শরীয়াহর দৃষ্টিতে সম্পত্তি হস্তান্তর বিলে যেসব সমস্যা

শরীয়াহর দৃষ্টিতে সম্পত্তি হস্তান্তর বিলে যেসব সমস্যা

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এ এমন একটি বিধান রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহ তাঁদের সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ ও দখল করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। একই ধরনের বিধান নির্দিষ্ট অন্যান্য পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে।

আইনটির উদ্দেশ্য হিসেবে বয়স্ক পিতা-মাতার নিরাপত্তা ও সামাজিক বাস্তবতার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। এমনকি আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই নতুন ব্যবস্থা প্রচলিত হেবা বা মুসলিম আইনের অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তরকে প্রভাবিত করবে না; বরং এটিকে একটি স্বতন্ত্র আইনগত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু এখানে মৌলিক প্রশ্ন হলো—একটি সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তর করার পর একই সঙ্গে দাতা নিজের জন্য সেই সম্পত্তির জীবনকালীন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন কি-না? ইসলামী আইনে এর অবস্থান কী?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমে ইসলামে মালিকানা হস্তান্তরের প্রকৃতি এবং বিশেষত হেবা (الهبة)-এর শরয়ী সংজ্ঞা ও বিধান বুঝতে হবে।

১. ইসলামে হেবার প্রকৃতি : ইসলামী ফিকহে হেবা বলতে বোঝায়

تَمْلِيكُ الْعَيْنِ فِي الْحَيَاةِ بِلَا عِوَضٍ

অর্থাৎ, জীবদ্দশায় কোনো বিনিময়মূল্য ছাড়াই কোনো সম্পদের মূল মালিকানা (عين) অন্যের কাছে হস্তান্তর করাকে হেবা বলা হয়। ফিকহি বিশ্বকোষেও হেবার মূল সংজ্ঞা হিসেবে ‘বিনা বিনিময়ে জীবদ্দশায় কোনো সম্পদের মালিকানা প্রদান’-কে উল্লেখ করা হয়েছে। (তাকমিলা: ৭/১৩, শামী: ৪/৫৩০, বাহরুর রায়েক: ৭/৩০৯)

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, হেবার মাধ্যমে শুধু সম্পত্তির ব্যবহারাধিকার দেওয়া উদ্দেশ্য নয়; বরং কবজের মাধ্যমে সম্পত্তির মূল মালিকানা (رقبة) গ্রহীতার কাছে চলে যায়।

সুতরাং কেউ যদি বলে, ‘আমি এই বাড়িটি তোমাকে দিয়ে দিলাম; কিন্তু যতদিন আমি জীবিত থাকব, ততদিন এর মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও পূর্ণ ভোগাধিকার আমার কাছেই থাকবে’—তাহলে প্রশ্ন দেখা দেবে, এখানে প্রকৃতপক্ষে হেবার মাধ্যমে সম্পূর্ণ মালিকানা হস্তান্তর হয়েছে কি না? উত্তর—না। তার মানে এই শর্তের কারণে হেবা সম্পন্ন হয়নি।

২. হেবা, হাদিয়া ও সদকার পার্থক্য:

হেবা, হাদিয়া ও সদকা—তিনটিই মূলত: বিনিময় ছাড়া সম্পদ প্রদানমূলক চুক্তি। ফিকহি দৃষ্টিকোণে হেবা একটি ব্যাপকতর পরিভাষা; হাদিয়া ও সদকা তার বিশেষ রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কাউকে সম্মান ও সৌজন্যের উদ্দেশ্যে দেওয়া হলে তা হাদিয়া, আর আল্লাহর নৈকট্যে বা সাওয়াবের প্রত্যাশায় অভাবীকে দেওয়া হলে তা সদকা হিসেবে পরিচিত।

অতএব, ‘দান’, ‘গিফট’, ‘হাদিয়া’ ও ‘হেবা’—শব্দের পার্থক্য থাকলেও সম্পত্তির মালিকানা বিনা বিনিময়ে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এগুলোর মূল ফিকহি কাঠামো একই বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। (আল-মওসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ: ৪২/১২০)

৩. হেবার অন্যতম মৌলিক ফল হলো মালিকানা হস্তান্তর:

হেবা সম্পন্ন হলে গ্রহীতা সম্পত্তির মালিক হন। সুতরাং দাতা যদি সম্পত্তির মালিকানা নিজের কাছে রেখে শুধু ব্যবহার করার অধিকার অন্যকে দেন, সেটি হেবা নয়; বরং তা ব্যবহারাধিকার বা منفعة হস্তান্তরের অন্য কোনো চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। যেমন, আরিয়াত—শুধু ব্যবহারাধিকার প্রদান।

অন্যদিকে, দাতা যদি সম্পত্তির মূল মালিকানা গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করেন, তাহলে সেই হস্তান্তরের পর সম্পত্তির ওপর দাতার পূর্ববর্তী মালিকানাগত অধিকার অব্যাহত থাকবে—এমন কথা সাধারণ হেবার প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। (আল-মওসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ: ৪২/১২০)

৪. শর্ত সাপেক্ষে হেবা ইসলামে বৈধ কি-না?

ইসলামে শর্তভিত্তিক হেবা ও শর্তহীন হেবা উভয়টি বৈধ। তবে শর্তের প্রকৃতি হেবা চুক্তির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হওয়া আবশ্যক। যেমন— আল মওসুয়া গ্রন্থে বলা হয়েছে:

অর্থ: হেবার সাথে যুক্ত শর্ত কখনো সঠিক (বৈধ) হতে পারে, আবার কখনো সঠিক না-ও (অবৈধ) হতে পারে। সঠিক বা বৈধ শর্ত হলো: যা দানের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী নয় এবং এর বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়; বরং তা হেবাকে আরও জোরালো করে। যেমন দাতা যদি বলেন: "আমি তোমাকে এই জিনিসটি হেবা করলাম, সুতরাং তুমি এখনই এটি গ্রহণ করো এবং নিজের দখলে নাও।" অথবা হেবার মধ্যে কোনো বিনিময়ের শর্ত জুড়ে দেওয়া ....

অনুরূপভাবে হাম্বলি মাজহাবের মতে, একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য হেবাকৃত বস্তুর উপকারিতা বা ব্যবহারের অধিকার নিজের জন্য রেখে দেওয়ার শর্ত করাও জায়েজ।

অবৈধ শর্ত হলো: যে শর্ত হেবার বিধান ও এর মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। যেমন দাতা যদি বলেন: "আমি তোমাকে এটি এই শর্তে হেবা করলাম যে, তুমি এটি কাউকে হেবা করতে পারবে না এবং বিক্রিও করতে পারবে না।" অথবা "আমি তোমাকে এটি এই শর্তে হেবা করলাম যে, এক মাস পর তুমি এটি আমাকে ফেরত দেবে।" এই ধরনের শর্তের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ফকিহ (জমহুর উলামা)—যেমন হানাফি, শাফেয়ী (এক বর্ণনামতে) এবং হাম্বলি মাজহাবের প্রধান মতানুযায়ী—মনে করেন যে, শর্তটি বাতিল হয়ে যাবে, তবে হেবা চুক্তিটি সঠিক বা বৈধ থাকবে। (আল-মওসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ: ৪২/১৩৭)

অর্থাৎ হেবা চুক্তির ফলাফল হলো— কাউকে কোনো জিনিসের মালিক বানানো। আর মালিক হওয়ার চাহিদা হলো উক্ত সম্পদে যে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের অধিকারী হওয়া। এ থেকে বোঝা গেলো, হেবা গ্রহীতার জন্য হেবাকৃত বস্তুতে পূর্ণ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তাতে হেবা গ্রহীতা যথেচ্ছা হস্তক্ষেপ করতে পারবে।

এখন যদি বলা হয়— তোমাকে হেবা করলাম; কিন্তু তুমি সেটা ভোগ করতে পারবে না, বরং আমি ভোগ করবো। তাহলে উক্ত শর্তটি হেবা স্বার্থের বিরোধী হওয়ায় তা বাতিল গণ্য হবে। তবে হেবা সহীহ হয়ে যাবে। অর্থাৎ গ্রহীতা কবজের মাধ্যমে তার মালিক হয়ে যাবে। দাতা ভোগের অধিকারী হবেন না। (আল-মওসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ: ৪২/১৩৭)

প্রশ্ন হতে পারে— হাম্বলী মাজহাবে তো ভোগাধিকারের শর্ত গ্রহণযোগ্য?

