কক্সবাজারের মহেশখালী চ্যানেলের ভারুয়াখালী মোহনা ও বাঁকখালী মোহনা থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনে চার মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রুলের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের ওই দুই এলাকা থেকে ড্রেজিং করে বালু উত্তোলন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জনস্বার্থে মহেশখালী চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে দায়ের করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ সেপ্টেম্বর এ আদেশ দেন বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ.এফ.এম. সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। রিটটি দায়ের করেন মহেশখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাংবাদিক মো. জয়নাল আবেদীন।
আদালতের আদেশে রুলের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত চার মাসের জন্য মহেশখালী চ্যানেলের ভারুয়াখালী মোহনা ও বাঁকখালী মোহনা থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলন থেকে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের বিরত থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি নোটিশ জারির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রিটে অভিযোগ করা হয়, মহেশখালী উপজেলার হামিদারদিয়া ও ঠাকুরতলা মৌজা থেকে বালু উত্তোলনের জন্য ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে অনুমতির শর্ত অমান্য করে মহেশখালী চ্যানেল, আদিনাথ পাহাড় এলাকার মোহনা ও বাঁকখালী খালের মোহনা থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া নির্ধারিত এলাকার বাইরে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়।
রিটকারী সাংবাদিক ও মহেশখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, হাইকোর্টের আদেশের কপি ৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলা প্রশাসককে দিয়ে অবহিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “মহেশখালী একটি দ্বীপ উপজেলা। নানা কারণে এলাকাটি এমনিতেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে নিয়ম লঙ্ঘন করে মহেশখালীর মোহনার চরাঞ্চল থেকে বালু উত্তোলন করা হলে ভবিষ্যতে আদিনাথ পাহাড়সহ আশপাশের পরিবেশ ও দ্বীপের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই সরকারি অনুমোদন ও ওয়ার্ক অর্ডারের শর্ত অনুযায়ী পরিবেশের ক্ষতি না করে কাজ করা হোক। কিন্তু কোনোভাবেই নিয়ম লঙ্ঘন করে বালু উত্তোলন করা উচিত নয়।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’ কার্যাদেশ পায়। প্রকল্পের প্রয়োজনীয় বালু সংগ্রহের জন্য প্রতিষ্ঠানটি কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে মহেশখালী উপজেলার হামিদারদিয়া ও ঠাকুরতলা মৌজা থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি নেয়।
জানা যায়, ১৩টি শর্তে প্রতিষ্ঠানটিকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে এসব শর্তের কয়েকটি যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদনে ১৮ ইঞ্চি কাটার ড্রেজার ব্যবহারের শর্ত থাকলেও সেখানে ১২ ইঞ্চি সাকশন ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে সামুদ্রিক পরিবেশ ও উপকূলীয় এলাকার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া অনুমোদনের অন্যতম শর্ত হিসেবে পরিবেশগত ছাড়পত্রের পাশাপাশি এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) সম্পন্ন করার কথা থাকলেও তা না করেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরে ছাড়পত্র বা ইআইএর জন্য আবেদন না করার অভিযোগও উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন নির্ধারিত রয়্যালটি সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া ছাড়া অনুমোদনের অন্যান্য শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।
বালু উত্তোলন নিয়ে এর আগেও ব্যবস্থা নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। গত ২১ জুলাই পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া মহেশখালী চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’কে ৫০ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮০ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চল কার্যালয়।
তবে জরিমানা করার পরও বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এর আগে গত ২ জুন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় ‘অনুমোদনের আগে ও পরে অনিয়ম’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা ও জনসচেতনতা বাড়ে। পরে জনস্বার্থে স্থানীয় সাংবাদিক মো. জয়নাল আবেদীন হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, “হাইকোর্টের আদেশের বিষয়ে এখনো অফিসিয়ালি কোনো নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বলেন, “মহামান্য হাইকোর্টের আদেশের বিষয়ে আজই অবগত হয়েছি। আদেশটি বিস্তারিত পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
হাইকোর্টের চার মাসের নিষেধাজ্ঞার আদেশের পর মহেশখালী চ্যানেলের ভারুয়াখালী মোহনা ও বাঁকখালী মোহনা থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকার কথা। আদালতের আদেশের কপি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করার পর এখন সেটি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

