একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ছিল শীতল পাটির কদর। গরমের দিনে মাটির ঘরের মেঝেতে কিংবা বারান্দায় শীতল পাটি বিছিয়ে স্বস্তি পেতেন মানুষ। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে ব্যবহার হতো দেশীয় ঐতিহ্যের এই পাটি। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন কৃত্রিম উপকরণের সহজলভ্যতা এবং কারিগরদের অনাগ্রহে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি শিল্প।
স্থানীয়ভাবে শীতলপাটি তৈরির সঙ্গে জড়িত মননজয় চন্দ্র বলেন, আগে এ পাটির চাহিদা ছিল অনেক বেশি। পরিবারের নারীরা অবসর সময়ে পাটি বুনে বাড়তি আয় করতেন। একটি পাটি তৈরিতে কয়েক দিন থেকে শুরু করে সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগলেও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় এখন অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন।
শীতলপাটি তৈরিতে নিয়োজিত আরেক কর্মী অনিতা রাণী বলেন, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, শ্রমের তুলনায় কম পারিশ্রমিক এবং বাজারে আধুনিক ম্যাট ও প্লাস্টিকের পণ্যের আধিপত্য শীতলপাটি শিল্পের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মও এ কাজ শেখার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে কামারখন্দ থেকে হারিয়ে যেতে পারে শীতলপাটি তৈরির ঐতিহ্য।
স্থানীয় প্রবীণ বিল্লু চন্দ্র বলেন, শীতলপাটি শুধু একটি ব্যবহার্য সামগ্রী নয়; এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি শিল্প। একসময় বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা অতিথি আপ্যায়নে শীতলপাটির বিশেষ গুরুত্ব থাকলেও বর্তমানে আধুনিক পণ্যের ভিড়ে এর ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে।

.
সচেতন মহলের দাবি, কামারখন্দের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ। কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামালের ব্যবস্থা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং দেশ-বিদেশে বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
পূর্ণিমা রাণী বলেন, যথাযথ উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কামারখন্দের হারিয়ে যেতে বসা শীতলপাটি শিল্প নতুন প্রাণ ফিরে পাবে। ঐতিহ্যের এই নিদর্শন রক্ষা করা গেলে একদিকে যেমন বহু পরিবার কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা গ্রামীণ কারুশিল্পও টিকে থাকবে।
কামারখন্দ উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এই উপজেলা শীতল পাটি দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছে কারিগরা, এখানে প্রায় তিন শত পরিবার এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি তৈরির আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা।
কারিগরিদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে আধুনিক ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বাজারজাতকরণ ও প্রচার-প্রচারণার সুব্যবস্থা ও কারিগরি ও উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা প্রদান করতে হবে।
সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, জেলার প্রাচীন ঐতিহ্য ও কারিগরদের সুরক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশেষ করে কারিগরদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং তৈরি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিপণন সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