উত্তর: হাম্বলী মাজহাবে ভোগাধিকারের শর্ত নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্ধারিত। কিন্তু আইনে বলা হয়েছে— জীবনকালীন। যা অনির্দিষ্ট। এ কারণে কোনো মাজহাব মতেই আইনে উল্লিখিত নিয়মে হেবা বা মালিকানা হস্তান্তর বৈধ নয়।

৫. দাতার নিজের জন্য যে কোনোভাবে জীবনকালীন অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ আছে কি?

এখানে মূল বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি বলে—

“আমি আমার বাড়িটি আমার ছেলেকে হেবা করলাম; তবে আমি যতদিন জীবিত থাকব, ততদিন বাড়িটির মালিকানা ও পূর্ণ ভোগদখলের অধিকার আমার থাকবে।” তাহলে এ বক্তব্যের মধ্যে দুটি বিষয় একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে—

১. সম্পত্তির মালিকানা গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করা;

২. আবার দাতার জীবদ্দশা পর্যন্ত সেই সম্পত্তির ওপর দাতার নিজস্ব অধিকার বহাল রাখা।

এই দুইটি একসাথে জমা করা/হওয়া শরীয়াহ আইনের সাথে সাংঘর্ষিক।

কারণ হেবা হলো মালিকানা হস্তান্তর, আর মালিকানা হস্তান্তরের পর দাতার নিজের জন্য পূর্বের মালিকানাগত অধিকার সংরক্ষণ করা হেবার প্রকৃতির সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করবে।

৬. ইসলামী শরীয়তে ‘উমরা’ (العمرى)-এর দৃষ্টান্ত

বর্তমান বিষয়টির সঙ্গে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি বিষয় হচ্ছে— উমরা। হযরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি যদি কাউকে কোনো সম্পত্তি তার ও তার বংশধরদের জন্য ‘উমরা’ হিসেবে প্রদান করে, তাহলে তা যার কাছে দেওয়া হয়েছে তারই হবে; দাতার কাছে ফিরে যাবে না। (সহীহ মুসলিম: হাদিস নং- ৪১৬৪)

ফকিহগণ ‘উমরা’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন:

ইমাম ইবনে কুদামাহ রহ. আল-মুগনি-তে উল্লেখ করেছেন যে, অধিকাংশ আলেমের মতে ‘উমরা’ একটি হেবা-জাতীয় লেনদেন এবং এর মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তর হয়।

ইমাম নববী রহ. শরহু সহিহ মুসলিম-এ জাবের রা. সূত্রে বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যায় ‘উমরা’-এর মাধ্যমে প্রদত্ত সম্পত্তিতে মালিকানা ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিধান আলোচনা করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, উমরা-তেও মালিকানা স্থানান্তরিত হয়।

সবগুলো মতের সারসংক্ষেপ হলো: জমহুর ফকীহদের মতে উমরা বিধাগতভাবে হেবার অন্তর্ভুক্ত। হেবার জন্য যে সকল শর্ত প্রযোজ্য উমরা’র জন্যও সে সকল শর্ত প্রযোজ্য। (দারসুল মুসলিম: ২/২৩১)

এ থেকে অন্তত একটি মৌলিক নীতি স্পষ্ট হয় যে—কোনো সম্পত্তি প্রকৃত অর্থে হেবা হিসেবে দিয়ে দেওয়ার পর দাতা নিজের মৃত্যুর সঙ্গে হস্তান্তরের কার্যকারিতা শর্তযুক্ত করতে পারেন না।

৭. ‘দান’ ও ‘জীবনকালীন ভোগাধিকার’—দুটি পৃথক বিষয়:

এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা জরুরি, তা হলো— ইসলামী আইন কাউকে সম্পত্তির মালিকানা দেওয়া এবং কাউকে সম্পত্তির ব্যবহার বা ভোগাধিকার দেওয়াকে এক বিষয় মনে করে না। দান ও হেবার মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তর হয়ে যায়। এক্ষেত্রে কবজের পর উক্ত সম্পদে দাতার কোনো কর্তৃত্ব ও অধিকার থাকে না। আর শুধু ভোগাধিকার দিলে সেটা হয় ‘আরিয়াহ’। এক্ষত্রে উক্ত সম্পদের মালিকানা হস্তান্তর হয় না; বরং তা দাতার মালিকানায় বহাল থাকে।

