প্রাকৃতিক খাদ্য থেকে রং তৈরিতে সফল বরিশালের নারী উদ্যোক্তা

প্রাকৃতিক খাদ্য থেকে রং তৈরিতে সফল বরিশালের নারী উদ্যোক্তা

বরিশালে প্রথমবারের মতো দেশীয় ফল, শাকসবজি, গাছের ছাল ও ফুলের নির্যাস ব্যবহার করে প্রাকৃতিক খাদ্য রং (ন্যাচারাল ফুড কালার) উদ্ভাবন করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন নারী উদ্যোক্তা জান্নাতুল ফেরদৌস। কৃত্রিম কেমিক্যালভিত্তিক খাদ্য রঙের বিকল্প হিসেবে তার এ উদ্যোগ ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

জানা গেছে, দেশীয় বিভিন্ন ফল, শাকসবজি, গাছের ছাল ও ফুলের রস থেকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তিনি খাদ্য রং তৈরি করেছেন। এই রং ব্যবহার করে পিঠা, লাড্ডু, কেক, ক্যান্ডিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনেও সফল হয়েছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

উদ্যোক্তার এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ বাস্তবায়নে সার্বিক সহায়তা দিয়েছে বরিশাল বিভাগীয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। বিষয়টি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সকালে সফল নারী উদ্যোক্তাকে সঙ্গে নিয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বিভাগীয় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।

এ সময় বিভাগীয় কমিশনার জান্নাতুল ফেরদৌসের উদ্ভাবনী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তার গবেষণা ও উৎপাদন কার্যক্রম আরো এগিয়ে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

নারী উদ্যোক্তা জান্নাতুল ফেরদৌস আমার দেশকে জানান, তিনি বর্তমানে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন সংস্থার বরিশাল জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০৬ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে ব্লক-বাটিকের কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি শখের বশে রান্নার ওপর দক্ষতা অর্জন করেন এবং বিশেষ করে হোমমেড খাবার ও বিভিন্ন ধরনের পিঠাপুলি তৈরিতে নিজেকে পারদর্শী করে তোলেন। দীর্ঘদিন ধরে এসব কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার পর ২০২৪ সালে গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বারি) থেকে আচার, জ্যাম-জেলি, বিস্কুট ও বিভিন্ন ধরনের মসলা প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন।

প্রাকৃতিক-খাদ্যরঙ-তৈরিতে-সফল-বরিশালের-নারী-উদ্যোক্তা-2

তিনি জানান, ২০২৫ সাল থেকে বরিশালের নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে নিজ উদ্যোগে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালু করেন। সেখানে প্রতি মাসে অন্তত দুবার নারীদের বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একই বছর বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকায় ‘জে টেস্টি নেস্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ওই প্রতিষ্ঠানে ড্রাগন ফল, অপরাজিতা ফুল, গাজর, জবা ফুল, বিট রুট, পালং শাক, পুঁই শাকসহ বিভিন্ন দেশীয় উপাদান থেকে প্রাকৃতিক খাদ্যরঙ তৈরি করছেন। এসব রঙ ব্যবহার করে পিঠা, লাড্ডু, কেক, ক্যান্ডিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে।

জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, বর্তমানে তার উদ্ভাবিত প্রাকৃতিক খাদ্যরঙের সংরক্ষণকাল সর্বোচ্চ ১০ দিন। এরপর এর গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে বাজারজাত করতে হলে সংরক্ষণকাল বাড়ানোর প্রযুক্তি প্রয়োজন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা পেলে এ খাদ্যরঙের সংরক্ষণক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি আরো বলেন, প্রাকৃতিক খাদ্যরঙের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দেশের ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশে উৎপাদিত নিরাপদ খাদ্যপণ্য রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এদিকে গতকাল বুধবার সকালে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদের কাছে ফলের রস থেকে তৈরি প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করে প্রস্তুত করা পিঠা, লাড্ডু ও কেক প্রদর্শন করেন নারী উদ্যোক্তা ও জে-টেস্টি নেস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে জান্নাতুল ফেরদৌসকে দেশীয় বিভিন্ন ফল, শাকসবজি ও ফুল থেকে প্রাকৃতিক রঙ তৈরির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। খুলনায় তিন দিন এবং ঢাকায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরে প্রশিক্ষণসহ মোট ছয় দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তিনি সফলভাবে এই পদ্ধতি আয়ত্ত করেছেন।

বরিশাল বিভাগীয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মাহবুব আলম বলেন, প্রতি বছর বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কৃত্রিম খাদ্য রঙ আমদানি করতে হয়। দেশীয় ফল ও কৃষিপণ্য থেকে প্রাকৃতিক রঙ তৈরি করে খাবারে ব্যবহার করা গেলে একদিকে ভোক্তারা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পাবেন, অন্যদিকে বিদেশ থেকে রঙ আমদানিতে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে।

এদিকে দেশের শিক্ষিত ও আগ্রহী উদ্যোক্তাদের এ ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ আমার দেশকে বলেন, দেশীয় ফল, শাকসবজি ও ফুল থেকে প্রাকৃতিক রঙ তৈরি করে খাবারে ব্যবহার করার উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

তিনি বলেন, আমরা দেখছি দেশের সব জায়গায় কৃত্রিম রঙ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে শিশুসহ সব বয়সের মানুষ কম-বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। তবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমিয়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের খাবারে প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার বাড়ানো গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন