বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে নারীদের উদ্দেশে দেওয়া কথিত নোংরা, জঘন্য ও অবমাননাকর বক্তব্য সঠিক হলে তা পুরো সমাজব্যবস্থাকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার একটি ভয়ংকর অপচেষ্টা বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
রোববার রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচনি অফিসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, “আমরা অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে নারীদের উদ্দেশে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন বলে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে, তা সত্য হলে এটি শুধু নারীদের নয়, পুরো সমাজব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত।”
তিনি বলেন, ডা. শফিকুর রহমান গত ৩১ জানুয়ারি বিকাল ৪টা ৩৭ মিনিটে তার এক্স অ্যাকাউন্টে যে পোস্ট দেন, তার একটি অংশ অনুবাদ করলে দাঁড়ায়— ‘আমরা বিশ্বাস করি যে, যখন মহিলাদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়; এটি অন্য কোনো রূপে পতিতাবৃত্তির মতোই।’
উল্লেখ্য, এর আগেও আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে তিনি নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন বলেন, এই নারীবিদ্বেষী পোস্ট দেওয়ার প্রায় ৯ ঘণ্টা পর তীব্র সমালোচনার মুখে রাত ১টার দিকে হঠাৎ করে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার দাবি তোলা হয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই দাবি কতটা যৌক্তিক।
তিনি বলেন, কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে প্রথম দায়িত্ব হলো দ্রুত জনগণকে অবহিত করা, যাতে বিভ্রান্তি না ছড়ায়। কিন্তু এখানে দেখা গেছে, জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর হঠাৎ করে হ্যাকিংয়ের দাবি তোলা হয়েছে। এমনকি ওই সময়ের মধ্যে জামায়াত আমিরের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একাধিক পোস্ট হলেও এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়ে সেখানে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি।
মাহদী আমিন আরও বলেন, গভীর রাত ৩টা ৩০ মিনিটে হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে তারা অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে প্রায় ১২ ঘণ্টা পরে জিডি করার কারণ কী—সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। একই সঙ্গে অল্প সময়ের মধ্যেই হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার দাবিকেও তিনি অবিশ্বাস্য বলে উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন বলেন, বিএনপি সর্বদা নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সম্মান ও সমঅধিকারের পক্ষে। এ ধরনের ভাষা ও মানসিকতা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি প্রকাশ্য নারীবিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।
তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য—এই রাজনৈতিক দলটির জন্য এ ধরনের আচরণ নতুন নয়। এর আগেও একই দলের এক নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। দলটির প্রধান নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার মতো পশ্চাৎপদ বক্তব্য দিয়েছেন। মুখে মুখে ‘ইনসাফ কায়েমের’ কথা বললেও জামায়াত একটি আসনেও নারী সংসদ সদস্য প্রার্থী দেয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এমনকি একটি টকশোতে দলটির এক সদস্য নারীদের সংসদে যাওয়াকে তাচ্ছিল্য করে “ট্রফি”র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
মাহদী আমিন বলেন, জামায়াত প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে—তাদের দলের প্রধান পদে কোনো নারী কখনোই আসতে পারবেন না। অথচ তারাই নারী কর্মীদের দিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের এনআইডি কার্ড ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এটাই কি তাদের তথাকথিত ইনসাফ?
তিনি আরও বলেন, এই দলের সঙ্গে নির্বাচনি জোটে যুক্ত থাকার কারণেই জোটভুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বহু নারী নেত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেই প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। এমনকি নারী প্রার্থীদের পোশাক-পরিচ্ছেদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা চরম রুচিহীনতা ও নারীবিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।
মাহদী আমিন অভিযোগ করেন, বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নারী সদস্যরা, বিশেষ করে ছাত্রদলের নারী নেত্রীরা সাইবার স্পেসে সীমাহীন, বর্বর ও মধ্যযুগীয় বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। এসব অপপ্রচারে জড়িত আইডিগুলো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের নারীরা যুগে যুগে সব সংকটে-সংগ্রামে অগ্রভাগে থেকেছেন। পোশাকশিল্পে নারীদের অবদান থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রশাসন, সাংবাদিকতা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতে নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এসব কর্মজীবী নারীর প্রতি জামায়াতের অবস্থান অত্যন্ত অপমানজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মাহদী আমিন ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের সাহসী ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, সংকট এলেই একটি পক্ষ নারীদের আঘাত করার নোংরা পথ বেছে নেয়। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, মা ও বোনদের ওপর কোনো অন্যায়, অবিচার ও নিপীড়ন বিএনপি মেনে নেবে না, বাংলাদেশও মেনে নেবে না।
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে তিনি বলেন, নারীর মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান সুস্পষ্ট—কোনো আপস নেই, কোনো ভয় নেই, কোনো পিছু হটা নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