অথচ আইনে ‘সম্পত্তির পূর্ণ মালিকানা সন্তানকে দিয়ে দেয়ার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তির ওপর মালিকানাগত পূর্ণ ভোগদখল ও নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে মর্মে বলা হয়েছে। এটি শরীয়াহ আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলাম বলে, সম্পদের যিনি মালিক হবেন তিনিই তার ভোগদখলের অধিকারী হবেন।

অর্থ: .. নিশ্চয় মালিকের জন্য যে কোনো তাসাররুপ (হস্তক্ষেপ) এর অধিকার রয়েছে। বেচা-কেনা, হেবা, অসিয়ত, আজাদ করা এবং খাওয়া-দাওয়া সকল ধরনের হস্তক্ষেপের অনুমতি রয়েছে। (খুলাসা ফি আহকামি আহলিজ জিম্মাহ: ১/১৭৭)

৮. শরীয়াহ’র দৃষ্টিতে উক্ত আইনে সমস্যাটি আসলে কোথায়?

এখানে আপত্তি এই নয় যে, বৃদ্ধ পিতা-মাতার জীবদ্দশায় তাঁদের নিরাপত্তা ও বসবাসের অধিকার থাকা উচিত নয়। বরং ইসলাম পিতা-মাতার অধিকার ও তাঁদের প্রতি সদাচরণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। সমস্যা হলো: মালিকানা হস্তান্তরের শরয়ী বিধানে পরিবর্তন আনা। যা কোনো মানুষের জন্য বৈধ হতে পারে না।

যদি ‘দান’ বা ‘হেবা’ বলতে প্রকৃত মালিকানা হস্তান্তর বোঝানো হয়, তাহলে সেই হস্তান্তরের সঙ্গে এমন শর্ত যুক্ত করা, যার ফলে দাতা নিজের জীবদ্দশায় সম্পত্তির ওপর এমন অধিকার বজায় রাখবেন যা মূলত মালিকের অধিকার—তাহলে হেবার শরয়ী অবস্থান থাকলো কোথায়? এমন শর্তের কারণে— শর্তটি বাতিল হয়ে হেবা সংঘটিত হয়ে যাবে। (আল-মওসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ: ৪২/১৩৮, বাদায়েউস সানায়ে: ৬/১১৭, মুগনি: ২/৩৯৮)

অতএব, বয়স্ক পিতা-মাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য বৈধ হলেও, সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য যে আইনগত পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে, সেটিও শরিয়তসম্মত হতে হবে। অথচ প্রণীত নীতিটি শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা ইসলামে মালিকানা হস্তান্তরের সাথে ভিন্ন কারো জন্য ভোগাধিকারকে শর্তযুক্ত করার কোনো সুযোগ নেই। তা—যে নামেই হোক না কেন। এমনকি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করলেও তা বৈধ হবে না।

দাতা জীবদ্দশায় ভোগদখল করে মৃত্যুর পর হেবা কার্যকরের শর্ত করলে, তা অসিয়ত হয়ে যাবে। আর অসিয়তের ক্ষেত্রে শরীয়াহ আইন হলো—বৈধ ওয়ারিশকে অসিয়ত করা যায় না। তাই উক্ত হেবা অসিয়তে রূপান্তরিত হলেও তা নিজ সন্তানদের জন্য কার্যকর হবে না। কেননা আপন সন্তান বৈধ ওয়ারিশ হিসাবে স্বীকৃত।

রাসূল স. ইরশাদ করেন: ওয়ারিশদের জন্য অসিয়ত নেই। (সুনানে বায়হাকী: হাদিস নং- ১২৩১৬)

৯. এই আইনের প্রভাব কী কী হতে পারে ?

এই আইন বাস্তবায়ন হলে যে সকল সমস্যা হতে পারে:

• ইসলামের (মিরাছ নীতি) উত্তরাধিকার আইন অকার্যকর হয়ে যাবে।

• দু’একজকে বিশেষ সুবিধা দিতে গিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীকে কুরআনিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে।

• পরিবারে কলহ বাড়বে।

• সন্তানদের মাঝে সমতার বিধান লঙ্ঘিত হবে।

• যাকাতের বিধানে সমস্যা তৈরি হবে।

• রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্তান হেবাপ্রাপ্ত সম্পদ বিক্রি করার অধিকারী হবে; সেক্ষেত্রে দাতার উদ্দেশ্য খর্ব হবে।

• সন্তান চাইলে আইনি ভিত্তিতে সে সম্পদ বন্ধক বা মর্টগেজ কিংবা হস্তান্তরমূলক যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারবেন; সে ক্ষেত্রেও দাতার উদ্দেশ্য খর্ব হবে।

• গ্রহীতার মৃত্যুর পরও তার এতিম সন্তানরা দাতা জীবিত থাকাবস্থায় সম্পদের ভোগাধিকার পাবে না; এটা ন্যায়সঙ্গত হবে কিনা?

