এ তথ্য পাওয়া যায়।
বাগেরহাট-৪ আসনে আল-আমিন নামে এক যুবককে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে। ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার মুন্সীরহাটে জামায়াতকর্মীদের চারটি দোকান ভাঙচুর করেছেন স্থানীয় যুবদল নেতারা।
এদিকে নোয়াখালীর সেনবাগে জামায়াত নেতার ওপর ছাত্রদলকর্মীদের অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। উখিয়ার করম মুহুরীপাড়ায় বিএনপি ক্যাডারদের হামলায় বেশ কয়েকজন রক্তাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
কুড়িগ্রামে ভোট নিয়ে তর্কের জেরে জামায়াত নেতাকে কুপিয়ে জখম করেছে বিএনপিকর্মীরা। খুলনায় ঢাবি শিক্ষার্থীর বাড়িতে আগুন, তার ‘মা-বোনকে’ পিটিয়ে আহত এবং ওই শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। পাটগ্রামে বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বে বাড়িতে ঢুকে মালামাল লুট করা হয়েছে। বরিশালে বাবার রাজনৈতিক (জামায়াত) পরিচয়ের জেরে ছেলের গাড়িতে ছাত্রদলকর্মীদের হামলার ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামে সাবেক শিবির নেতার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। চকরিয়ায় জামায়াত নেতার বাড়িতে বিএনপি ক্যাডারদের দফায় দফায় হামলা এবং কুষ্টিয়ায় এনসিপি নেতার বাসভবনে বিএনপিকর্মীরা হামলা চালিয়েছে।
এছাড়া ফেনী, সিরাজগঞ্জ, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, দিরাই পৌরশহর, বাগেরহাট ও গোপালগঞ্জে বিএনপি নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে জামায়াতের ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটে।
সূত্রমতে, কুমিল্লার লাকসাম-মনোহরগঞ্জে জামায়াতকর্মী শাহজাহানের বাড়িতে বিএনপিকর্মীদের বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। তারা ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ঘরে থাকা নারীদের ওপরও আক্রমণ চালায়।
জামায়াত আমিরের নির্দেশনা
নির্বাচনে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ মানুষের ওপর সহিংস ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, এ দেশে আর কখনো ভয়, দমনপীড়ন বা সন্ত্রাসের রাজনীতি ফিরে আসতে দেওয়া হবে না, কারো পক্ষ থেকেই নয়।
গতকাল ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামী, ১১ দলীয় জোটের সমর্থক, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং বিএনপির মতের সঙ্গে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান রাখার কারণে যেসব নিরীহ নাগরিক ও ভোটার সহিংসতার শিকার হয়েছেন, আমরা তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। প্রত্যেক নিরপরাধ ভুক্তভোগীর পাশে আমরা দৃঢ় সংহতি ঘোষণা করছি।
তিনি বলেন, যে জাতি সদ্য তার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছে, সে জাতির বুকে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রতিহিংসার রাজনীতির কোনো স্থান নেই। আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই, জুলাই বিপ্লব এখনো জীবিত।
জামায়াত আমির বলেন, এ দেশের মানুষ একবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, আবার ভয়ভীতির অন্ধকারে ফিরে যাবে না। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি, অবিলম্বে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনুন। দ্রুত ও দৃশ্যমান আইন প্রয়োগই পারে পরিস্থিতিকে অবনতির হাত থেকে রক্ষা এবং নিশ্চিত করতে, কোনো নাগরিক যেন বিকল্প উপায়ে নিরাপত্তা খুঁজতে বাধ্য না হন। প্রতিটি ঘটনা যথাযথভাবে নথিভুক্ত ও রেকর্ড করতে হবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা প্রসঙ্গ তিনি আরো বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল রাজনীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে আমাদের এ অঙ্গীকারকে কেউ দুর্বলতা মনে করবেন না। জুলাই বিপ্লব মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। এ দেশে আর কখনো ভয়, দমনপীড়ন বা সন্ত্রাসের রাজনীতি ফিরে আসতে দেওয়া হবে না, কারো পক্ষ থেকেই নয়। আল্লাহ আমাদের প্রিয় দেশকে হেফাজত করুন।
বিক্ষোভ করবে ১১ দলীয় জোট
সারা দেশে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার প্রতিবাদে আগামীকাল সোমবার বাদ আসর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করবে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোট। গতকাল সন্ধ্যায় ১১ দলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে এ কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার প্রতিবাদে সোমবার বাদ আসর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হবে। এর মাধ্যমে বিএনপিকে কড়া বার্তা দেওয়া হবে, তারা যেন নেতাকর্মীদের সামলে নেয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

