ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে উন্নত ও জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও সৎ নেতৃত্ব প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
তিনি বলেন, ‘যত মিলিয়ন মানুষ থাকুক না কেন, সঠিক সিস্টেম, ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও যোগ্যতা থাকলে উন্নত নগর গড়ে তোলা সম্ভব। মানুষ বেশি বলে কিছু করা যাবে না—এটা কোনো যুক্তি নয়।’
শুক্রবার রাজধানীর ফার্মগেটের একটি হোটেলে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিং এ বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি এসব কথা বলেন। ‘রোমিং ফর ঢাকা নর্থ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পাঁচটি দেশ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখেন তিনি।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে তিনি ঢাকা শহরের পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট নিরসন, স্বাস্থ্যসেবা ও নাগরিক কল্যাণমূলক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলে আসছেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব কি না, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন ছিল। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিভিন্ন দেশের নগর ব্যবস্থাপনা দেখতে তিনি সফর করেছেন।
তিনি বলেন, ‘দেখে সত্যিই আমার কাছে মনে হয়েছে, আমাদের বাংলাদেশটাও এভাবে একবার হওয়া দরকার। আমি যেসব বিষয় নিয়ে কথা বলছি, সেগুলো কোনো কল্পনা নয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই এগুলো বাস্তবে কার্যকর হয়েছে।
সৎ নেতৃত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে জামায়াতের এই নেতা বলেন, দেশকে ভালো করতে হলে নেতৃত্বের মধ্যে সততা, দেশপ্রেম ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। তাঁর ভাষায়, ‘সে কোন ধর্মের, কোন দলের বা কোন আদর্শের—এটা মুখ্য বিষয় নয়। সে সৎ কি না, তার কমিটমেন্ট আছে কি না এবং মানুষের ও দেশের প্রতি ভালোবাসা আছে কি না—এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।’
বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সফরকালে বিভিন্ন দেশের মেয়র, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের কথা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য বিভিন্ন সভার আয়োজন করা হয়েছে এবং নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁরা মতবিনিময় করেছেন।
কোনিয়া শহরের উদাহরণ দিয়ে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, শহরটির জনসংখ্যা ও আয়তনের সঙ্গে ঢাকার সরাসরি তুলনা না করে সেখানকার ব্যবস্থাপনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। তার মতে, মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে নাগরিকসেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব—এমন ধারণা ঠিক নয়; বরং পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে তাদের সফর শুরু হয়। প্রথমে মালয়েশিয়ায় তিন দিন অবস্থান করেন। এরপর সিঙ্গাপুরে দুই দিন, ফিলিপাইনের বিভিন্ন এলাকায় চার দিন এবং সৌদি আরবে অবস্থানের পর তুরস্ক সফর করেন। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে দুই দিন এবং রাজধানী আঙ্কারায় এক দিন অবস্থান করেন। পরে মক্কা-মদিনা সফর শেষে দেশে ফেরেন।
সিঙ্গাপুরের নাগরিকসেবা ও নগর ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করে তিনি বলেন, অল্প কয়েক দশকের মধ্যে দেশটি যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে দেশপ্রেম, সততা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ভূমিকা রয়েছে।
তুরস্কের ইস্তাম্বুল ও কোনিয়ার নাগরিকসেবার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে সিটি কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে কম খরচে মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের খাবার পাওয়া যায়। একই সঙ্গে গণপরিবহন ব্যবস্থাও প্রযুক্তিনির্ভর ও কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত।
তিনি বলেন, নাগরিকেরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাসের সময়সূচি, রুট ও টিকিটের তথ্য জানতে পারেন। কোথাও দুর্ঘটনা বা সমস্যা হলে দ্রুত উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় এবং যানবাহন সরিয়ে সড়ক সচল করার ব্যবস্থা করা হয়।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, বিদেশ সফরের পুরো অভিজ্ঞতা একদিনে তুলে ধরা সম্ভব নয়। সফরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পর্যায়ক্রমে ভিডিও ও তথ্যচিত্র তৈরি করে সাংবাদিকদের সঙ্গে শেয়ার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
হাসপাতালের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
সংবাদ সম্মেলনে দেশে ফেরার পর মিরপুরের একটি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। তিনি ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি বিচ্ছিন্নভাবে একজন এমপিকে পদত্যাগ করানো বা দলীয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শেষ করা—জনগণ তা চায় না। এই এমপি ছাড়াও আরও এমপি, মন্ত্রী বা সন্ত্রাসী জড়িত থাকতে পারে। আমরা সবার ব্যাপারে ব্যবস্থা দেখতে চাই।’
ঘটনার ‘পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত’ করে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রতা কাম্য নয়। তাঁর মতে, প্রকাশ্য কোনো ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্ত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
হাসপাতালটির উন্নয়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তুরস্কের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা দেখে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। হাসপাতালটিকে মা ও শিশুর জন্য আন্তর্জাতিক মানের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার আহ্বান জানান তিনি।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, মা ও শিশুদের শুধু চিকিৎসা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; তাদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ, বসার ব্যবস্থা, খাবার ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘যে মায়েদের সম্মান দিতে পারে না, সে বড় হতে পারে না। শিশুদের জন্যও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’
হাসপাতালটি উন্নয়নে সরকার উদ্যোগ নিলে জামায়াতে ইসলামী সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, সরকার ভালো কোনো উদ্যোগ নিলে তাঁরা পাশে থাকবেন এবং প্রয়োজন হলে দেশে-বিদেশে সহায়তা সংগ্রহেও ভূমিকা রাখবেন।
কেন্দ্রীয় নির্বাহি পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমের পরিচালনায় এতে উপস্থিত ছিলেন- কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন মোল্লা, ডা.ফখরুদ্দিন মানিক, ইয়াসিন আরাফাত ও মহানগরীর প্রচার-মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