পরিশিষ্ট:

সুতরাং ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে আলোচ্য বিধান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু ‘আইনটি বৃদ্ধ পিতা-মাতার স্বার্থ রক্ষা করছে কি না’—এ প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং দেখতে হবে—

(ক) সম্পত্তির মালিকানা কি সত্যিই গ্রহীতার কাছে হস্তান্তরিত হচ্ছে?

(খ) হস্তান্তরের পর দাতার জন্য যে অধিকার সংরক্ষণ করা হচ্ছে তা কি কেবল ব্যবহারাধিকার, নাকি মালিকানাগত অধিকার?

(গ) ওই অধিকার হেবার প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না?

(ঘ) হস্তান্তরের শর্ত শরিয়তসম্মত কি না?

কারণ ইসলামী আইনে উদ্দেশ্য বৈধ হলেই প্রত্যেক পদ্ধতি বৈধ হয়ে যায় না; বরং বৈধ উদ্দেশ্য অর্জনের পদ্ধতিটিও শরিয়তসম্মত হতে হয়।

অতএব, ‘বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে তাঁদের সম্পত্তিতে জীবদ্দশায় নিরাপদ রাখা’ একটি গ্রহণযোগ্য ও কল্যাণকর উদ্দেশ্য হতে পারে; কিন্তু এর জন্য এমন একটি হস্তান্তর-পদ্ধতি তৈরি করা, যেখানে একদিকে সম্পত্তির মালিকানা গ্রহীতার কাছে চলে যাবে এবং অন্যদিকে দাতা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ওই সম্পত্তির ওপর মালিকানাগত পূর্ণ ভোগদখল সংরক্ষণ করবেন—তার শরয়ী বৈধতা হেবার মৌলিক সংজ্ঞা, মালিকানা হস্তান্তরের প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট শরয়ি শর্তের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

কার্যত: উল্লিখিত শর্তের কারণে এটা অসিয়ত হয়ে যায়। আর অসিয়ত যেহেতু ওয়ারিশদের জন্য কার্যকর হয় না, তাই উক্ত আইনটি অসিয়ত হিসাবেও বাস্তবায়ন করার সুযোগ নাই। (সুনানে বায়হাকী: হাদিস নং- ১২৩১৬)

আরেকটি জরুরি বিষয় হলো: কোনো বৈধ ওয়ারিশকে বঞ্চিত করার জন্য এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করার সুযোগ আছে কি-না?

উত্তর: না। আল্লামা কাসানী রহ. বলেন:

অর্থাৎ পিতা তার জীবদ্দশায় সন্তানদেরকে কোনো সম্পত্তি দিতে চাইলে তা সহীহ হবে। তবে তা হেবা বা দান হিসাবে গৃহীত হবে; মিরাছ নয়। তাই তাতে সমতা বজায় রাখা মুস্তাহাব। শরীয়ত স্বীকৃত বিশেষ কারণে কম-বেশিও করা যাবে। তবে কোনো বৈধ ওয়ারিশকে বঞ্চিত করার নিয়তে অন্যকে বেশি দিলে দাতা গুনাহগার হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৬/১২৭, আল-কাওয়ানিনুল ফিকহিয়্যাহ: পৃ: ৩১৪)

মুসলিমদের মালিকানা হস্তান্তর পদ্ধতি শরীয়তের নির্ধারিত মৌলিক নীতির অধীন। তাই দেওয়ানী আইনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের মৌলিক অধিকার হনন করার সুযোগ নেই। এমন আইন মুসলিম রাষ্ট্রে চলতে পারে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

অর্থ: যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই কাফের। (সূরা মায়েদা: ৪৪)

অত:পর বলেন:

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

অর্থ: যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম। (সুরা মায়েদা: ৪৫)

আল্লাহ তায়ালা সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। হেদায়াতের পথে পরিচালিত করুন। আল্লাহ ব্যতিত কাউকে ইলাহ হিসাবে গ্রহণ করা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

লেখক: শিক্ষাসচিব ও সিনিয়র মুফতি, শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন