গবেষণা, উদ্ভাবন ও যুগোপযোগী প্রকৌশল শিক্ষার মাধ্যমে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)-কে দেশের শ্রেষ্ঠতম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইকবাল।
মঙ্গলবার ডুয়েটের ২৩তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘ডুয়েট ডে-২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এবারের ডুয়েট ডের প্রতিপাদ্য ছিল— ‘ঐক্যের বন্ধনে অটুট ডুয়েট’।
উপাচার্য বলেন, দেশের ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের উচ্চশিক্ষার একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গত দুই যুগ ধরে ডুয়েট একাডেমিক উৎকর্ষ ও গবেষণা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। যুগোপযোগী টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে ডুয়েটকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, উদ্ভাবন ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, “ডুয়েটকে দেশের শ্রেষ্ঠতম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বিশ্বদরবারে জ্ঞানে, দক্ষতায় ও মানবতায় অনন্য করে গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।”
দিনটির শুরুতে জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন, বেলুন উড্ডয়ন, পায়রা অবমুক্তকরণ ও কেক কাটার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হয়। পরে বর্ণাঢ্য র্যালি নিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ শেষে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয়।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ শাকিল পারভেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গবেষণাকর্মে উৎকর্ষের স্বীকৃতি হিসেবে শিক্ষকদের একাডেমিক এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২৬ এবং কৃতী শিক্ষার্থীদের ডীনস অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে ডুয়েটের ইতিহাস তুলে ধরে উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, ডুয়েটের পথচলা শুরু হয় ১৯৮০ সালে কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং, ঢাকা হিসেবে। ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার প্রয়াসে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন।
পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ১৯৮৬ সালে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি), ঢাকা নামে রূপান্তরিত হয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের দীর্ঘদিনের দাবি ও আন্দোলনের পর ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে বিআইটি, ঢাকা পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ‘ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর’ নামে আত্মপ্রকাশ করে।
এ সময় ডুয়েটের নামকরণ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান উপাচার্য। একই সঙ্গে প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিখাতকে এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের প্রচেষ্টার কথাও তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রযুক্তিখাতে ডুয়েটের গ্র্যাজুয়েটদের অবদানের কথা তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, প্রতি বছর ডুয়েট থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। তারা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ দেশের বিদ্যুৎ-জ্বালানি অবকাঠামো থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
দেশের সীমানা পেরিয়েও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ডুয়েটের গ্র্যাজুয়েটরা নিজেদের মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব পেরিয়ে পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরেন উপাচার্য।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, রোবোটিক্স, ইন্টারনেট অব থিংস, বিগ ডেটা, ন্যানোটেকনোলজি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত বিকাশ যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তন, দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি, প্রযুক্তিগত বৈষম্য ও সাইবার নিরাপত্তার মতো চ্যালেঞ্জও বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় প্রকৌশল শিক্ষাকে যুগোপযোগী করা এবং শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলাকে ডুয়েটের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
উপাচার্য বলেন, “২৩তম ডুয়েট ডের এই দিনে আমরা নতুন করে সেই অঙ্গীকারই ব্যক্ত করছি।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডুয়েটের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী রুমা বলেন, আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কারিগর।
তিনি বলেন, “ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের প্রকৌশল ডিপ্লোমাধারীদের একমাত্র স্বপ্নের ঠিকানা, যেখানে মেধা ও পরিশ্রমের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠে দক্ষ প্রকৌশলী প্রজন্ম।”
ডুয়েটের শিক্ষার্থীরা জাতীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রে নিজেদের মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ রাখছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল যুগে গবেষণা, উদ্ভাবন ও নৈতিকতার সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলে দেশের টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখাকে ডুয়েটের মূল লক্ষ্য বলে জানান উপ-উপাচার্য। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ডুয়েটকে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে আরও উপস্থিত ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. মো. আকরামুল আলম, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন, বিজ্ঞান অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. মো. কামাল-আল-হাসান, পরিচালক (গবেষণা ও সম্প্রসারণ) অধ্যাপক ড. মো. আনওয়ারুল আবেদীন, পরিচালক (ছাত্রকল্যাণ) অধ্যাপক ড. উৎপল কুমার দাস এবং শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. এস. এম. মাহফুজ আলম।
দিনব্যাপী আয়োজনে আরও ছিল শিক্ষক বনাম ডুয়েট এলামনাইদের রশি টানাটানি ও প্রীতি ভলিবল ম্যাচ, সাবেক শিক্ষার্থীদের ডুয়েট বাস্তবায়ন আন্দোলনের স্মৃতিচারণ এবং বাদ যোহর কেন্দ্রীয় মসজিদে বিশেষ দোয়া মাহফিল।
ডুয়েটের বিভিন্ন অনুষদের ডীন, বিভাগীয় প্রধান, পরিচালক, হল প্রভোস্ট, শিক্ষক, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে দিনব্যাপী আয়োজন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বর্ণিল আলোকসজ্জায় সজ্জিত পুরো ক্যাম্পাসে সৃষ্টি হয় আনন্দঘন পরিবেশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


