দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের অভিমত

নেপালের ভয়াবহ বন্যার আগাম পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন ছিল

নেপালের ভয়াবহ বন্যার আগাম পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন ছিল

নেপাল ও তিব্বতে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার পেছনে উচ্চ পার্বত্য এলাকায় ভূমিধস ও হিমবাহ ধসের সম্মিলিত ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করছেন ভূতত্ত্ববিদরা। আকস্মিক এই ধস থেকে সৃষ্ট পানি ও কাদার প্রবল স্রোত এত দ্রুত নেমে আসে যে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা ভবন ও স্থাপনা গ্রাস করে। ফলে প্রাণঘাতী এই দুর্যোগ আগেভাগে শনাক্ত করে স্থানীয় মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন ছিল বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত হিমবাহ-সংক্রান্ত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণে নির্দিষ্ট কোনো এলাকা বা হিমবাহ-হ্রদের পানির উচ্চতা নজরদারিতে রাখা হয়। হিমবাহ পিছিয়ে গেলে তার গর্তে গলিত পানি জমে এসব হ্রদ তৈরি হয়। পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সেখান থেকে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আলাস্কার পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এরান হুড দীর্ঘদিন ধরে আলাস্কার মেনডেনহল হিমবাহ থেকে সৃষ্ট হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে যাওয়ার বন্যা এবং এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণে রিয়েল-টাইম ভিডিও, পানির উচ্চতা পরিমাপের জন্য লেজার প্রযুক্তি এবং নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করা হয়। এসব তথ্যের মাধ্যমে কখন বন্যা হতে পারে এবং নিচু এলাকার মানুষের জন্য ঝুঁকি কতটা—তা অনুমান করার চেষ্টা করা হয়।

তবে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার মতো আকস্মিক পর্বতধসের ঘটনা পূর্বাভাস দেওয়া অনেক বেশি কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এমন দুর্যোগের পূর্বাভাস দিতে হলে বিস্তীর্ণ ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অত্যন্ত ঘন ও ব্যয়বহুল পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

অধ্যাপক হুডের মতে, ভূকম্পন বা সিসমিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাহাড়ি এলাকার ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডি) চিত্র তৈরি করা যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে ওই এলাকার ভূ-গঠনের পরিবর্তন বা বিকৃতি পর্যবেক্ষণ করে সম্ভাব্য ধসের ঝুঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে। তবে হিমালয়ের দুর্গমতার কারণে সেখানে ড্রোন বা হেলিকপ্টার নিয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানোও সহজ নয়।

২০২০ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ২ হাজার ৭০টি হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে ২১টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। নেপালের পাশাপাশি চীন ও ভারতের হিমালয় অঞ্চলেও রয়েছে আরো অসংখ্য হিমবাহ-হ্রদ।

নেপালে বন্যার জন্য আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকলেও তা মূলত নদী ও হ্রদের পানির উচ্চতা পরিমাপের প্রচলিত গেজ নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞানী ও দুর্যোগ মোকাবিলা গবেষকদের মতে, এসব ব্যবস্থা সাধারণত বর্ষাকাল বা হিমবাহ-হ্রদের পানি ধীরে ধীরে বাড়ার মতো বন্যার পূর্বাভাস দিতে পারে। কিন্তু কোনো পাহাড়ের অংশ আকস্মিকভাবে ধসে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে প্রবল স্রোত তৈরি হলে সেই পরিস্থিতি শনাক্ত করে দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য বর্তমান ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।

নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির জ্যেষ্ঠ বিভাগীয় প্রকৌশলী সুশীল কুমার শ্রেষ্ঠা বলেন, ওই অঞ্চলে সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে বন্যার পানি এত দ্রুত নেমে আসে যে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয়নি। তার ভাষায়, ব্যবস্থা কাজ করলেও দুর্যোগের দ্রুত বিকাশের কারণে মানুষ নিরাপদে যাওয়ার সময় পায়নি।

চীন তাদের হিমবাহ ও পার্বত্য এলাকার কী ধরনের পর্যবেক্ষণব্যবস্থা ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো, বোল্ডারের হিমবাহ ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ আলটন বায়ার্স মনে করেন, শুধু সতর্কীকরণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি ও অবকাঠামো নির্মাণ এড়িয়ে চলা এবং দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি ও সেগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করাও জরুরি।

তিনি জাপানের সুনামি সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরেন। সেখানে ঝুঁকি শনাক্ত হলে বিভিন্ন ভাষায় সাইনবোর্ড ও সম্প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে কী করতে হবে তা জানানো হয়। দুর্যোগের মুহূর্তে এই পূর্বপ্রস্তুতি মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর নেপালে গিয়ে তিনটি হিমবাহ-হ্রদের ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়তা করেছিলেন বায়ার্স। তার মতে, নেপাল সরকার সতর্কীকরণ ব্যবস্থা স্থাপন করলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে তখন জানিয়েছিলেন, সতর্কসংকেত বাজলে সেটি কেমন শোনায় এবং সংকেত পাওয়ার পর তাদের কী করা উচিত—তা তারা জানতেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সতর্কীকরণ ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ বন্যাপ্রবণ এলাকায় নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ সরিয়ে নেওয়ার পথ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যৎ দুর্যোগে প্রাণহানি কমানো সম্ভব।

বায়ার্স সতর্ক করে বলেন, হিমবাহ ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি এখন আর শুধু ‘কখনো ঘটতে পারে’—এমন কোনো সম্ভাবনার বিষয় নয়; বরং প্রশ্নটি হলো, পরবর্তী বন্যা কখন ঘটবে।

সূত্র : দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন